এইমাত্র পাওয়া

ডিসেম্বরে চালু হচ্ছে মেট্রোরেল

নিউজ ডেস্ক।।

মেট্রোরেলের ১০টি ট্রেন দিয়ে চালু হবে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশটি। এ লক্ষ্যে গত বৃহস্পতিবার থেকে সিস্টেম ইন্টিগ্রেটেড টেস্ট (সমন্বিত পরীক্ষামূলক যাত্রা) শুরু করেছে ঢাকা মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ (ডিএমটিসিএল)। আগামী দুই-তিন মাস এভাবে পরীক্ষামূলক চলাচল করবে ট্রেনগুলো।

চলতি বছরের ডিসেম্বরে এই রুটে উড়ালপথে চালু হবে দেশের প্রথম মেট্রোরেল। উদ্বোধনের আগ পর্যন্ত যাত্রীবিহীন পরীক্ষামূলক চলাচল করবে বলে জানান ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক। তিনি জনকণ্ঠকে জানান, ‘ডিসেম্বরে এমআরটি-৬’র একটি অংশ উদ্বোধন করা হবে। কিন্তু এখনও তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। তবে উদ্বোধনের আগে যাবতীয় পরীক্ষামূলক যাত্রা শেষ করা হবে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশ মেট্রোরেলের এক একটি পরীক্ষা শেষ করতে এক-দুই বছর সময় নেয়। কিন্তু আমরা এত সময় নিচ্ছি না। তাই দুই-তিন মাসের মধ্যে এক একটি পরীক্ষা শেষ করতে হচ্ছে।’ উদ্বোধনের আগে সিস্টেম ইন্টিগ্রেটেড টেস্টসহ আরও একটি পরীক্ষা শেষ করতে হবে বলে জানান তিনি।

মেট্রোরেল চালু হলে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে মিরপুর-ফার্মগেট হয়ে মতিঝিল যেতে সময় লাগবে ৩৮-৪০ মিনিট। এই রুটে ভাড়া এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। তবে তা ১০০ টাকার ওপরে হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার করে দৈনিক প্রায় ৫ লাখ যাত্রী পরিবহন করা যাবে মেট্রোরেলের এই পথে।

ঢাকা মহানগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার যানজট নিরসনে এভাবে উড়াল ও পাতাল রেলের সমন্বয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে মেট্রোরেলের ৬টি লাইন। পুরো রেলপথ হবে ১২৮ দশমিক ৭৪১ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৬৭ দশমিক ৫৬৯ কিলোমিটার হবে উড়াল পথে এবং ৬১ দশমিক ১৭২ কিলোমিটার হবে মাটির নিচ দিয়ে। ২০৩০ সালের মধ্যে মেট্রোরেলের এই ছয়টি লাইনের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।

প্রথম মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৬) ॥ ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৬ নির্মাণ করা হচ্ছে উড়াল পথে। রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ী-মিরপুর-ফার্মগেট-মতিঝিল-কমলাপুর পর্যন্ত এর দৈর্ঘ্য হবে ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার। এ পর্যন্ত এর সার্বিক অগ্রগতি গড় ৮১ দশমিক ৭০ শতাংশ। চলতি বছর ডিসেম্বরে দিয়াবাড়ী থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার অংশ চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

এই অংশে ৯৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৯ দশমিক ৫৩ কিলোমিটার ২০২৪ সালে শেষ হবে। প্রথম মেট্রোরেলের স্টেশন থাকবে ১৭টি। এগুলো হলো- উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কাওরানবাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসক্লাব, মতিঝিল ও কমলাপুর।

দ্বিতীয় মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-১) ॥ দুটি রুটে ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে বিমান বন্দর রুটে উত্তরা বিমান বন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার হবে মাটির নিচ দিয়ে (পাতাল)। এই রুটে স্টেশন হবে ১২টি। এগুলো হলো-বিমানবন্দর, বিমানবন্দর টার্মিনাল-৩, খিলক্ষেত, যমুনা ফিউচারপার্ক, নতুন বাজার, উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা, হাতিরঝিল, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ ও কমলাপুর।

