এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষকদের ছেলেমেয়েরা কিন্ডারগার্টেনে

নিউজ ডেস্ক।।

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তিতে কোনো টাকা লাগে না। লাগে না মাসিক বেতনও। রয়েছে শতভাগ উপবৃত্তির ব্যবস্থাও। তবুও অধিকাংশ শিক্ষকের সন্তান পড়াশুনা করছেন কিন্ডারগার্টেনে। এই চিত্র রাজধানীসহ দেশের সবগুলো বিভাগীয় সদর, জেলা ও উপজেলার।

গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই তাদের সন্তানদের ভর্তি করছেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সরকারি এ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নিয়ে রয়েছে নানান অভিযোগ। প্রাথমিক শেষে মাধ্যমিকে ভর্তিতে পোহাতে হয় বহু ভোগান্তি।

ফলে উচ্চ ও মধ্যবিত্তের পাশাপাশি অসচ্ছলরাও বাধ্য হয়ে সন্তানদের পড়াচ্ছেন বেসরকারি স্কুল-কলেজে। রাজধানীর প্রায় সবকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার, চালক ও অন্যান্য পেশার নিম্ন আয়ের মানুষের সন্তানরা। একেক স্কুলে একেক সমস্যা।

কোনোটিতে রয়েছে শিক্ষক সংকট। কোথাও ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা কম কিংবা উপস্থিতি কম। রয়েছে শ্রেণিকক্ষের সংকট। আবার কোথাও কোথাও নেই দপ্তরি, নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নকর্মী। ফলে খানিকটা অনিরাপদ রয়েছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কোনো কোনো স্কুলে রাতে বসছে মাদকসেবীদের জমজমাট আড্ডা।

কোনো কোনো স্কুল মাঠে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাইভেটকার, পিকআপ, রিকশা ও ভ্যান রাখা হয়েছে। অনেক স্কুলে সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠান হয়। এছাড়া এক ভবনেই স্কুল কার্যক্রম ও দুই স্কুলের পাঠদান, নেই খেলাধুলা বা বিনোদনের ব্যবস্থা। বার্ষিক খেলাধুলাগুলোর আয়োজন হয় ভাড়া মাঠে বা অন্য স্কুলে। প্রায় স্কুলের বহু পুরাতন ভবনে ঝুঁকি নিয়েই চলছে পাঠদান। কোথাও দেয়াল থেকে খসে পড়ছে আস্তর।

কোমলমতি শিশুদের জন্য ব্যবহূত শৌচাগারগুলো অপরিচ্ছন্ন। প্রচণ্ড এই গরমে অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষে নেই বৈদ্যুতিক ফ্যান। এসব দেখার জন্য নেই কোনো অভিভাবক। স্কুলের বাউন্ডারি ঘিরে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট টংদোকান। শিক্ষার্থীদের সামনেই বিক্রি হচ্ছে সিগারেট। স্কুল গেটে রয়েছে ভাসমান ভাজাপোড়ার দোকান এবং পাশেই রয়েছে আবর্জনার স্তূপ।

ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। রাজধানীতে রয়েছে ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর মধ্যে সরকারি কালাচাঁদপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাহজাদপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাড্ডার নূরের চালা ও উত্তর বাড্ডার প্রাথমিক বিদ্যালয়, মতিঝিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পুরান ঢাকার বাংলাবাজার, সুরিটোলা ও একই স্কুলের চতুর্থতলায় রমনা রেলওয়ের উচ্চবিদ্যালয়।

এছাড়া মিরহাজিরবাগ উচ্চবিদ্যালয়, ধানমন্ডি ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খিলগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খিলগাঁও গভ. কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, এসব স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষকের সন্তান কিন্ডারগার্টেনে পড়ছে। ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত শাহজাদপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফাহিমা আক্তারের নিজ সন্তান এ প্রতিষ্ঠানেই পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশুনা করছেন বলে জানান।

তবে স্কুলটির বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী এ প্রতিবেদককে বলেন, তাদের প্রধান শিক্ষকের সন্তান এ স্কুলে পড়াশুনা করে না এবং এ শিক্ষকের সন্তানকে চিনেও না। তবে প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য শিক্ষকদের সাথে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়নি।

প্রধান শিক্ষক বলেন, আমার স্কুলটি একটু উন্নত মানের এলাকায় অবস্থিত, ফলে এখানে টিনশেডের ঘরগুলো ভেঙে নতুন নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে। ফলে এখানের বাচ্চারা অন্য এলাকায় চলে গেছে। তবুও স্কুলে অন্য এলাকা থেকে বাচ্চারা এসে পড়াশুনা করছে। এখানে নিম্নবিত্তের বাচ্চারাই বেশি পড়াশুনা করছে। তবে করোনা পরবর্তী মধ্যবিত্তের বাচ্চারাও এখানে পড়াশুনা করছে।

তিনি আরও বলেন, আমার স্কুলের একটি ভবন অনেক পুরাতন, তাই ওই ভবনে আপাতত ক্লাস চলছে না। এ স্কুলের মাত্র ১২.২ শতাংশ জায়গা রয়েছে। কোনো খেলার মাঠ নেই। আমরা বার্ষিক খেলার আয়োজন করি ভাড়া মাঠে বা অন্য স্কুলে। আমাদের শিক্ষক সংকট রয়েছে এবং আয়া, নিরাপত্তাকর্মী, দপ্তরি নেই। স্কুল পরিষ্কার করার জন্য শিক্ষকরা মিলে একজন আয়া রেখেছি। এ আয়ার টাকা ম্যানেজ করাও কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কালাচাঁদপুর, বাড্ডার নূরের চালা ও উত্তর বাড্ডার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সরকারি প্রাইমারি স্কুলের পড়ার মান অনেক ভালো স্বীকার করলেও নিজ সন্তানকে অন্য প্রতিষ্ঠানে পড়াচ্ছেন।

এমন কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এলাকা ও স্কুলের পরিবেশ ভালো না। তাছাড়া নিজ প্রতিষ্ঠানে নিজ সন্তান পড়তে এলে মনোযোগী থাকে না, সেজন্যই অন্য স্কুলে পড়াই।’

তারা আরও জানান, আমাদের বাচ্চাদের খেলার ব্যবস্থা আছে তবে জনবল সংকট রয়েছে। স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কিছুটা কম। এছাড়া রাজধানীর পুরান ঢাকার সুরিটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুটি প্রতিষ্ঠানের পাঠদান চলে। অন্যটি হলো রমনা রেলওয়ে উচ্চবিদ্যালয়। রমনা রেলওয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু ১৯৭৫ সালে রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে। উদ্যান প্রকল্প হওয়ায় ১৯৮৯ সাল থেকে সুরিটোলা প্রাথমিক স্কুলে পাঠদান চলছে। সুরিটোলা বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬০০।

শিক্ষক আছেন ১৬ জন তবে নিয়মিত ১৩ জন। বিদ্যালয়ের মাঠে পিকআপভ্যান, রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি রাখা হয়েছে। এছাড়া স্কুলে প্রায়সময় রাজনৈতিক প্রোগ্রাম ও সামাজিক অনুষ্ঠান হয়। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরা জানান, এক স্কুলে দুটি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ক্লাস নিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।

এছাড়া করোনার আগে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বেশ ভালো ছিল। করোনার পর তা অনেক কমে গেছে এবং অনেক শিক্ষার্থী ঝরে গেছে। স্কুলে অনুষ্ঠানাদি হওয়ায় শিক্ষার পরিবেশে বিঘ্নতা ঘটছে। রাজধানীর মতিঝিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৪০০।

প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকরা জানিয়েছেন, আমাদের এখানে কোনো দপ্তরি, নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেই। ফলে স্কুলে কয়েকবার চুরির ঘটনা ঘটেছে এবং রাতের বেলায় মাদকসেবীরা স্কুল মাঠে আড্ডা জমায়।

তারা আরও জানান, বছরের শুরুতে ধনীর সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করান। পরে অন্য বেসরকারি স্কুলে বাচ্চাদের নিয়ে যায়। অন্য স্কুলে ভর্তির সুযোগ পেতেই সরকারি স্কুলে ভর্তি করায় তারা। এখানে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী হলো নিম্ন আয়ের ও নিচু পদে চাকরি করা এমন পরিবার থেকে আসা। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক নূরজাহান হামিদা বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেছেন। বাংলাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত। পুরান ঢাকার ৬৩ প্যারিদাস রোডে অবস্থিত বিদ্যালয়টি বন্ধ রয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন জানান, ২০১৯ সালের ৩ মার্চ স্কুল ভবনের ছাদ থেকে পলেস্তার খসে পড়ে। সে সময় থেকেই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রয়েছে। তখন শিক্ষক ছিলেন চারজন এবং শিক্ষার্থী ছিল ৩০ জন। প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কোনো শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী ও কর্মচারী পাওয়া যায়নি।

কাঁলাচাদপুর প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থী সুমি আক্তারের মা বলেন, ‘আমার স্বামী ভ্যানে করে ফলমূল বিক্রি করে। আবার কখনো ভ্যান চালায় বা সময়ে সময়ে সবজি বিক্রি করে। যখন যেটা পারে সেটা করে। আমি নিজেও অন্যের বাসায় কাজ করি। আমরা দিন আনি দিন খাই। ভালা স্কুলে পড়ানোর মতো টাকা নাই। তাই সরকারি স্কুলে পড়াই। আমার মেয়ে উপবৃত্তি পায়। আমার ইচ্ছা আছে মায়াটারে মানুষ করমু।’ সাউথ পয়েন্ট স্কুলে পড়েন তানিফ।

তারা বাবা মনু মিয়া বলেন, ‘সরকারি স্কুলে পড়াশুনার মান ও পরিবেশ ভালো না। তাই এখানে পড়াই। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের সন্তানরাও তো বেসরকারি স্কুলে পড়ে।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রভাষক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন  বলেন, প্রাথমিকে ভর্তি করানো হয় লটারির মাধ্যমে। কিন্তু মাধ্যমিকে ভর্তিতে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়। এতে অনেককে নানান ঝামেলায় পড়তে হয়। এছাড়া প্রাথমিকের একজন শিক্ষার্থীকে ২৯টি যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। কিন্তু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষার্থীদের এ যোগ্যতা অর্জনে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে তা নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকরা সন্দেহাতীত।

ফলে সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষার মান অভিভাবক ও শিক্ষকদের মাঝে প্রশ্ন রয়েছে। তাই ভর্তিতে ভোগান্তি এড়াতে ও ভালো শিক্ষা দিতেই সন্তানকে কিন্ডারগার্টেন বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করান শিক্ষক ও অভিভাবকরা। রাজধানীর অধিকাংশ স্কুলেই অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। খেলাধুলার বা বিনোদনের পরিবেশ নেই। এটা যে শুধু সরকারিতে তা নয়, বেসরকারিতেও খেলাধুলার পরিবেশ নেই।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর মুহাম্মদ মনসুরুল আলমকে ফোন দিলে তিনি কলটি কেটে দেন।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.