এইমাত্র পাওয়া

সবেবরাতঃ এক সৌন্দর্যমন্ডিত মুসলিম ঐতিহ্য

আজ পবিত্র শবে বরাত। ১৮ মার্চ শুক্রবার (১৪ শাবান ১৪৪৩, ৪ চৈত্র ১৪২৮) দিবাগত রাতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার দরবারে ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে পবিত্র শবে বরাত পালন করবেন। মহিমান্বিত এই রজনিতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আল্লাহর রহমত, নৈকট্য ও অনুগ্রহ লাভের আশায় নফল নামাজ, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজগার, রোজা, দান-খয়রাত করে থাকেন। অতীতের গুনাহের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা ও ভবিষ্যৎ জীবনের কল্যাণ কামনা করে মোনাজাত করেন। শবে বরাত মাহে রমজানেরও আগমনী বার্তা দেয়।

শব একটি ফারসি শব্দ এর অর্থ রাত। মধ্য শাবান বা অর্ধ শাবান, ইসলামী দিনপঞ্জির অষ্টম মাস শাবান মাসে দিনটির অবস্থান অনুসারে শবে বরাতের নামকরণ। শবে বরাত অর্থাৎ বরাতের রাত। ফারসিতে বরাত শব্দের অর্থ হল ভাগ্য, বণ্টন, নির্ধারিত। হাদিস শরিফে আছে, ‘হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধশাবানের রাতে মাখলুকাতের দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫, ইবনে মাজাহ: ১৩৯০, রাজিন: ২০৪৮; ইবনে খুজাইমা, কিতাবুত তাওহিদ, পৃষ্ঠা: ১৩৬, মুসনাদে আহমদ, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৭৬)।
বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে শবে বরাত পালন ও উদযাপন ইবাদত-বন্দেগীর পাশাপাশি ধর্মীয় সম্প্রীতির উৎস হয়ে ওঠে। শবে বরাত পালন উপলক্ষ্যে প্রতিটি বাড়িতে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন স্বাদের খাবার। এসবের মধ্যে রয়েছে রুটি, বিভিন্ন রুচির হালুয়া, সুজি, মিষ্টান্ন ইত্যাদি। বিকেলে বা সন্ধ্যায় পাড়া প্রতিবেশিদের মাঝে এসব খাবার বিতরণ ও পরিবেশন করা হয়। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় নামাজের তোরজোড়। তসবী হাতে জিকির, দান-খয়রাত ইত্যাদি সবই।
এসব কারণেই কি না জানি না শবে বরাত, কেমন যেন উৎসবের শব্দ হয়ে আছে মাথার মধ্যে। ছোটোবেলার শবে বরাতের সন্ধ্যায় দেখতাম, মায়ের কাছে একটা কল আসা ছিলো বাঁধাধরা। কাছের এক খালাম্মা করতেন। ‘আপা, শাদা শাড়ি তো নাই, সাদায় ছাপা শাড়ি পরলে হবে?’ অথবা ‘আপা, নামাজের নিয়তটা একটু বলে দেন’। মা অক্লান্ত স্বরে বুঝাতেন। কী বোঝাতেন, পরে বলছি। শুনতে শুনতে এমন অবস্থা হয়েছিলো, আমিও হুবহু বলতে পারতাম।
এদিন পাড়ার ছেলেরা পাঞ্জাবী পরে দলে দলে রাস্তায় হাঁটতো। আমাদের ভাইয়ার অবশ্য পাঞ্জাবী পরা নিষেধ, পরদিন স্কুল বন্ধের অজুহাতে ভাইয়াও নেমে পড়তো। আমাদেরও টেবিলে বসার বাধ্যবাধকতা ছিলো না। কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করতাম, আম্মু আমপারার সূরাগুলো রিভিশন করতে বসিয়ে দিতেন। রাত বাড়লে নামাজে দাঁড়াতাম। আমাদের একটা তিনজনী জায়নামাজ ছিলো, ওটাতে আমরা ভাইবোনেরা। আম্মু আলাদা, তার শুভ্র জায়নামাজে।

ছাড়াছাড়া করে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, অর্থ সহ পড়া, কোন জায়গা ভালো লাগলে সব্বাইকে পড়ে শোনানো, এই ছিলো আমাদের পারিবারিক শবে বরাত। মাঝেমাঝে বেশ বড়ো ট্রে খাবার পরিপূর্ণ হয়ে আসত প্রতিবেশী কারোর ঘর থেকে, আম্মুর মুহুর্মুহু নিষেধ সত্ত্বেও। আমরা মনে মনে খুশী চেপে নিতাম, আম্মুর ভুরু কুঁচকে যেত। আর রাতে বাজি ফোটার শব্দে আব্বু ধমকে উঠতেন। বুঝতে শিখছিলাম এই দুই শিক্ষকের কাছেই, শবে বরাত মানে বাড়তি কিছু ইবাদতের স্নিগ্ধতা আর কিছু বাড়াবাড়ি থেকে বেঁচে থাকা।

