নিজস্ব প্রতিবেদক।।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে কেনা বন্ধ রাখায় জ্বালানি সঙ্কটে বাধ্য হয়ে বন্ধ রাখতে হচ্ছে বিদ্যুত উৎপাদন। এমন অবস্থায় প্রথমে বিশ্ববাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ে দাম বাড়ানোর চিন্তা করা হলেও ভোক্তাদের কথা মাথায় রেখে রেশনিংয়ের সিদ্ধান্তই নিল সরকার। সঙ্কট কাটাতে প্রতিদিন এলাকাভিত্তিক এক ঘণ্টা করে লোডশেডিংসহ নেয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিদ্ধান্ত। এতে করে আপাতত সঙ্কট কাটার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে, এতসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করার পরও সঙ্কট না কাটলে এক সপ্তাহ পরে সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিবেচনা করা হবে বলে জানানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।
সোমবার সকালে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের সঙ্কটে উদ্ভূত সমস্যা মোকাবেলায় এক জরুরী বৈঠক করা হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। সভা থেকে জানানো হয়, মঙ্গলবার থেকে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিংয়ে যাচ্ছে দেশ। সরকারী-বেসরকারী অফিস ভার্চুয়ালি করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে সভায়। ওই বৈঠকে দেশজুড়ে প্রতিদিন এলাকাভিত্তিক এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং দেয়া সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শুধু তাই নয়, পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত ডিজেলচালিত বিদ্যুতকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সপ্তাহে একদিন বন্ধ রাখা হবে পেট্রোলপাম্পও। রাত আটটার পর দোকানপাট, শপিংমল বন্ধ না করলে বিদ্যুত বিচ্ছিন্ন করা হবে। সরকারী অফিস-আদালতের সভা- সেমিনার আবারও অনলাইনে করার চিন্তাভাবনাসহ অফিস সময় এক থেকে দুই ঘণ্টা কমিয়ে আনার কথাও বলা হয়। শুধু তাই নয়, মসজিদ-মন্দিরসহ সব ধরনের উপাসনালয়ে অপ্রয়োজনে এসির ব্যবহার বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয় সরকারের পক্ষ থেকে।
বৈঠক সম্পর্কে সোমবার বিকেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, এটা একটা বৈশ্বিক সঙ্কট। বিশ্বের অন্যান্য বড় বড় দেশকেও এই সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে নানা উপায়ে। আমরা গ্রাহকদের ওপর দামের বাড়তি চাপ না দিয়ে যতটা সম্ভব বিদ্যুত সাশ্রয়ের চিন্তা করছি। এ জন্য আজকের বৈঠকে মঙ্গলবার (আজ) থেকে এক ঘণ্টা করে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং হবে। এক ঘণ্টায় যদি বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবেলা করা সম্ভব না হয়, তাহলে দুই ঘণ্টা করে লোডশেডিং বাস্তবায়ন করা হবে। তবে, কোন এলাকায় কখন লোডশেডিং তা আগেই জানিয়ে দেয়া হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, লোডশেডিং কোথাও টানা এক ঘণ্টা দেয়া হবে না। দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আধ ঘণ্টা করে সব মিলিয়ে এক ঘণ্টা করা হতে পারে। তবে, এতে করেও সঙ্কট না কাটলে এক সপ্তাহ পর দুই ঘণ্টা করে লোডশেডিং দেয়া হতে পারে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সঙ্কটের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নানা রকম সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করেছে। কিছু কিছু দেশ দাম বৃদ্ধি করেছে। কেউ কেউ সাশ্রয়ী নীতি নিয়েছে। আমাদের দেশে যে পরিমাণ ডিজেল আমদানি হয়, তার ১০ ভাগ বিদ্যুত উৎপাদনে ব্যবহার হয়। আর বাকি ৯০ ভাগ ব্যবহার হয় অন্য খাতে। এখন যদি আমরা ১০ ভাগ বিদ্যুতে বন্ধ করার পর যদি অন্য খাত থেকে আরও ১০ ভাগ বাঁচাতে পারি, তাহলে আমাদের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। তাই