- আবদুল লতিফ মন্ডলঃ
আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যসামগ্রীর দাম হ্রাস-বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের বাজারে পণ্যসামগ্রীর দাম হ্রাস-বৃদ্ধির মিল না থাকায় সরকার নয়টি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মর্মে সম্প্রতি মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।
প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বাণিজ্য সচিব, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এবং চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সভাপতির উপস্থিতিতে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সভাপতিত্বে ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যেসব পণ্যের দাম ঠিক করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় সেগুলো হচ্ছে-চাল, আটা, ময়দা, ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, এমএস রড ও সিমেন্ট।
গত ৩১ আগস্ট একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) পক্ষ থেকে নয়টি পণ্যের ওপর একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এতে দেখানো হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে এক বছরে গমের দাম বেড়েছে ৮ শতাংশ।
অথচ দেশের বাজারে খোলা আটা ও ময়দা ৬৭ শতাংশ, প্যাকেট আটা ৬৪ শতাংশ এবং প্যাকেট ময়দা ৫৯ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া দেশের বাজারে চিনির দাম এক বছরে বেড়েছে ১৫ শতাংশ। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত চিনির দাম কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ। একইভাবে এক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে মসুর ডালের দাম কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। অথচ দেশের বাজারে তা বেড়েছে মানভেদে ২৯ থেকে ৩৯ শতাংশ। এমএস রডেরও একই অবস্থা। এক বছরে স্টিল স্ক্র্যাপের দাম কমেছে ১৪ শতাংশ।
দেশের বাজারে ৬০ গ্রেডের রড ১৫ শতাংশ এবং ৪০ গ্রেডের রড ১৬ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া সিমেন্টের দাম বেড়েছে এক বছরে ৩১ শতাংশ। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, বিভিন্ন পণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। এ মুহূর্তে নয়টি পণ্য ঠিক করা হয়েছে। এর বাইরেও যদি নিত্যপণ্য কিছু থাকে, তা-ও আনা হবে। সরকারের কতিপয় নিত্যপণ্যের মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত মধ্যযুগের স্বেচ্ছাচারী সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির খাদ্যপণ্য, বস্ত্র, দাস-দাসী, পশু এবং অন্যান্য দ্রব্যের বাজারদর বেঁধে দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সাধারণত সরকার থেকে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা নয়। তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম কমে যাওয়ার পর ওই পণ্যটির দাম যখন দেশের বাজারে কমছে না বা কমার পরিবর্তে দাম বেড়েছে, কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম যে হারে বেড়েছে, দেশের বাজারে সে পণ্যের দাম এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হারে বেড়েছে, তখন নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কার? একবিংশ শতাব্দীতে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রচলন থাকা অবস্থায় একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোয় বাস করে মধ্যযুগীয় একজন স্বেচ্ছাচারী সুলতানের নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে অনুসরণীয় হিসাবে গ্রহণ করায় যদিও সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তথাপি ইতিহাস থেকে শিক্ষা লাভের জন্য এবং অপরিহার্য কারণে বর্তমানেও ওই ব্যবস্থার কতটা প্রয়োগ সম্ভব, তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
মধ্যযুগে খিলজি বংশের শ্রেষ্ঠ সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি (শাসনকাল ১২৯৬-১৩১৬ খ্রিষ্টাব্দ) প্রায় গোটা ভারতবর্ষে তার কর্তৃত্ব স্থাপন করেছিলেন। তার বিশাল সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা, বিশেষ করে মোঙ্গলদের আক্রমণ থেকে সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য তাকে একটি বিরাট সেনাবাহিনী পুষতে হতো। এ বিরাট সেনাবাহিনীকে স্বল্প বেতনে পোষণ, সাম্রাজ্যের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও উন্নতি এবং জনগণের সুবিধার জন্য আলাউদ্দিন খিলজি গম, বার্লি, চাল, চিনি, ডালসহ সব ধরনের খাদ্যপণ্য, বস্ত্র, দাস-দাসী, পশু এবং অন্যান্য দ্রব্যের বাজারদর বেঁধে দেন।
আলাউদ্দিন খিলজি কেবল খাদ্যদ্রব্য, বস্ত্র, দাস-দাসী, পশু এবং অন্যান্য দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি দ্রব্যাদির চাহিদা অনুসারে সরবরাহেরও ব্যবস্থা করেন। অজন্মা বা অন্য কোনো কারণে খাদ্য ঘাটতি পূরণ করার উদ্দেশ্যে দিল্লির উপকণ্ঠে এবং রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে শস্যভান্ডার গড়ে তোলা হয়। উৎপাদনকারীকে ১০ মনের অধিক খাদ্যশস্য নির্ধারিত মূল্যে সরকারের কাছে বিক্রি করতে হতো।
