এইমাত্র পাওয়া

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শূন্যের কোটায় বিদেশী শিক্ষার্থী

নিউজ ডেস্ক।।

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে কমতে অনেকটা শূন্যের কোঠায় চলে এসেছে। অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সংখ্যা ইতোমধ্যে শূন্য। কয়েকটিতে হাতেগোনা কিছু শিক্ষার্থী আছে বলে জানা যায়। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে সর্বসাকুল্যে ৬১ জন (অধিভুক্ত মেডিসিন, ডেন্টাল, ইঞ্জিনিয়ারিং ও অন্যান্য কলেজ মিলিয়ে ছয় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০০-এর কিছু বেশি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি প্রোগ্রামে দু’জনসহ সর্বমোট ২০ থেকে ২৫ জন (সম্ভাব্য) বিদেশী শিক্ষার্থী আছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাকি পাবলিক অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে বিদেশী শিক্ষার্থী একেবারেই নেই।

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন ও নানা মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে সেখানে বিদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক সন্তোষজনক স্থানে নিয়ে এলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যলয়গুলো সেটি করতে পারছে না। ফলে দিন দিন বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ের তলানিতে চলে যাচ্ছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বিদেশী শিক্ষার্থীদের না আসা কিংবা এলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হওয়ার পেছনে নানাবিধ কারণ খুঁজে বের করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিদেশী শিক্ষার্থীরা এ দেশে আসার জন্য যেসব চাহিদা প্রকাশ করে তা আসলে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দিতে অক্ষম।

তারা চায় সিঙ্গেল ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ইংলিশ মিডিয়াম পাঠদান পদ্ধতি; কিন্তু আমাদের অধিকাংশ অনুষদেই ইংলিশ মিডিয়াম নেই। এ ছাড়াও একজন বিদেশী শিক্ষার্থীর এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে না আসার পেছনে প্রসেসিং জটিলতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা যায়, একজন বিদেশী শিক্ষার্থী এ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে হলে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যোগাযোগ করতে পারে না। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঘুরে তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। সর্বপ্রথম একজন বিদেশী শিক্ষার্থীকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয় (চিকিৎসাবিষয়ক হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে)। এরপর সরকার প্রার্থীর দেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি অথবা বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রার্থীর দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধির সাথে যোগাযোগ করে।

প্রার্থীর দেশ ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি চুক্তি অনুষ্ঠিত হয়। এরপর প্রার্থীর সব কাগজপত্র নিজ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন অনুমোদিত আধিকারিক দ্বারা নোটারাইজ করতে হয়। এরপর বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন প্রাপ্তির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট অনুষদ বা বিভাগ কাক্সিক্ষত প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীর যোগ্যতা মূল্যায়ন করে। যদি শিক্ষার্থী প্রোগ্রামের জন্য যোগ্য বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদের মতামতের জন্য আবেদনটি সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা ইনস্টিটিউটের অ্যাকাডেমিক কমিটিতে পাঠানো হয়।

সবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) ভর্তির অনুমোদন দেন। পুনরায় এ সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীকে তার ভর্তির পক্ষে একটি অনাপত্তি সনদ প্রদান করে। সব প্রক্রিয়া শেষে প্রার্থী ফি এবং অন্যান্য চার্জ প্রদান করে ভর্তির অনুমতি প্রাপ্ত হয়। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষগুলো মন্ত্রণালয়ের সাথে বোঝাপড়া করে দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়ে সরাসরি শিক্ষার্থীর সাথে যোগাযোগ করে বলে জানা যায়। ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় তারা শিক্ষার্থী বেশি পায়।

বিদেশী শিক্ষার্থীদের না আসা নিয়ে কথা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক রুবাইয়াৎ জাহানের সাথে। তিনি বলেন, একটা রিসেন্ট কারণ তো অবশ্যই কোভিড সিচুয়েশন। আর পাবলিকে শিক্ষার্থীরা না আসার পেছনে কয়েকটি কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে, আমাদের পড়াশোনার মানটা খুব ভালো নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়ার কারণে যারা বিদেশী শিক্ষার্থী আছে তাদের আসার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, পড়ানোর মাধ্যমটা হলো অনেক বড় কারণ। যদিও আমরা বলি, আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান, বিজ্ঞান সম্পর্কিত ও ব্যবসায় অনুষদে সব ইংরেজিতে হলে তারা আসতে আগ্রহী হবে; কিন্তু আসলে তা করা হয় না। আফ্রিকাসহ অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীরা যখন এখানে আসে তারা অনেক উচ্চাকাক্সক্ষা নিয়ে আসে; কিন্তু তারা যখন দেখে এখানে বাংলায় পড়ানো হয়, আবার প্রশ্ন হয় ইংরেজিতে। এটা আসলে তারা নিতে পারে না।

