এইমাত্র পাওয়া

নতুন বইয়ের সেই ঘ্রাণ নেই, অপঠিতই রয়ে গেল কবিতা

এ কোন্ ফেব্রুয়ারি?

মোরসালিন মিজান ॥

নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নাকে আসছে না। বাংলা একাডেমিজুড়ে শূন্যতা। লেখক পাঠক প্রকাশকদের সমাবেশ ঘটেনি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বইমেলাহীন অদ্ভুত এক বইমেলার মাস। একই মাসে দেশী-বিদেশী কবিতা পাঠের বিশাল এক মঞ্চ গড়া হতো। হেকিম চত্বরের চেনা সেই মঞ্চটিও হয়নি এবার। অপঠিত রয়ে গেছে কবিতা। ভাষার মাসে আরও কত শত আয়োজন, সবই থমকে গেছে। বসন্ত উৎসবের প্রস্তুতিও চলছে মনে মনে। ফেব্রুয়ারিকে তাই ফেব্রুয়ারির মতো মনে হচ্ছে না।

অবশ্য শুধু বইমেলা বা কবিতা উৎসব নয়, সব কিছুই তছনছ করে দিয়েছে কোভিডের কাল। সেই কবে শুরু হয়েছিল সংক্রমণ! এরই মাঝে বহু প্রিয় মানুষকে ছুঁ মেরে নিয়ে গেছে। তার পরও পুরোপুরি বিদায় নিচ্ছে না মহামারী করোনা। জীবন এখনও স্বাভাবিক হয়নি। ছন্দ হারা। অমর একুশে গ্রন্থমেলায়ও এর প্রভাব পড়েছে। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে শুরু হয় বাঙালীর প্রাণের মেলা। এদিন প্রধানমন্ত্রী সশরীরে বাংলা একাডেমিতে উপস্থিত থেকে মেলার উদ্বোধন করেন। সবার দৃষ্টি থাকে সেদিকে। এর পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই বইপ্রেমীদের ঢল নামে মেলায়। ভাষা শহীদদের স্মৃতি বিজড়িত মেলা নতুন করে বাঙালীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটায়।

একাডেমির তথ্য মতে, ১৯৭৯ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আয়োজন করা হয়ে আসছে। কখনও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। এবার ঘটল। অমর একুশের বইমেলা ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে শুরু হচ্ছে মার্চে। বহু টানাপোড়েন শেষে ১৮ মার্চ মেলা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। শেষ হবে ১৪ এপ্রিল। ফলে অন্যান্যবার এই সময়ে একাডেমি গমগম করলেও, এখন নিঃসীম শূন্যতা।

বুধবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করে মেলার ছিটে ফোটাও চোখে পড়ল না। বইয়ের স্টল প্যাভিলিয়ন কিছুই নির্মাণ করা হয়নি। এমনকি মূল কাঠামো দাঁড়ায়নি এখনও। বরং উন্মুক্ত মাঠে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে এমন দৃশ্য দেখতে হবে, কেউ কি ভেবেছিল? ভাবতেই মন কেমন যেন মরে যায়। বিষণœতা এসে ঘিরে ধরে।

উদ্যানে ক্রিকেট খেলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সোহান। এক ওভার বল করে ফিল্ডিংয়ে ফিরলে কথা হয় তার সঙ্গে। খেলায় থেকেই তিনি বলছিলেন, খেলি তো প্রতিদিনই। করোনার কালে প্রচুর খেলা হয়েছে। বইমেলাটা বরং নতুন হতে পারত। কিন্তু হলো না। মেলা হচ্ছে না এমন ফেব্রুয়ারি প্রথম দেখছেন জানিয়ে তিনি বলেন, বই কম পড়লেও, মেলা মিস করছি। সত্যি।

বাংলা একাডেমি চত্বরে অল্প জায়গা। তবে সবার উপস্থিতে এ সময় সরগরম হয়ে ওঠে। এখন উল্টো ছবি। প্রিয় প্রাঙ্গণ সাজানো হয়নি। লেখক পাঠক বা প্রকাশকদের কাউকেই দেখা যায়নি ছোটাছুটি করতে। একাডেমির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মোটামুটি কাজ শুরু করেছেন। মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব জালাল আহমেদের ব্যস্ততা একটু বেশি। নিজের কক্ষে বসেই কাজ করছিলেন।

কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, প্রতি বছরই ১ ফেব্রুয়ারি ঘিরে দিন-রাত কাজ করি আমরা। এবার ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা হলো। ওই দিন সবাই যে যার রুটিন কাজ করেছি। মোটেও ভাল বোধ করিনি। মনে হয়েছে, কী যেন নেই। কোথায় যেন একটা শূন্যতা। তবে শেষতক মেলাটি হচ্ছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির জনকের জন্মশতবর্ষে আমরা নীরব থাকব না। এটা খুব আনন্দের ব্যাপার। বৈরী সময়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিয়েছে একাডেমি। সবার সহযোগিতা পেলে নিউ নরমাল সময়ের এ মেলা নতুন আবেদন নিয়ে সামনে আসতে পারে বলে মনে করেন তিনি। ফেব্রুয়ারি মাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন জাতীয় কবিতা উৎসব। ভাষার মাসের প্রথম দিন সবচেয়ে বড় এ কবিতা উৎসবের আয়োজন করা হয়। দুই দিনব্যাপী জাতীয় কবিতা উৎসবের সূচনা হয়েছিল ১৯৮৭ সালে। বড় দুঃসময় তখন। এরশাদের স্বৈরশাসনে বিপর্যস্ত দেশ। গণতন্ত্র নির্বাসনে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। বিকৃত করা হচ্ছে ইতিহাস। রাজনীতিবিদরা কিছুটা যেন ক্লান্ত।

সৈয়দ শামসুল হকের ভাষায় : ‘তখন আমাদের কবিদের কাঁধে ইতিহাস দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়। আমরা ভাঙ্গনের ওপরে নির্মাণের জন্য এগিয়ে আসি। শুরু হয় জাতীয় কবিতা উৎসব।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত উৎসব স্বৈরাচারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা থেকে শুরু করে দেশের সব বরেণ্য কবিরা এতে যোগ দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কবিতার শক্তি।

এর পর থেকে চলে আসছে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে কবিরা এসে এখানে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। আমন্ত্রিত হয়ে আসেন অন্য দেশের কবিরাও। বিভিন্ন ভাষার কবিতা উৎসবকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল করেছে। কিন্তু এবার ফেব্রুয়ারির ১ ও ২ তারিখ গত হয়েছে। কবিতা উৎসব শুরু করা যায়নি। কবিতাপ্রেমীদের মন তাই বিষণœ।

আয়োজক জাতীয় কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তারিক সুজাত বলছিলেন, কবিতা উৎসব আমাদের বিরাট এক আবেগের জায়গা। শক্তির উৎস। এ কারণে আগে কখনই কবিতা উৎসব বন্ধ হয়নি। একবার পিছিয়ে ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি আয়োজন করা হয়েছিল। তবে এবার ৩৫তম আয়োজনটি করোনা পরিস্থিতির কারণে বড় বাধার মুখে পড়েছে। তাছাড়া কবিতা উৎসব আয়োজন করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় উৎসবটি আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে না। মন খারাপ হলেও, অনুকূল সময়ে উৎসব ঠিকই আয়োজন করা হবে বলে জানান তিনি।

একই কারণে অমর একুশের অনেক অনুষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে এমনটি এবারই প্রথম। কিন্তু মেনে নেয়ার কোন বিকল্প নেই।

এদিকে, বসন্ত উৎসবের সময়টিও ঘনিয়ে আসছে। করোনাকালে কতটা উদ্যাপন করা যাবে উৎসব? অনিশ্চয়তা এখনও দূর হয়নি। ফুল ফুটছে। গাইতে শুরু করেছে কোকিল। কিন্তু বাঙালীর উদ্যাপনের কী হবে? ভেবে অনেকেই মন খারাপ করে আছেন।

তবে বসন্ত উৎসবের আয়োজক মানজার চৌধুরী সুইট জানাচ্ছেন, এবারও ফাল্গুনের প্রথম দিন ঢাকায় বসন্ত উৎসবের আয়োজন করা হবে। সে লক্ষ্যে সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। এর চেয়ে ভাল খবর আর কী হতে পারে?

বসন্ত উৎসবের পরই পরই বইমেলা। বইমেলার পর হয়ত আয়োজন করা যাবে কবিতা উৎসব। এভাবে বারো মাসে তেরো পার্বন। সবই উদ্যাপন করবে বাঙালী। আপাতত এ প্রত্যাশায় দিন গুনছেন সবাই।সুত্র জনকন্ঠ


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.