শবে বরাত কখন আসে? রমজানের সমারোহ যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, মধ্য শা’বান বা নিসফে শা’বানের এই রাতটা আসে। আর মাত্র পনেরো দিন। এর আগে রজব মাস থেকে বাসার মস্ত বোর্ডে লেখা থাকতো দোয়াটা, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাঝাবা ওয়া শা’বান ওয়া বাল্লিগনা রামাদান। ‘ অর্থ : হে আল্লাহ! তুমি আমাদের জন্য রজব ও শা’বান মাসে বরকত দাও এবং আমাদেরকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দাও। শা’বানের ১৫য়, শবে বরাতে এসে মনে হতো, ইস! পাবো তো এবারের রমজানটা? আর একটু বেশি ইবাদত করে আল্লাহর গুডবুকে নামটা ওঠাতে পারবো তো? মাপ করিয়ে নিতে পারবো গুনাহের বোঝা? কীইবা গুনাহ ছিলো সেসময়ের, তবু মনে আসতো বয়সের চঞ্চলতায় দেরি করে নামাজ পড়েছি কত, কতবার ভুলে সামনে চলে গেছি ঘরে বেড়াতে আসা কারুর, কতবার ভাইবোনের সাথে ঝগড়ায় মারামারি করে ফেলেছি।
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজব থেকেই রোজা করতেন, শরীরকে জানিয়ে দিতেন যে সামনে ট্রেনিং এর মাস আসছে। কী চমৎকার এক পদ্ধতি। রাত থাকতেই উঠে খাবার খেয়ে, নামাজ পড়ে, সারাদিন না খেয়ে, আবার ইফতার হতে না হতেই তারাবীহ পড়ে ঘুমিয়ে পড়ার মাস আসছে, আসছে কুরআনের মাস – শরীর আর মনকে সেজন্য তৈরি করে নিতেও শিখিয়েছেন তিনিই। তিনি আল্লাহ্‌, যিনি এই মহিমান্বিত কুরআনকে পাঠিয়েছেন বলে রমজান মাসটাকে রহমতে আবৃত করে দিয়েছেন। শুধু তাই না, আগের আর পরের মাসগুলোতেও প্রস্তুতি আর নানা স্মারক দিয়ে রেখেছেন। ভুলোমন মানুষ যেন কিছুতেই লাগামটা হারিয়ে না ফেলে নিজের মনের, ইচ্ছের, প্রবৃত্তির। শুধু ধর্মীয় লাভই না, রমজানের রোজা, প্রতি মাসে চাঁদের ভরাট হওয়ার সময়ের রোজার নানাবিধ শারীরবৃত্তীয় উপকারও আছে। এইসব মনে হলে সত্যিই ইসলামকে স্বীকার করে নিতে হয় সর্বশ্রেষ্ঠ দ্বীন বা জীবনবিধান হিসেবে, মহামহিম আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় নুয়ে আসে অন্তর।
হজরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ সিজদা করলেন যে আমার ধারণা হলো তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তখন উঠে তার পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম, তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়লো; তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করে আমাকে লক্ষ করে বললেন, “হে আয়শা! তোমার কি এ আশঙ্কা হয়েছে?” আমি উত্তরে বললাম, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.), আপনার দীর্ঘ সিজদা থেকে আমার আশঙ্কা হয়েছিলো আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি না।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘তুমি কি জানো এটা কোন রাত?’ আমি বললাম, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলই ভালো জানেন।’ তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘এটা হলো অর্ধ শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন, ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করে দেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন।’ (শুআবুল ইমান, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৮২)।

এবার আবার আসি আমার মায়ের গল্পে। শবে বরাত নিয়ে কাউকে বলতে হলে যে হাদিসগুলো স্মরণ করিয়ে দিতেন আর যে ভুল ধারণাগুলো শুধরে দিতেন, সেগুলোকে লিখছি।

১. সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, লাইলাতুল নিসফে মিন শা’বান এর রাত্রিতে আল্লাহ মুশরিক ও বিদ্বেষে লিপ্ত মানুষ ছাড়া অন্যদেরকে ক্ষমা করেন। কিন্তু এই রাত্রিতে বিশেষ কোনো আমল করতে হবে বা এই রাত্রির ক্ষমা লাভের জন্য বান্দাকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে বলে সহীহ হাদিস বর্ণিত হয়নি।
২. এই রাত্রিতে ব্যক্তিগতভাবে একাকী কবর যিয়ারত করা মৃতদের জন্য ক্ষমা চাওয়া, নিজের পার্থিব ও পারলৌকিক কল্যাণ ও মুক্তির জন্য প্রার্থনা করার উৎসাহ প্রদান করে কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হাদীসগুলি সবগুলির সনদেই দুর্বলতা আছে। তবে কয়েকটি হাদীসের দুর্বলতা সামান্য। একাধিক বর্ণনার মাধ্যমে যে দুর্বলতা দূরীভূত হয়। প্রথম প্রকারের সহীহ হাদিস, এই পর্যায়ের বিভিন্ন সামান্য দুর্বল বা ‘হাসান লি-গাইরিহী’ পর্যায়ের হাদিস এবং কোনো কোনো তাবিয়ীর কর্মের আলোকে আমরা মনে করি যে, এই রাত্রিতে ব্যক্তিগতভাবে কবর জিয়ারত করা বা মৃতদের জন্য দোয়া করা, ব্যক্তিগতভাবে একাকী ইবাদাত ও দোয়া মুনাজাতে রত থাকা সুন্নাত সম্মত।
৩. এই সকল ইবাদাত দলবদ্ধভাবে আদায় করা, সেজন্য মসজিদে বা অন্য কোথাও সমবেত হওয়া, উক্ত রাতে বিশেষ ভাবে গোসল করা, নির্দিষ্ট সূরা পাঠের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করে নামাজ আদায়, হালুয়া-রুটি তৈরি ও বিতরণ করা, বাড়ি, গোরস্থান বা কবরে আলোকসজ্জা করা ইত্যাদি কর্ম একেবারেই ভিত্তিহীন, সুন্নাত বিরোধী এবং নব-উদ্ভাবিত কর্ম।

৪. ১৫ ই শা’বানের দিবসে রোজা পালনের ফযীলতে কোনো নির্ভরযোগ্য হাদীস বর্ণিত হয়নি। তবে শা’বান মাসে বেশি বেশি রোজা পালন,বিশেষত প্রথম থেকে পনের তারিখ পর্যন্ত রোজা পালন

রাসূল ﷺ এর সুপরিচিত সুন্নাত। এ ছাড়া প্রত্যেক মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখ রোজা পালনও সুন্নাত নির্দেশিত গুরুত্বপূর্ণ মুস্তাহাব ইবাদাত। এ জন্য সম্ভব হলে শা’বানের প্রথম ১৫ দিন, না হলে অন্তত ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা পালন করা উচিত।
৫. এই রাত্রিতে ভাগ্য লেখা হয় মর্মে রাসূল ﷺ ও সাহাবীগণ থেকে বর্ণিত সকল হাদীস দুর্বল।
৬.সূরা দুখানে উল্লেখিত ‘মুবারাক রজনি’ বলতে “শবে বরাত” বুঝানো হয়নি, বরং “শবে কদর” বুঝানো হয়েছে। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের সমন্বিত অর্থ ও সাহাবী-তাবিয়গণের ব্যাখ্যার আলোকে এ কথা নিশ্চিত যে, মুবারাক রাত বলতে লাইলাতুল কাদর বুঝানো হয়েছে। কাজেই সূরা দুখানের আয়াতগুলি মধ্য-শাবানের রজনীর জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে মধ্য শাবানের রাতের পৃথক মর্যাদা রয়েছে।

৭. মেয়েদের নামাজের বিরতি থাকলেও জায়নামাজে বসে কিংবা যে-কোনোভাবে মুখেই সমস্ত দোয়া, জিকির করা যায়। সুতরাং কেউ এই সময়টায় যেন নিজেকে ইবাদত থেকে বঞ্চিত না করেন।

সত্য সবসময় সোজা, সহজ, সাবলীল এবং অপরিবর্তনীয়। আর ভুল রঙ পালটায়, ভুল পথে মানুষ হারিয়েও যায়। আল্লাহর কাছে এই পবিত্র রাতে দোয়া করি, আল্লাহ্‌ আমাদের সবাইকে সঠিক পথের সন্ধান দিন, যে পথ সহজ, সরল। সামনের রমজানটা পাবার জন্য নেক হায়াত দিন। আল্লাহুম্মা আমীন।

লেখক: মারদিয়া মমতাজ, লেকচারার, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.