তিনি আরো বলেন, আরেকটি কারণ হলো থাকা-খাওয়ার খরচ। আমাদের দেশে যেসব দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসে তাদের অধিকাংশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে আসে। তারা হয়তো স্কলারশিপ নিয়েই আসে; কিন্তু এখানকার খরচ সেটির সাথে তাল মেলাতে পারে না। আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও তাদেরকে ভালো সার্ভিস দেয়ার মতো সক্ষমতা নেই। এগুলোর পাশাপাশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেও (ছাত্ররাজনীতি) কিঞ্চিৎ দায়ী করেন অনেক শিক্ষাবিদ। তবে অধ্যাপক রুবাইয়াৎ বলেন, আসলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন সেই তুলনায় রাজনৈতিক সহিংসতা নেই। আপনি যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নব্বইয়ের দশকের সাথে এখনকার সময় তুলনা করেন তাহলে দেখতে পারবেন এখন এ রকম অনেক কমে গেছে।

সুতরাং, আমি মনে করি, এই বিষয়গুলো তাদেরকে অনুৎসাহিত করার কথা নয়। গ্লোবাল র্যাংকিংটাই সবথেকে বড় ফ্যাক্ট। বিদেশী শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়মুখী করতে ইতোমধ্যে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু করোনা মহামারী সেই পদক্ষেপকে অনেকটা স্তমিত করে দয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তথ্য আদান-প্রদান, অ্যাকাডেমিক এক্সচেঞ্জ ও বিদেশী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করা হয়েছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স অফিস’। কিন্তু উদ্যোগ আর দফতর খোলা পর্যন্তই সেটি সীমাবদ্ধ আছে।

গত তিন বছরেও সেখানে কোনো কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (বৃত্তি শাখা) ও ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্স অফিসের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) শিউলি আফসার বলেন, আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচারণা অনেক কম ছিল। যার ফলে অনেকে জানতেই পারত না যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কী কী সুবিধা আছে। প্রচারণার কাজটা এখন আমি নিজ দায়িত্বে করছি। আমরা তাদের (বিদেশী শিক্ষার্থী) আমাদের সুবিধাগুলোর কথা জানাচ্ছি, আশা করা যায়, আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে আমরা ভালো ফলাফল পাবো। ইন্টারন্যাশনাল আ্যফেয়ার্সের অফিসে কোনো লোকবল নেই। আমি একা ইমতিয়াজ স্যারের (পরিচালক) সাথে পরামর্শ করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থের কথা চিন্তা করে কাজ করে যাচ্ছি। আমার একার পক্ষে সব কাজ করাও সম্ভব নয়। তাই বৃত্তি শাখার আরো কয়েকজন কর্মচারীর সহায়তা নিতে হচ্ছে।

যার প্রভাব পড়েছে বিদেশী শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে এবং একই সাথে বৃত্তি সেকশনে। জানা যায়, বিদেশী শিক্ষার্থী বাড়াতে আন্তর্জাতিক ডেস্ক করা হয়েছিল। পরে বিদেশীদের চাহিদার ভিত্তিতে ২০১৯-এর সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদকে অবৈতনিক পরিচালক করে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স অফিস চালু করার সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেট। পরে ডেপুটি রেজিস্ট্রার শিউলি আফসারকে (ভারপ্রাপ্ত) উপপরিচালক করা হয়। এভাবে তিন বছর ধরে মাত্র একজন অস্থায়ী কর্মকর্তা দিয়ে চলছে অফিস। এর আগে অফিসের জন্য উপপরিচালক, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কম্পিউটার টাইপিস্ট ও অফিস সহায়ক নিয়োগের কথা ছিল। যদিও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।

শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়; দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র মোটামুটি একই রকম। বারবার উদ্যোগ নেয়া হয় এবং সেই উদ্যোগ প্রতিবারই ওই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। শিউলি আফসার বলেন, যদি মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া যায় তাহলে অনেকটা সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা যায়। আমরা করোনার কারণে অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলাম, তবে এখন ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা করছি। প্রচারণার মাধ্যমে বিদেশী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় সমন্ধে জানাতে পারলে তারা আগ্রহী হবে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে এই বেহাল দশা থেকে বাঁচাতে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথে হাঁটার পরামর্শ দেন শিক্ষাবিদরা। অধ্যাপক রুবাইয়াৎ বলেন, প্রথমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং পড়াশোনার মানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যদি অসন্তোষজনক থাকে তাহলে সেটিকে কিভাবে আপগ্রেড করা যায় সেটি দেখতে হবে। আর পড়ানোর মাধ্যমকে অবশ্যই আন্তর্জাতিকীকরণ করতে হবে, এটা শুধু বললেই হবে না। আরেকটা বিষয় হলো তাদের (বিদেশী শিক্ষার্থী) জন্য স্কলারশিপের ব্যাবস্থা করতে হবে; তবে অবশ্যই দেশীয় শিক্ষার্থীদের সব ধরনের সুবিধা আগে নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে তাদের গবেষণা করার ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে হবে। গবেষণার মান যদি ভালো হয় তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ভালো হবে এবং বিদেশী শিক্ষার্থীরা বেশি বেশি পড়তে আসবে।সুত্র নয়া দিগন্ত


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.