অনলাইন ডেস্ক।।
নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার দাউল বারবারপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে স্কুল ড্রেস না পরে হিজাব পরায় ১৮ ছাত্রীকে মারধর করার অভিযোগে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আমোদিনি পালকে শোকজ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৭ এপ্রিল) মারধরের বিষয়টি স্বীকার করেছেন আমোদিনি পাল। তবে মারধরের সময় হিজাব বা ধর্মীয় বিরোধী কোনো কথা আসেনি বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত শিক্ষিকা। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহের অপচেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন আমোদিনি পাল। এঘটনায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জরুরি ভিত্তিতে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বুধবার স্কুলে আসে শিক্ষার্থীরা। এরমধ্যে কয়েকজন স্কুল ড্রেস ছাড়াই হিজাব পরে আসে। বুধবার অ্যাসেম্বলির (জাতীয় সংগীত) সময় লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় হিজাব পরিহিত ছাত্রীদের সহকারি প্রধান শিক্ষিকা আমোদিনি পাল অপমান ও মারধর এবং গালিগালাজ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসময় স্কুলে হিজাব না পরে আসার জন্য বলা হয়। স্কুল ড্রেস ছাড়া স্কুলে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না বলে তাদের জানানো হয়। হিজাব পরিহিত ৮ম, ৯ম ও ১০ম শ্রেনীর ১৮ জন ছাত্রীকে মারধর করা হয়েছে। তার সঙ্গে ছাত্রীদের পিটানোর জন্য শিক্ষক বদিউল আলমকে নির্দেশ দিয়েছেন। এসময় পিটুনি খেয়ে ছাত্রীরা স্কুল ছেড়ে বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি তারা তাদের অভিভাবকদের জানালে এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়। এঘটনায় অভিভাবকেরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন।
ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরে অভিভাবকরা স্কুলে গিয়ে এর প্রতিবাদ জানায়। এসময় অভিযুক্ত শিক্ষিকাকে স্কুলে না পেয়ে ক্ষুদ্ধ অভিভাবকরা স্কুলের চেয়ার টেবিল ভাংচুর করে। খবর পেয়ে থানা পুলিশের ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
অভিভাবকরা জানান, বৃহস্পতিবার অভিযুক্ত শিক্ষিক স্কুলে আসেননি। একটি প্রভাবশালী মহল বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে ছাত্রীদের হেনস্থা করার বিষয় যদি প্রমাণ হয় ওই শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানান তারা।
নির্যাতনের শিকার অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সাদিয়া আফরিন জানায়, জাতীয় সঙ্গীতের লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় কেন হিজাব পরে স্কুলে আসছি এ কথা বলার পর শিক্ষিকা আমোদিনি পাল ইউক্যালিপ্টাস গাছের ডাল দিয়ে মারধর করেন। শিক্ষিকা আমাদের বলেন- ‘স্কুলে কোন পর্দা চলবে না। ঢং করে আসছো। বাসায় গিয়ে বোরখা পড়ে থাকো। যখন তোমরা বাজারে যাবে তখন পর্দা করবে। স্কুলে আসলে মাথার কাপড় ফেলে আসবে। পরদিন থেকে স্কুল ড্রেস পরে আসতে বলেন। এসময় কয়েকজনকে পিটুনির সময় কঞ্চি ভেঙ্গে যায়।
সাদিয়ার মা সাবেরা বেগম বলেন, তার মেয়ে স্কুল থেকে এসে কান্নাকাটি করে। হিজাব পরার জন্য ম্যাডাম তাদের পিটুনি দিয়েছে। মেয়েরা বড় হয়েছে। তারা তো পর্দা করবেই। স্কুলে গিয়েই ভদ্রতা শিখবে। তা না শিখিয়ে যদি এরকম মারপিট করে তাহলে আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তা কোথায়। অভিযুক্ত শিক্ষিকার অপসারণ দাবি করেন তিনি।
দশম শ্রেণির ছাত্রী উম্মে সুমাইয়া আকতারের মা মরিয়ম নেছা বলেন, হিজাব পরে স্কুলে যাওয়ায় মেয়েসহ কয়েক জনকে পিটুনি দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে পিটানোর জন্য শিক্ষিকা আমোদিনি পাল অপর শিক্ষক বদিউল আলমকে নির্দেশ দেন। এই ঘটনার পর তার মেয়ে ক্লাস না করে বাড়ি এসে কাঁদতে থাকে।
অভিযুক্ত অপর শিক্ষক বদিউল আলম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, স্কুল ড্রেস না পরায় ছাত্রীদেরকে শিক্ষিকা আমোদিনি পাল মারধর করেছেন। তবে আমি নিজে কাউকে মারধর করিনি। আপনি কেন বাঁধা দিলেন না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন উত্তর না দিয়ে ফোনের সংযোগ কেটে দেয়।
