নিউজ ডেস্ক।।
ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ সিসিলির সবচেয়ে বড় শহর পালেরমো। সম্প্রতি এখানেই ২১ বছর বয়সী আলি (ছদ্মনাম) নামে এক বাংলাদেশি যুবকের দেখা পান বিবিসির সাংবাদিক ইসমাইল আইনাসি। বেশ কিছুদিন আগে লিবিয়া হয়ে ইতালি গিয়েছিলেন আলি। ধারাবাহিক কথার একপর্যায়ে আলি বিবিসির কাছে তুলে ধরেন, কিভা্েব কাজের প্রলোভন দেখিয়ে মানবপাচারকারীরা তাকে নিয়ে গিয়েছিল লিবিয়া। আর কিভাবেই-বা তিনি সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হন।
আলি জানান, ২০১৯ সালে তার বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। সে সময় তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ঝুঁঁকিপূর্ণ পন্থায় হলেও বিদেশে গিয়ে কাজের সন্ধান করবেন। এ জন্য বাবা-মার কাছ থেকে অনুমতিও নেন। এ ক্ষেত্রে তাকে উদ্বুদ্ধ করে স্থানীয় একজন দালাল। এই দালালরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশি যুবকদের ধনী দেশগুলোয় বেশি বেতনে কাজের প্রলোভন দিয়ে পোস্ট দেয়। এর আগে আলি ঢাকায় একটি প্রসাধনসামগ্রীর দোকানে কয়েক বছর কাজ করছিলেন। সেখান থেকে যা আয় হতো তা গ্রামে থাকা পরিবারকে দিতেন। তাই উঁচু বেতনের লোভে আলি লিবিয়া যেতে রাজি হন। সিলিলিতে থাকা আরেকজন বাংলাদেশিও বলেছেন,
তিনি মাত্র ১৫ বছর বয়সে দালালের মাধ্যমে ২০১৬ সালে দেশ ছাড়েন। কাগজপত্রে তার বয়স এখন ২১ বছর। তিনি বিদেশে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বয়স কম থাকার কারণে পারছিলেন না। তাই এক দালাল তাকে একটি ভুয়া পাসপোর্ট বানিয়ে দেয়। এভাবে আলির মতো অনেক তরুণের আশাকে পুঁজি করে বাংলাদেশিদের পাচার করে দালালরা। এরা এসব যুবককে প্রথমে দারিদ্র্য থেকে উঠে আসার স্বপ্ন দেখায়। দেখায় অপার সম্ভাবনার দুয়ার। তাদের মধ্যে অল্পসংখ্যক যারা ফাঁদে পা দেন, তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত দেখতে পান- তারা আসলে আটকে পড়েছেন ভয়াবহ গৃহযুদ্ধকবলিত লিবিয়ায়। কিন্তু এর পর আর তাদের ফেরার উপায় থাকে না। পাচার হয়ে লিবিয়া যাওয়ার পর তাদের সামনে থাকে তিনটি সুযোগ- সীমাহীন দুর্দশা, শোষণ আর দাসত্ব।
আলি স্বীকার করেন, লিবিয়া যাওয়ার আগে দেশটি সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না তার। কিন্তু দালাল তার বাবা-মার সঙ্গে দেখা করে বলে, তাদের ছেলে লিবিয়ার কারখানায় কাজ করলে মাসে ৫০০ ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারবে। এ অবস্থায় বাবা-মা জানান, আলিকে বিদেশে পাঠানোর মতো অর্থ নেই তাদের। কিন্তু তার পরও সেই দালাল নাছোড়বান্দা। সে খোঁজ নিতে থাকে আলির পরিবারের কী কী সম্পদ আছে। পরিবারটির ছিল তিনটি বেশ বড় গরু। দালাল তার একটি বিক্রি করে দিয়ে আলিকে বিদেশে পাঠানোর লোভ দেখায়।
শেষ পর্যন্ত ধারদেনা করে আলি দালালের মাধ্যমে পাড়ি দেন লিবিয়া। কিন্তু দেশটিতে পৌঁছতে এক সপ্তাহ লাগে আলির। প্রথমে তারা ঢাকা থেকে বাসে করে যান ভারতের কলকাতায়। তার পর বিভিন্ন ফ্লাইটে করে যান মুম্বাই, দুবাই এবং কায়রো। একপর্যায়ে লিবিয়ার বেনগাজি বিমানবন্দরে পৌঁছেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছার পরই আলির ভুল ভাঙে। কারণ বেনগাজি বিমানবন্দরে ছিল তখন বিশৃঙ্খল অবস্থা। ছিল না কোনো নিরাপত্তা রক্ষী বা পুলিশ নেই। পৌঁছার পরপরই তাকে দালালের নিয়োজিত স্থানীয় প্রতিনিধিরা নিয়ে গিয়ে আটকে রাখে একটি জেলখানার মতো স্থানে। কেড়ে নেওয়া হয় তার সঙ্গে থাকা সব অর্থ। দাবি করা হয় মুক্তিপণ।