এখন ডিজেলভিত্তিক বিদুতের ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪০ টাকা। কিন্তু আমরা বিক্রি করে এই অর্থ পাচ্ছি না। আমরা এখন গ্যাস প্রতি এমএমবিটিইউ ৩৯ ডলারে কিনে এনে সাত টাকায় বিক্রি করছি। তাই আমাদের সাশ্রয়ের দিকে যেতেই হবে। সরকার কত ভর্তুকি দেবে? কৃষিতে ভর্তুকি দিচ্ছে, সারে ভর্তুকি দিচ্ছে, নানা খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। এমন অবস্থায় জ্বালানি খাতে আর ভর্তুকি দেয়া সম্ভব নয়। আবার দাম বাড়ালেও গ্রাহকের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। তাই সবারই উচিত, এ সময়টা সাশ্রয়ে সহযোগিতা করা। তিনি বলেন, শুধু মসজিদ নয়, উপাসনালয়ে (মসজিদ, মন্দির ও গির্জা) সবখানে প্রচুর এসি লাগানো হয়েছে। প্রার্থনার সময় বা নামাজের সময় তারা যেন মিতব্যয়ী হয়ে এসিটি চালান। প্রার্থনা শেষ হলে তারা যেন এসি সময়মতো বন্ধ করেন, আমাদের সাজেশন এটাই থাকবে। আমাদের এভাবে আলোচনা হয়েছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা অনেক জায়গায় দেখেছি, নামাজের সময়টুকু বাদ দিয়েও অনেকে এসি চালায়। এ জন্য আমি অনুরোধ করব, আপনারা নির্দিষ্ট সময়ে এসি ছাড়তে পারেন। যতটুকু পারেন, সাশ্রয় করুন, এটাই আমার অনুরোধ।
নসরুল হামিদ বলেন, পেট্রোলপাম্প সপ্তাহে একদিন বন্ধ রাখার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও আমরা আলোচনা করছি। বিপিসি পেট্রোলপাম্প ওনার্স এ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে বসে আলোচনা করার পর সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
এ সময় এক হাজার মেগাওয়াটের ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে উল্লেখ করে নসরুল হামিদ বলেন, এটি সাময়িক ব্যাপার, খুব দীর্ঘমেয়াদী নয়।
কখন হবে লোডশেডিং ॥ আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকে এক সপ্তাহ জোনভিত্তিক এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং হবে। তবে, এতে যদি সাশ্রয় কম হয়, তাহলে আরও এক ঘণ্টা বাড়ানো হবে।
কখন, কোথায় লোডশেডিং হবে কিভাবে জানবেন ॥ কোথায়, কখন লোডশেডিং হবে- এ তথ্য কিভাবে জানা যাবে জানতে চাইলে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বিকাশ দেওয়ান বলেন, এলাকাভিত্তিক সম্ভাব্য লোডশেডিংয়ের তালিকা করে ওয়েবসাইটে আপলোড করে দেয়া হচ্ছে। গ্রাহকরা ওয়েবসাইটে গেলেই সেখানে একটি লিংক পাবেন, সেখানে ক্লিক করে তাদের এলাকার সম্ভাব্য লোডশেডিংয়ের সময় জানতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বৈঠকে দেশের সব বিদ্যুত বিতরণ কোম্পানিকে এ ধরনের তালিকা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, শীঘ্রই পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ওয়েবসাইট ও লিংক প্রকাশ করা হবে।
পরে দুপুর দেড়টার দিকে ডিপিডিসির ওয়েবসাইটে গিয়ে এ সংক্রান্ত একটি লিংক পাওয়া যায়। বিভিন্ন বিদ্যুত কোম্পানির ওয়েবসাইটে দেয়া এমন লিংকেই লোডশেডিংয়ের তথ্য পাওয়া যাবে।
রাত ৮টায় দোকান বন্ধে সাশ্রয় হবে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত ॥ রাত আটটায় দোকান বন্ধের বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে গিয়েছে। মনে করা হচ্ছে, এতে অন্তত দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত সাশ্রয় হবে। তবে, এখনও এই হিসাব পাকাপোক্ত নয়। ঢাকার দুই বিতরণ কোম্পানি বাণিজ্যিক গ্রাহকদের লোড হিসাব করছে। পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, আমরা মনে করছি এতে অন্তত দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত সাশ্রয় হবে। মার্কেটগুলোতে বড় বড় এসি চলে। লাইটও জ্বালানো হয়। রাত আটটার পর যদি এগুলো বন্ধ করা যায়, তাহলে দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত কম