এটি আমাদের কৃষকের কাছ থেকে কাটা-মাড়ার মৌসুমে সরকারের ধান-চাল ও গম কেনার মতো। তবে পার্থক্য হচ্ছে, আলাউদ্দিন খিলজি প্রবর্তিত নিয়মের মতো আমাদের কৃষকরা নির্ধারিত পরিমাণের বেশি সব ধান-চাল ও গম সরকারের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য নন। দ্রব্যাদির সরবরাহ সুনিশ্চিত করতে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি সুষ্ঠু পরিবহণব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। দুর্ভিক্ষ ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় রেশনিং প্রথার প্রবর্তন করা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে রেশনিং প্রথার প্রবর্তন আলাউদ্দিন খিলজির অভিনব প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে।
খাদ্যদ্রব্য, বস্ত্র, দাস-দাসী, পশু এবং অন্যান্য দ্রব্যের সরবরাহ, বাজারদর পর্যবেক্ষণ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি সরকারি দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন। এসব দপ্তরে ব্যবসায়ীদের তালিকাভুক্ত করা হতো। বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা দুজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পদবি ছিল দিউয়ান-ই-রিয়াসাত এবং শাহানা-ই-মান্ডি (আরসি মজুমদার : অ্যান অ্যাডভান্সড হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া)। ইতিহাসবিদরা লিখেছেন, আলাউদ্দিন খিলজির বাজার নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি মধ্যযুগের রাষ্ট্রনীতির অঙ্গনে অন্যতম বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল। এ ব্যবস্থা কেবল তার প্রধান উদ্দেশ্য সাধনে (স্বল্প খরচে বিরাট সেনাবাহিনী পোষণ) সহায়তা করেনি, এটি জনগণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যও বৃদ্ধি করেছিল। শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে আলাউদ্দিন খিলজির বক্তব্য ছিল-‘এটা আইনসংগত কি বেআইনি, তা আমি জানি না; যা রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলকর এবং জরুরি অবস্থার জন্য আবশ্যক মনে করি, তদনুসারেই আমি আদেশ জারি করি।’
মধ্যযুগের একজন স্বেচ্ছাচারী সুলতানের সব ধরনের খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি থেকে যে সত্যটি বেরিয়ে এসেছে তা হলো, দেশের সর্বস্তরের জনগণের জন্য ন্যায্যমূল্যে খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য দ্রব্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা যে কোনো সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। এটি ঠিক যে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল ও জ্বালানির দামে উল্লম্ফন ঘটেছিল। তবে সরবরাহব্যবস্থার উন্নতির কারণে এসব পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে অনেকটা হ্রাস পেলেও দেশে এর প্রভাব খুবই সামান্য। উপরন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমেছে এমন পণ্যের দাম দেশের বাজারে বেড়েছে। এর পেছনে যে ব্যবসায়ীদের কারসাজি রয়েছে তা বলা বোধহয় অত্যুক্তি হবে না। বিটিটিসির উপর্যুক্ত প্রতিবেদনে এর সত্যতা মেলে।
গত দুবছরে করোনাভাইরাসের প্রকোপে দেশের মানুষের আয় কমেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পরিচালিত ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস ২০২১’ অনুযায়ী, করোনার সময় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। এর ফলে দেশে দারিদ্র্য হার বেড়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) তথ্য অনুসারে, করোনার আগে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু করোনাকালে তা বেড়ে হয়েছে ৪২ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে অতি দারিদ্র্য। ৯ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে তিনগুণ বেড়ে এটি ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে (যুগান্তর, ৩ সেপ্টেম্বর)।
জনগণকে শুধু আমদানিকৃত পণ্য আকাশছোঁয়া দামে কিনতে হচ্ছে না, সরকারের হিসাবে উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনকারী দেশীয় খাদ্যপণ্য যেমন-চাল, মাছ, মাংস, শাকসবজি, ডিম অতি উচ্চমূল্যে কিনতে হচ্ছে। দেশের বেশির ভাগ মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের দাম অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। প্রতি কেজি মোটা চাল ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা অতিগরিব, গরিব ও নিম্নমধ্যবিত্তের খাদ্যনিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করেছে। অতি উচ্চমূল্যে মাঝারি ও সরু চাল কিনতে গিয়ে মধ্যবিত্তদের আমিষজাতীয় খাবার কেনা অনেকটা কমিয়ে দিতে হয়েছে। এতে তাদের পরিবারে, বিশেষ করে শিশু ও নারীদের পুষ্টির অভাব ঘটার জোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বলা হয়ে থাকে, ভারতে ব্রিটিশ সরকার যেমন আলাউদ্দিন খিলজির খাদ্যপণ্যসহ অন্যান্য দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কাছে ঋণী ছিল, তেমনই সময়ে সময়ে এ উপমহাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বিভিন্ন সরকার তার কাছে ঋণী। আলাউদ্দিন খিলজির মূল্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে তার রাজ্যের সাধারণ মানুষ যেভাবে উপকৃত হয়েছে, তা আকাশছোঁয়া নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সময়েও যে কোনো দেশের সরকারের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। তাই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণে সরকার কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম বেঁধে দেওয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। এ উদ্যোগ সফল হোক-এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল








