স্বার্থপর বেশি মেধাবীর চেয়ে পরোপকারী মেধাবীরা দেশের সম্পদঃ জেলা প্রশাসক ঝালকাঠি

শিক্ষাবার্তা ডেস্ক।।
জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ ২০২২ উপলক্ষে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসন ও জেলা শিক্ষা অফিস পুরস্কৃত করলো ঝালকাঠির নলছিটি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক ও শিক্ষামূলক জনপ্রিয় অনলাইন “শিক্ষাবার্তা” র সহকারী সম্পাদক বিন-ই-আমিন কে। আজ ৩১ জুলাই রোববার দুপুর ১২টায় ঝালকাঠির জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে তাকে সনদ ও ক্রেষ্ট প্রদান করেন জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সরদার মো শাহ আলম। আরো উপস্থিত ছিলেন ঝালকাঠি  সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. ইউনুস আলী, জেলা শিক্ষা অফিসের গবেষণা ও মূল্যায়ন কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ।
জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ ২০২২ এর পুরস্কার গ্রহণ করে জেলা পর্যায়ে ৩ বার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জণ করেও বিভাগীয় পর্যায়ে বাদ পড়ার কারন জানালেন ঝালকাঠির নলছিটি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষামূলক অনলাইন “শিক্ষাবার্তা” র সহকারী সম্পাদক বিন-ই-আমিন। তিনি কারিগরি শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষায় বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি অবহেলা ও বৈষম্য নিয়ে কথা বলেন। তিনি যা বলেন শিক্ষা বার্তার পাঠকদের উদ্দেশ্য তা তুলে ধরা হলোঃ-
কারিগরি শিক্ষা নিয়ে এতো প্রচার প্রচারণা ও উন্নয়নের বেড়াকালে প্রকৃত শিক্ষা পাচ্ছেনা কারিগরি শিক্ষায়? বর্তমান সরকার ২য় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর শিক্ষা ক্ষেত্রের উন্নয়নে নানামুখি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। শিক্ষায় উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রতি উপজেলায় একটি স্কুল জাতীয়করণের যে ৩১৬টি প্রতিষ্ঠান তালিকায় স্থান পেয়েছে  তার মধ্যে সবগুলোই কারিগরি সংযুক্ত প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া প্রতি উপজেলায় একটি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপনের যে পরিকল্পনা চলমান তাও বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কারিগরি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করলে কারিগরি শিক্ষার প্রসার আরো বেগবান হবে বলে তিনি মনে করেন। অসচেতন অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। তাদের সন্তানরা কারিগরি শিক্ষায় ভর্তিতে আগ্রহ দেখাবে। কারিগরি শিক্ষকদের দূর্দিন ঘুচবে। তবে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কারিগরি বিষয় অন্তর্ভুক্তির গাইডলাইন নিয়েও হতাশার কথা ব্যক্ত করেন তিন বার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কারিগরি শিক্ষক ।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কারিগরি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে কারিগরি শিক্ষার প্রসারে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানান। তিনি বলেন,যেদেশ যতো উন্নত সে দেশ কারিগরি শিক্ষায় ততো দক্ষ।  আমাদের দক্ষ জনবলের খুব অভাব রয়েছে। কারিগরি শিক্ষায় আমাদের অবস্থান শতকরা ২০ এর কম। বিদেশে গিয়েও অদক্ষ শ্রমিকরা কম বেতনে চাকরী করেন। তাছাড়া বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের আরো দক্ষতা অর্জণ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