বিষয়টিকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করা হচ্ছে জানিয়ে অভিযুক্ত সহকারি প্রধান শিক্ষক আমোদিনি পাল বলেন, বিদ্যালয়ে প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। সবাইকে স্কুল ড্রেস পরে আসতে বলা হয়। কিন্তু যে কয়েকজন মেয়েকে শাসন করেছি তারা স্কুল ড্রেস ছাড়া মাঝেমধ্যে হিজাব পরে আসে। অ্যাসেম্বলির সময় হাতে থাকা ছড়ি (কঞ্চি) দিয়ে ৪-৫ জন ছাত্রীকে নামমাত্র শাসন করা হয়েছে। অপরদিকে শিক্ষক বদিউল আলমও ছড়ি (কঞ্চি) দিয়ে ৮-৯জন ছাত্রকে শাসন করেছে। তারা তো আর হিজাব পরে না। মানে মাঝে মাঝে স্কুল ড্রেস পড়ে আবার মাঝে মাঝে হিজাব পরে আসে স্কুলে। ছাত্রীরা হিজাব পরে আসায় তাদেরকে শাসন করেছি এমন গুজব রটিয়ে আমার বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হচ্ছে। যেখানে হিজাব বা ধর্মীয় বিরোধী কোন কিছু আসেনি বা আমি ধর্মীয় রীতির বিরোধিতা করে শাসন করেনি। যে গুজব ছড়ানো হয়েছে তা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
তিনি আরো বলেন, প্রধান শিক্ষককে নিয়ে বেশ কিছুদিন থেকে ঝামেলা হচ্ছে। তিনি কিছুদিনের মধ্যে অবসরে যাবেন। প্রায় ১২ বছর থেকে স্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে আছেন। এসময়ের মধ্যে তিনি শিক্ষক-কর্মচারীসহ ১০জনকে নিয়োগ দিয়েছেন। যার হিসাব তিনি দিতে পারছেন না। তিনি অবসরে গেলে ওই পদে হয়তো সিনিয়ির হিসেবে আমি যাবো এবং তার সকল অনিয়মের তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে এ জন্য আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে স্থানীয়দের মাধ্যমে যারা তার পরিচত তাদের দিয়ে। আমাকে যদি কোন ভাবে সরিয়ে রাখা যায় তাহলে ওই পদে অন্য কেউ যাবে। তাদের স্বার্থ হাসিল করতে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এ ঘটনাকে ইস্যু করে আমাকে কারণ দর্শানো (শোকজ) একটি নোটিশ দিয়েছেন। যা রাতে হাতে পেয়েছি। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। যেভাবে শাসন করেছি তা যদি অন্যায় হয় তবে তা আমি মাথা পেতে নিবো। তবে হিজাব পড়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ধর্মীয় রীতিতে আঘাত হানিনাই। সেই চিন্তাধারা ছিলনা আমার।
শিক্ষার্থীদের মারধরের বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ধরণী কান্ত বর্মণ বলেন, বুধবার (৬ এপ্রিল) প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক কাজে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে গিয়েছিলাম। বৃহস্পতিবার স্কুলে এসে বিষয়টি জেনেছি। স্কুলে হিজাব পরে আসায় শিক্ষিকা আমোদিনি পাল বেশ কয়েকজনকে মারধর করেছেন। কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অবিভাবকদের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি ১৭-১৮জন ছাত্রীকে মারধর করা হয়েছে। যাদের মারধর করা হয়েছে তারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে হিজাব পরে আসতো। তাদেরকে স্কুল ড্রেস পরে আসতে বলেছেন বলে জেনেছি।
তিনি আরো বলেন, বৃহস্পতিবার কোন ছুটি ছাড়াই আমোদিনি পাল স্কুলে আসেননি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থ বলে বিদ্যালয়ে আসতে পারবেন না বলে জানান। আসতে না চাইলে তাকে তো আর জোর স্কুলে নিয়ে আসা যাবে না। বিষয়টি নিয়ে দুপুর আড়াই টার দিকে অভিভাবকরা লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে শিক্ষিকা আমোদিনি পালকে শোকজ করা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ এর জবাব দিতে বলা হয়েছে। স্কুলের নিয়োগ সংক্রান্ত কারনে অভিযুক্ত শিক্ষাকা ও আপনার মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে এ নিয়ে আপনাদের মাঝে বিরোধ চলছে যার কারনে তাকে হেনেস্থা করার জন্য ঘটনাটিকে অন্যখাতে প্রবাহিত করতে আপনি উৎস্কানি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষিকা আমোদিনি পাল, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি স্কুলে ছিলামনা ঘটনার দিন। আর নিয়োগ এর বিষয়গুলো নিয়ম মেনেই হয়েছে। আর কিছুদিন পর আমি অবসরে যবো। তাহলে কেন এমন ভুল কাজ করবো একজন শিক্ষক হিসেবে। তিনিই ভুল কাজ করেছেন বলে আমার উপর দোষ চাপাচ্ছেন।
দাউল বারবারপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি মাহামুদুল হাসান সুমন বলেন, বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ের কমিটির দায়িত্ব পেয়েছি। শিক্ষার্থীদের মারধর করা হয়েছে এবং অভিভাবকরা বিদ্যালয় ঘেরাও করেছে সংবাদ পেয়ে গিয়েছিলাম। অভিভাবকরা বিদ্যালয়ে আমাকে প্রবেশ করতে দেয়নি। তবে শিক্ষার্থীদের কেন মারধর করা হয়েছে তার সঠিক তথ্য আমার জানা নেই। যতটুকু জেনেছি হিজাব পরে স্কুলে আসার কারনে মারধর করা হয়েছে। সঠিক ঘটনা তদন্তের পরই জানা যাবে।
মহাদেবপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হাবিবুর রহমান বলেন, হিজাব পরে স্কুলে আসায় ছাত্রীদের পিটানোর কথা শুনেছি। ঘটনায় ওই শিক্ষিকাকে শোকজ করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