প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, সন্ধ্যায় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় আমাদের তেলভিত্তিক বেশি দামের বিদ্যুতকেন্দ্র চালাতে হয়। জ্বালানিও বেশি খরচ হয়। ফলে রাত আটটায় সব বন্ধ রাখলে বিপুল পরিমাণ অর্থের সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বলেন, আমরা হিসাব করছি কি পরিমাণ সাশ্রয় হবে। এ জন্য একটি টিমকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। একই কথা বলেছেন ঢাকায় বিদ্যুত বিতরণকারী আরেক সংস্থা ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাউসার আমির আলি। তিনি বলেন, আমরা দোকানদারদের উদ্বুদ্ধ করছি যেন তারা আটটার মধ্যে দোকান বন্ধ করেন। এতে কি পরিমাণ সাশ্রয় হবে, তাও আমরা হিসাব করে দেখছি। তবে, সেই হিসাব এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
৯টা থেকে ৩টা পর্যন্ত অফিস করার প্রস্তাব, হয়নি সিদ্ধান্ত ॥ বিদ্যুত সাশ্রয়ের লক্ষ্যে অফিস সময় সকাল ৯ থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত করার প্রস্তাব এসেছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মোঃ ফরহাদ হোসেন। তবে, এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি বলে জানান তিনি। সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, অফিস সময় কমানো হতে পারে অথবা ওয়ার্ক ফ্রম হোম হবে। অফিসে যতটুকু না করলেই নয়, এমনভাবে বিদ্যুত ব্যবহার করার বিষয়টি চিন্তা করছি। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে জানাব। মানুষের কষ্ট যাতে না হয়, সেটা বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেব।
বিষয়টি আলোচনার পর্যায়ে আছে জানিয়ে তিনি বলেন, কেউ বলছে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা বা ৪টা, তবে এটা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা চলছে। যেটা করলে ভাল হয়, সেটাই করব। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সিদ্ধান্তটা আমরা নেব। আমরা সব বিষয় বিশ্লেষণ করে সঠিক কাজটি করার চেষ্টা করব।
কি বলছে পেট্রোবাংলা ॥ পেট্রোবাংলা বলছে, দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় ৭শ’ থেকে সাড়ে ৭শ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আমদানি করা হয়। কিন্তু বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দাম উর্ধমুখী হওয়া বর্তমানে ৫শ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আমদানি করা হচ্ছে। স্পট মার্কেটে যে গ্যাসের দাম ছিল ১৫ ডলারের মতো, তা বর্তমানে ৪১ ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে। এতে করে ৫শ’ কোটি টাকা মূল্যের গ্যাস এখন কিনতে হচ্ছে ১৫শ’ কোটি টাকায়, যা দেশের মানুষের টাকা দিয়েই কিনতে হবে। তাই দেশের মানুষের স্বার্থেই স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনা বন্ধ রয়েছে জানিয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান জনকণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় ৫শ’ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করি, আর বাকি ২০০ কখনও কখনও তা ২৫০ মিলিয়নও হয়, সেটা আমরা স্পট মার্কেট থেকে আমদানি করতাম। এখন বিশ্ববাজুড়ে এলএনজির দাম অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ রেখেছি। এর ফলে কিছুটা গ্যাস ঘাটতি হচ্ছে। তবে, তা মোট চাহিদার খুব সামান্য পরিমাণ। তিনি বলেন, সরকারী হিসাবে আমাদের মোট চাহিদা ২৮শ’ থেকে ২৮শ’ ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের। বর্তমানে আমরা ২৩শ’ থেকে ২৫শ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছি। এ ক্ষেত্রে মাত্র আট থেকে ১০ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় করতে পারলেই আমাদের সঙ্কট মোকাবেলা করা সম্ভব।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
