এইমাত্র পাওয়া

ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো

অধ্যাপক ডা. মো. ইয়াকুব আলী ।।

ক্যানসার যে কোনো বয়সী নারী-পুরুষের হতে পারে। এটি একটি ক্ষত, টিউমার অথবা অদৃশ্য রক্তের শ্বেতকণিকায় হতে পারে। ক্যানসার সৃষ্টি হয় মাত্র একটি কোষ থেকে। মানব শরীর লাখো কোটি কোষ দিয়ে সৃষ্টি। এ কোষের মূল উপাদান হলো ক্রোমোজম। এ ক্রোমোজমের মধ্যে আছে অসংখ্য জিন।

প্রতিটি জিন একটা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রক্ষা করে বা কর্মসম্পাদনের জন্য দায়ী থাকে। এমন একটি জিন হলো প্রটোঅনকোজিন। আরেকটি হলো ক্যানসার সাপ্রেসরজিন। সাপ্রেসরজিন কাজ করে শরীরে যাতে ক্যানসার হতে না পারে, সে জন্য। প্রটোঅনকোজিন অনকোজিন হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। কোনো কারণে যদি ক্যানসার সাপ্রেসরজিন কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে বা প্রটোঅনকোজিন অনকোজিনে রূপান্তরিত হয় অথবা উভয় প্রক্রিয়া একই সঙ্গে ঘটে, তাহলে অনকোজ বা টিউমার অথবা নিওপ্লাসিয়া কিংবা ক্যানসার সৃষ্টি শুরু হয়। জন্মগত অনেকের জেনেটিক সমস্যা থাকে। এ কারণে অল্প বয়সে, এমনকি দুবছরের কম বয়সীর চোখে, কিডনি ও ব্রেইন ক্যানসার হয়।

জিনের এ নষ্ট হয়ে যাওয়া বা কার্যকারিতা হারানোর প্রক্রিয়ার নাম সেলুলার মিউটেশন। এটি বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে হয়ে থাকে। যেমন- রেডিয়েশন এক্স-রে, গামা-রে, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, তামাকের ধোঁয়া, অ্যাসবেস্টস, আলকাতরা, আর্সেনিক, ডিডিটি পাউডার, কাপড়ে রঙ করার এনিলিনডাই, হিউম্যান প্যাপিলমা ভাইরাস ইনফেকশন, হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস ইত্যাদি। বেশি চর্বিযুক্ত ও ছত্রাকযুক্ত খাবার, বেশি মাংসভোগী এবং কম সবজি ও কাঁচা ফল গ্রহণকারীর ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। যে মা সন্তানকে বুকের দুধ পান করান না ও যে নারী সন্তান গ্রহণ করেননি অথবা আদৌ বিয়ে করেননি, তাদের স্তন ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। যেসব মানুষ একাকিত্ব জীবনযাপন ও সবসময় বিমর্ষ থাকেন, তাদের ক্যানসার বেশি হয়। ধূমপানের ধোঁয়ার মধ্যে থাকে প্রচুর পরিমাণে কার্সিনোজেন। এটি ক্যানসার সৃষ্টি করে বা করতে চায় (সেলুলার মিউটেশনের মাধ্যমে)। তামাকের ধোঁয়ার মধ্যে কার্সিনোজেন হচ্ছে কেমিক্যাল কার্সিনোজেন। ধূমপানের ফলে ফুসফুস, স্বরনালি, গলনালিসহ প্রায় প্রতিটি অঙ্গে ক্যানসার হতে পারে।

উপসর্গ : ক্যানসারের উপসর্গ নির্ভর করে শরীরের কোন অঙ্গে ক্যানসার হয়েছে এবং রোগ কোন পর্যায়ে আছে, তার ওপর। যেমন- মুখগহ্বরে ক্যানসার হলে দীর্ঘদিন স্থায়ী একটি ক্ষত থাকবে, ব্যথা থাকতে পারে। চোয়ালের নিচে লিম্পনোড ফুলে উঠতে পারে। গলার মধ্যে ক্যানসার হলে খাবার গিলতে অসুবিধা, ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট হতে পারে, বিলম্ব হলে গলায় বা ঘাড়ে লি¤পনোড দেখা দিতে পারে। খাদ্যনালিতে হলে ক্রমে খাবার গিলতে অসুবিধা হবে। শক্ত খাবার থেকে শুরু করে তরল খাবার পর্যন্ত এবং গলার মধ্যে আটকে থেকে বমি হয়ে বেরিয়ে যাওয়া। পাকস্থলী ক্যানসারের ক্ষেত্রে ক্ষুধামান্দ্য, বমি ভাব, বমি হওয়া, পেটব্যথা করা, কালো মল হওয়া। ফুসফুসের ক্যানসার হলে- কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, গলার স্বর বসে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। স্তন ক্যানসার হলে- একটি পি- বা চাকা, ব্যথা, স্তনের চামড়া কুঁচকে যাওয়া এবং বগলে চাকা হতে পারে। বৃহদান্ত্রের ক্যানসার হলে- মলত্যাগে অনিয়ম, মলের সঙ্গে রক্ত অথবা তৈলাক্ত পদার্থ যাওয়া ও একপর্যায়ে পায়খানা বন্ধ হয়ে পেট ফুলে যাওয়া এবং পেটব্যথা করা। মলদ্বারের ক্যানসারে মলত্যাগে অসুবিধা, ব্যথা, রক্ত যাওয়া ও বাড়তি অবস্থায় পায়খানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া।

নারীর জরায়ুমুখের ক্যানসার স্তন ক্যানসারের মতোই ভয়াবহ রোগ। নিম্ন আর্থ-সামাজিক পরিবেশ এ রোগের জন্য দায়ী। কারণ পরিচ্ছন্নতার অভাবে ভাইরাল ইনফেকশন বেশি হয়, যা জরায়ুমুখের ক্যানসার হওয়ার জন্য মূলত দায়ী। অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে অল্প বয়সে বিয়ে ও সন্তান হওয়া; বেশি সন্তান প্রসব ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সাদাস্রাব, স্ত্রী সহবাসে রক্তরণ, রক্ত ভাঙা ও ব্যথা করা এ রোগের উপসর্গ। ব্রেইন টিউমার হলে মাথাব্যথা করা, শরীরের নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, হঠাৎ চোখে দেখতে অসুবিধা হওয়া, হঠাৎ খিঁচুনি বা অজ্ঞান হওয়া উপসর্গগুলো এককভাবে বা সমষ্টিগতভাবে হতে পারে।

ব্লাড ক্যানসারের উপসর্গ হলো- দুর্বলতা, রক্তশূন্যতা, দাঁতের মাড়ি বা অন্য স্থান থেকে রক্তরণ, জ্বর, ক্ষুধামান্দ্য, বমি বমি ভাব, ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, কাশি, কণ্ঠস্বর ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি। যকৃত বা লিভার, অগ্ন্যাশয়ে ক্যানসার হলে খাবারে অরুচি, বমি ভাব, বদহজম, পেট ফাঁপা, পায়খানা পরিষ্কার না হওয়া ও পেটব্যথা হতে পারে। আরও অনেক ধরনের ক্যানসার আছে, যেগুলো বিভিন্ন অঙ্গে হতে পারে। উপসর্গও ভিন্নতর। তবে সব ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রে রক্তশূন্যতা কমবেশি হবেই। খাবারে অরুচি, বমি ভাব, কান্তি ও অবসাদ, ওজন কমে যাওয়া- এসব উপসর্গ হবেই।

লেখক : রেডিয়েশন ও মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.