আর পূর্বাচল রুটে নতুন বাজার স্টেশনটি হবে পাতালে। এরপর বসুন্ধরা থেকে পূর্বাচলের পিতলগঞ্জ পর্যন্ত ১১ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার হবে উড়াল (এলিভেটেড) পথে। এ রুটের স্টেশন হবে ৯টি। এগুলো হলো-নতুন বাজার, যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা, পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি, মাস্তুল, পূর্বাচল পশ্চিম, পূর্বাচল সেন্টার, পূর্বাচল পূর্ব, পূর্বাচল টার্মিনাল ও পিতলগঞ্জ ডিপো। ২০২২ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০২৬ সালে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে এই প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ ও পরামর্শক নিয়োগের কাজ চলছে।

তৃতীয় মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৫) উত্তর ॥ এমআরটি লাইন-৫ নর্দান (উত্তর) রুট। উড়াল ও পাতাল পথের সমন্বয়ে এটি হবে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মধ্যে সাভারের হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত ৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার হবে উড়াল। এ রুটে স্টেশন হবে ৪টি। এগুলো হলো-হেমায়েতপুর, বলিয়ারপুর, বিলমালিয়া ও আমিনবাজার।

তুরাগ নদীর নিচ দিয়ে গাবতলী থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার হবে মাটির নিচ (পাতাল) দিয়ে। এ রুটে স্টেশন হবে ৯টি। এগুলো হলো-গাবতলী, দারুস সালাম, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান-২ ও নতুনবাজার। আবার নতুনবাজার থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার (শূন্য দশমিক ৯০ কিলোমিটার) হবে উড়াল পথে।

এই রেলপথটি নির্মাণ কাজ শেষ হবে ২০২৮ সালে। এই মেট্রোরেল নির্মাণে ইতোমধ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে। প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসের জন্য জাইকার সঙ্গে ৭ হাজার ৩৫৮ মিলিয়ন ইয়েনের চুক্তিও হয়েছে। এ মেট্রোরেলটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা।

চতুর্থ মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৫) দক্ষিণ ॥ এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন (দক্ষিণ) নির্মাণ হবে গাবতলী-আফতাবনগর-দাশেরকান্দি রুট। উড়াল ও পাতাল পথের সমন্বয়ে এই রেলপথটি হবে ১৭ দশমিক ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মধ্যে গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত ১২ দশমিক ৮০ কিলোমিটার হবে মাটির নিচ (পাতাল) দিয়ে।

মাটির নিচে স্টেশন হবে ১২টি। এগুলো হলো-গাবতলী, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজগেট, আসাদগেট, রাসেল স্কয়ার, পান্থপথ, সোনারগাঁও মোড়, হাতিরঝিল, নিকেতন ও আফতাবনগর পশ্চিম। আফতাবনগর কেন্দ্র থেকে আফতাবনগর পূর্ব হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ৪ দশমিক ৬০ কিলোমিটার অংশ হবে উড়াল (এলিভেটেড) পথে। এই রুটে স্টেশন হবে ৩টি। এগুলো হলো- আফতাবনগর সেন্টার, আফতাবনগর পূর্ব ও দাশেরকান্দি। এই রেলপথের নির্মাণ কাজ শেষ হবে ২০৩০ সালে। প্রকল্প নির্মাণের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২৩ কোটি টাকা।

