এইমাত্র পাওয়া

জিপিএ-৫ ধারীদের উচ্চশিক্ষায় হোঁচট

ঢাকাঃ ২০২২ সালের উচ্চ মাধ্যমিকে ফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ লাখের কাছাকাছি শিক্ষার্থী। স্বাভাবিকভাবেই এসব শিক্ষার্থীর অধিকাংশের প্রথম লক্ষ্য থাকে মেডিকেল, বুয়েট ও স্বনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া।

কিন্তু এ ধরনের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রথম বর্ষে ভর্তিযোগ্য যত আসন আছে, এর প্রায় চারগুণ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়। ভালো ফল করেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী কাক্সিক্ষত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন ন্যূনতম পাস নম্বর পান না। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষাতেই হোঁচট খাচ্ছেন তারা।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে যেসব দক্ষতা অর্জন করার কথা, অধিকাংশ শিক্ষার্থী তা ঠিকমতো অর্জন করতে পারছে না। এই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট অর্থাৎ স্নাতক (সম্মান) ভর্তি পরীক্ষায় এবার অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। আর ফেল করেছে ৯০ দশমিক ৩১ শতাংশ। উচ্চ মাধ্যমিকের বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক-এই তিন শাখার শিক্ষার্থীরাই এই অনুষদের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। শুধু এবার নয়, কয়েক বছর ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে।

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত কলা অনুষদের অধীন ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথমে ইংরেজি বিভাগে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন মাত্র ২ জন। অথচ এই ইউনিট থেকে তখন বিভাগটিতে আসন ছিল ১২৫টি। পরে অবশ্য অন্যভাবে সমস্যার সমাধান করা হয়। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য বলছে, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে পড়ে প্রায় পৌনে ২ কোটি ছেলেমেয়ে। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটির কিছু বেশি। আর কলেজে মোট শিক্ষার্থী প্রায় অর্ধকোটি। বাকি শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা, মাদরাসা, ইংরেজি মাধ্যমসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিটি শ্রেণিতে যা শেখার কথা, তা শিখিয়েই শিক্ষার্থীদের ওপরের শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করা উচিত। না হলে শিখনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হবে। করোনার কারণে শিখন ঘাটতি নিয়ে পরের শ্রেণিতে উঠেছে শিক্ষার্থীরা। এই শিখন ঘাটতি পূরণে শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা দেওয়া ছাড়া শিখন পদ্ধতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

গণসাক্ষরতা অভিযানের ‘এডুকেশন ওয়াচ’ নামে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনাকালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই এই দূরশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নেয়নি। নিয়েছে মাত্র ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। এর আগে গত বছর ব্র্যাকের এক জরিপে বলা হয়েছিল, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের ৫৬ শতাংশ টেলিভিশনের ক্লাসে অংশ নেয়নি। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের বড় পদ্ধতি হলো পরীক্ষা। কিন্তু করোনার বাস্তবতায় সেটিও বাতিল করতে হয়েছে। ফলে ঘাটতি নিয়েই ওপরের শ্রেণিতে শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, করোনার আগে ২০১৯ সালে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে শিখন অর্জনের গড় হার ছিল প্রায় ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ তখনই প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী শিক্ষাক্রম অনুযায়ী যা অর্জন করার কথা ছিল, তা করতে পারেনি। এখন এই হার কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশ। পঞ্চম শ্রেণির বাংলা, গণিত ও বিজ্ঞানেও আগের তুলনায় অবনতি হয়েছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী জটিল বাক্য ও শব্দ পড়তে পারে না। এসব গবেষণার তথ্য বলছে, বড় ধরনের দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে ওপরের ক্লাসে উঠছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা। মাধ্যমিকে গিয়েও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ইংরেজি ও গণিতে দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে থাকে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্ট (মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জাতীয় মূল্যায়ন) প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থীর ইংরেজিতে অবস্থা খারাপ। একই শ্রেণিতে গণিতে ৪৩ শতাংশের অবস্থা খারাপ বা গড়পড়তা। এই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, শিক্ষা পদ্ধতি হয়ে পড়েছে প্রাইভেট পড়া, কোচিংয়ে দৌড়ঝাঁপ। পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষকরা মূল্যায়ন করে দেখবেন বাচ্চারা শিখছে কি না? যারা শিখছে না তাদের সময় দিয়ে শেখাতে হবে। ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে সব শিক্ষার্থীকে শিখিয়ে নিতে হবে। সবাইকে একসঙ্গে পারদর্শী করতে হবে। তা হলে দেশের সবখানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের পথ সুগম হবে। তিনি বলেন, মানসম্মত শিক্ষার জন্য মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের পথ সুগম করতে হবে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৫/০৭/২০২৩   

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.