ওদিকে ছেলেকে বাঁচাতে দেশে আলির বাবা-মা তাদের পরিবারের শেষ সম্বল দুটি গরুও বিক্রি করে দেন। আলি জানান, বেনগাজিতে তাকে একটি ছোট্ট রুমে আটকে রাখা হয়েছিল। তার সঙ্গে রাখা হয়েছিল আরও ১৫ বাংলাদেশিকে। এর মধ্যে যারা মুক্তিপণ দিতে পারেননি, তাদের খাবার দেওয়া হতো না। খুব খারাপ আচরণ করা হতো। আলি বলেন, অনেক সময় আমার সামনেই তাদের প্রচ- মারধর করা হতো। এমন আহত ব্যক্তিকেও সাহায্য করার কেউ ছিল না। এমনকি তাকে হাসপাতালেও নেওয়া হতো না।
গত কয়েক বছরে লিবিয়ায় পাচারকারীদের হাতে যেসব বাংলাদেশি আটক আছে, তাদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। ২০২০ সালের মে মাসে রাজধানী ত্রিপোলির কাছে মিজদা এলাকায় একটি ওয়্যারহাউজে গুলি করে হত্যা করা হয় ৩০ জন অভিবাসীকে। এর মধ্যে ২৬ জনই বাংলাদেশি। তবে আলির ভাগ্য সুপ্রসন্ন। মুক্তিপণ পেয়ে দালালরা তাকে ছেড়ে দেয়। এর পর বেনগাজিতে একটি বোতলজাত পানির পাম্পে কাজ করেন তিন মাস। তার পর ত্রিপোলিতে এসে কাজ নেন একটি টাইলস ফ্যাক্টরিতে। বর্তমানে লিবিয়ায় আছেন প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি। তাদের অবস্থাও যে খুব ভালো তা বলা যাবে না।
আলি জানান, তাদের অনেককে কোনো বেতন দেওয়া হতো না। থাকতে হতো অসহ্যকর এক অবস্থায়। আমরা কাজ বন্ধ করলেই করা হতো প্রচ- মারধর। আমাদের থাকতে হতো ওই কারখানার মালিকের অধীনে। পালাতে যেন না পারি, সে জন্য কাজ শেষে তিনি আমাদের তালাবদ্ধ করে চাবি নিয়ে যেতেন। সার্বক্ষণিক আমাদের পাহারা দিত দুজন প্রহরী। তবে আমরা পালানোর সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের একজন চেষ্টা করেন কিন্তু দোতলা থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙে ফেলেন।
বেশ কয়েকবার পালানোর ব্যর্থ চেষ্টার পর একজন দয়ালু লিবিয়ান আলিকে সাহায্য করেন। তাকে একটি মসজিদে আশ্রয় নিতে সাহায্য করেন। এ সময় আলির সামনে একটিই পথ খোলা ছিল। তা হলো আবার পাচারকারীর সঙ্গে যোগাযোগ। এ সময় তিনি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ জন্য কথা বলেন দেশে বাবা-মার সঙ্গে। তারা আবারও বিভিন্ন ধারদেনা করে আলিকে টাকা পাঠান। আলি জানান, বাংলাদেশ থেকে ইতালি পর্যন্ত যেতে তার পরিবারের মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ডলার।
শেষ পর্যন্ত গত বছর জুলাইয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেন আলি। সে ছিল আরেক ভয়াল অভিজ্ঞতা। তারা একটি ডিঙ্গি নৌকাতে ছিলেন ৭৯ জন। আলি বলেন, টানা দুই দিন আমরা শুধু সমুদ্রের ভিতর ভেসেছি। এ সময় শুধু পানি আর পানি দেখেছি চারদিকে। এক সময় একটু দূরে দুটি হাঙ্গর দেখতে পাই। কেউ কেউ বলতে থাকেন, তারা আমাদের খেতে আসছে। আমাদের জীবন শেষ। একপর্যায়ে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় ইতালির লাপেদুসা দ্বীপে। সেখান থেকে আসেন সিসিলিতে।
কিন্তু আলির মতো অনেক যুবকেরই এই ভাগ্য হয় না। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে তাদের মারা পড়তে হয় বেঘোরে। আলি বর্তমানে পালেরমোর বাইরে অভিবাসীদের একটি বিশাল ক্যাম্পে বসবাস করছেন। তার সঙ্গে আছেন নাইজেরিয়া, গাম্বিয়া ও সেনেগালের অভিবাসীরা। আলি জানান, ইতালি পৌঁছার পর অভিবাসী হিসেবে তিনি অস্থায়ী কাগজপত্র পেয়েছেন। সেখানে তাকে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি মানবিক সুরক্ষার জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এ রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছেন। খবর বিবিসির।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