পঞ্চম মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-২) ॥ উড়াল ও পাতাল পথের সমন্বয়ে গাবতলী থেকে কাঁচপুর সেতু হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে এই এমআরটি লাইন-২ রেলপথ। এর সম্ভাব্য রুট হলো গাবতলী-বসিলা-মোহাম্মদপুর বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ড-সাত মসজিদ রোড-ঝিগাতলা-ধানম-ি-২ নম্বর রোড-সায়েন্সল্যাব-নিউমার্কেট-নীলক্ষেত-আজিমপুর-পলাশী-শহীদ মিনার-ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ-পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স-গোলাপশাহ মাজার-বঙ্গভবনের উত্তর পাশের সড়ক-মতিঝিল-আরামবাগ-কমলাপুর-খিলগাঁও-মুগদা-মা-া-ডেমরা-কাঁচপুর হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যুক্ত হবে। এই রেলপথ গাবতলী থেকে মুগদা পর্যন্ত হবে মাটির নিচ দিয়ে। মুগদা থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত হবে উড়াল পথে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

ষষ্ঠ মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৪) ॥ এমআরটি লাইন-৪ উড়ালপথে নির্মাণ করা হবে এই মেট্রোরেল। রাজধানীর কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে রেলপথটি। ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া কথা রয়েছে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথের পাশ দিয়ে এই মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে রেলপথটি নির্মাণের কথা রয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন সিদ্দিক বলেন, ‘ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে ২০৩০ সালের মধ্যে ৬টি রুটের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী মেট্রোরেল ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ সব মেট্রোরেলের রুটের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। উড়াল মেট্রোরেল নির্মাণের পাশাপাশি পাতাল মেট্রোরেলও নির্মাণ করা হবে। এমআরটি লাইন ১, ২ ও ৫-এ উড়াল পথের পাশাপাশি পাতাল রেলপথ নির্মাণ করা হবে।’

কেমন হবে মেট্রোরেল ॥ বিদ্যুতচালিত হবে মেট্রোরেলের প্রতিটি ট্রেন। মেট্রোরেলের লাইনের দুই পাশে খুঁটির মাধ্যমে ট্রেনে বিদ্যুত সংযোগ দেয়া হবে। এই ব্যবস্থাটিকে বলা হয় ‘ওভারহেড ক্যাটিনারি সিস্টেম’। প্রতিটি ট্রেনে ডিসি ১৫০০ ভোল্টেজ বিদ্যুত সরবরাহ ব্যবস্থা থাকবে।

সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) হবে মেট্রোরেলের প্রতিটি কোচ। দুই প্রান্তে দুটি চালক কোচ (ট্রেইলর কার) সহ মোট ৬টি কোচ থাকবে একটি ট্রেনে। দুটি চালক কোচে ৪৮ জন করে যাত্রী বসতে পারবে। বাকি চারটি কোচে (মোটরকার) ৫৪ জন যাত্রী বসার ব্যবস্থা থাকবে। সব মিলিয়ে একটি ট্রেনে ৩০৬ জন বসতে পারবে। প্রতিটি কোচ সাড়ে ৯ ফুট চওড়া। মাঝখানের প্রশস্ত জায়গায় যাত্রীরা দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করবে। দাঁড়ানো যাত্রীদের ধরার জন্য ওপরে হাতল এবং স্থানে স্থানে খুঁটি আছে। সব মিলিয়ে একটি ট্রেনে বসে এবং দাঁড়িয়ে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩০৮ জন যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন।

কোচের ভেতরে দুই সারিতে সবুজ রঙের লম্বা আসন রয়েছে। মাঝখানের প্রশস্ত খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থা থাকবে। দাঁড়ানো যাত্রীদের জন্য ওপরের দিকে হাতল রয়েছে। ট্রেনের কোচগুলো এমন এভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যাতে স্টেশনে থামার পর এর মেঝে একেবারে প্ল্যাটফর্মের সমতলে থাকে। এতে সহজেই যাত্রীরা হেঁটে ট্রেনে উঠতে পারবেন। কোচের দুই পাশে চারটি করে দরজা। ভাড়া পরিশোধের জন্য থাকবে স্মার্ট কার্ড টিকেটিং ব্যবস্থা।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.