শিক্ষা সপ্তাহের সেরা শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার জন্য কারিগরি শিক্ষক যারা ডিপ্লোধারী তাদের শিক্ষা সনদের সাথে কারিগরি বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার জন্য আলাদা নম্বর বিভাজন হওয়া উচিত। কারিগরি শাখার শ্রেষ্ঠ শ্রেণি শিক্ষক নির্বাচনে কখনো মাত্র ২টি সনদ নিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা খুব কঠিন। কারিগরি শাখায় জেনারেল শিক্ষক যারা সাধারণ বিষয় পড়ান তারাই এগিয়ে থাকেন। টেকনিক্যাল কেউ খুব বেশিদুর যেতে পারেনা। যেহেতু ট্রেড ইন্সট্রাক্টরদের ডিপ্লোমা পাস সনদের মাধ্যমেই চাকুরী নিতে হয়। যেখানে ডিপ্লোমার সাথে বাড়তি কোনো সনদের প্রয়োজন হয়না,দরকারও নেই।  সেক্ষেত্রে কারিগরি শাখার নন টেক শিক্ষকদের কমপক্ষে ৩টি সনদের প্রয়োজন। স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হলে ডিপ্লোমাধারীদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সমস্যা আরো বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে যদি ডিপ্লোমাধারীদের কারিগরি বিষয়ে অতিরিক্ত জ্ঞানের জন্য নম্বরের ব্যবস্থা থাকে তাহলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব।
কারিগরি শিক্ষার প্রসারে নিম্নলিখিত পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে মনে করেন।
১) শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়ন সবার আগে জরুরি। কারিগরি শাখার শিক্ষকদের বেতন ছাড় হয় সাধারণ শিক্ষা  ও মাদরাসা শিক্ষার শেষে। সরকারি স্কুলে একই যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকগণ মাসের শুরুতেই সকল সুবিধা পেয়ে যান। বেসরকারি শিক্ষকগন যারা সাধারন শাখায় প্রায়শইঃ ঈদের সময় সবাই আগে বেতন তুলতে পারলেও বেসরকারি  কারিগরি শিক্ষকরা ঈদের পর বেতন পেয়ে থাকেন। এটা কস্টের ও লজ্জার বলে মনে করেন তিনি।
২) এনালগ থেকে ডিজিটালে রুপান্তর জরুরী। সাধারণ শিক্ষা ও মাদরাসা শিক্ষায় এমপিওভূক্তি,স্কেল পরিবর্তন ও সংশোধন সহ যাবতীয় কাজ আগে হলেও কারিগরি শাখা পিছিয়ে। অথচ কারিগরি শাখার আধুনিকায়ন অনেক আগেই হওয়া  জরুরী ছিলো। ইএফটি নামক সোনার হরিণটি মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষায় একটু উঁকি মারলেও কারিগরি শাখায় কোনো খবর নেই। সরকারি মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষার সাথে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুযোগ সুবিধার বিরাট ব্যবধান বা বৈষম্য। এসব বৈষম্যের সমাধান না হলে মানসম্মত শিক্ষা আশা করা কঠিন।
৩) কর্তা ব্যক্তিদের কারিগরির প্রতি আন্তরিক হওয়া। রুটিন ওয়ার্ক করতে করতেই শেষ হয় কারিগরি শাখার দায়িত্ব প্রাপ্তদের  কাজ। আন্তরিকতা দেখানোর মতো পরিবেশ পরিস্থিতি তাদের থাকেনা।
৪) কারিগরি দক্ষ লোক দিয়ে কারিগরি অধিদপ্তর ও বোর্ড পরিচালনা করা। সাধারণ শিক্ষা ও বিসিএস থেকে নেওয়া লোকবল দিয়ে কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন অসম্ভব।  সরকারের সঠিক সিদ্ধান্ত সমূহ বাস্তবায়নেও কারিগরি বান্ধব কর্মকর্তাদের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন।
৫) বেসরকারি কারিগরি  মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি গুরুত্বারোপ । কাচামালের অভাবে ব্যবহারিক ক্লাস না হওয়া,ভালো শিক্ষার্থী ভর্তি হতে অনিহা,অভিভাবক ও সচেতন মহলকে কারিগরি বিষয়ে সঠিক তথ্য জানানো বলে মনে করেন তিনি।
৬) কাঁচামাল সরবরাহ ও ব্যবহারিক ক্লাসের প্রতি গুরুত্বারোপ। যেহেতু কারিগরি শিক্ষা ব্যবহারিক ক্লাস নির্ভর সেহেতু তাত্ত্বিক ক্লাস অপেক্ষা ব্যবহারিকের দিকে গুরুত্বারোপ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা জরুরি। বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সরকারের বিশেষ নজর দেওয়ার আশা করেন।
৭) কারিগরি শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে রেডিও, টিভি,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সহ সব ক্ষেত্রে প্রচারণা বৃদ্ধি করা জরুরি। অভিভাবকদের সাথে মতবিনিময়, উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি,প্রতিষ্ঠানের সাথে মতবিনিময় করার ব্যবস্থা করতে হবে।
পরিশেষে শিক্ষকের জীবনমান উন্নয়ন বৈষম্যহীন শিক্ষায় খুব জরুরী। একই সিলেবাস পড়িয়ে এবং শতকরা ৯৭ ভাগ ফলাফল উপহার দিয়ে বেসরকারি শিক্ষক সরকারি যেকোনো দপ্তরের একজন পিওনের চেয়েও কম সুযোগ সুবিধা নিয়ে দিনাতিপাত করে মানসম্মত শিক্ষা উপহার দিতে পারেনা। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শিক্ষকূের ব্যাপারে আরো আন্তরিক হতে হবে। তাদের ন্যায্য দাবী দাওয়া পুরন করতে পারলেই বৈষম্যহীন ও মানসম্মত শিক্ষা আশা করা সম্ভব।

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.