নিজস্ব প্রতিবেদক।।
এমপিও করিয়ে দেয়ার নামে সহকর্মীদের কাছ থেকে ঘুষ নেয়া, স্কুলের টাকা চুরিসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে শিক্ষক নেতা ও রাজধানীর মিরপুর সিদ্ধান্ত হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম রনিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গত শনিবার পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
স্কুলটির একাধিক শিক্ষক বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর- এই ৯ মাসের স্কুলের নিজস্ব অডিটে নজরুল ইসলাম রনির বিরুদ্ধে টাকা চুরির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এরপরই পরিচালনা পর্ষদ তার বিরুদ্ধে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিতে স্কুলের শিক্ষকরাই ছিলেন। ব্যাংক হিসাব প্রতিবেদন থেকেই কমিটি টাকা চুরির সত্যতা পায়। নজরুল ইসলাম রনিকে সাময়িক বরখাস্ত করার পর জোতির্ময় সেন নামে একজন সিনিয়র শিক্ষককে স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এক সময় নজরুল ইসলাম রনি ছিলেন বিএনপি সমর্থিত শিক্ষক সংগঠনের অর্থ সম্পাদক। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাতারাতি নৌকার সমর্থক বনে যান। কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজেই একটি শিক্ষক সংগঠন খুলে বসেন। এরপর দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের দাবিতে কিছু শিক্ষককে নিয়ে আন্দোলনে নামেন। নিজেই নিজের পদ ঘোষণা করে বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরামের ‘মুখপাত্র’ তিনি। এরপর জাতীয়করণের দাবিসহ শিক্ষা প্রশাসনের নানা ইস্যুতে সরকারবিরোধী কাজ শুরু করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিদ্ধান্ত হাইস্কুলের একাধিক শিক্ষক জানান, রনির কর্মজীবনের পুরোটাই জালিয়াতিতে ভরা। তথ্য গোপন করে প্রধান শিক্ষকও হয়েছেন। ফেসবুক আর ইমেইল সহজলভ্য হওয়ায় নিজেকে শিক্ষক নেতাও ঘোষণা করেছেন। জাতীয়করণ শব্দটা বারবার উচ্চারণ করে সাধারণ শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। সর্বশেষ নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ছয়জন শিক্ষককে এমপিও করিয়ে দেয়ার নামে সোয়া লাখ টাকা নিয়েছেন রনি।
তিনি আরো বলেন, তথ্য গোপন করে নজরুল ইসলামরনি প্রথমে জান্নাত একাডেমি হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক পদে ও পরে রাজধানীর মীরপুর সিদ্ধান্ত হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে চাকরি নেন।
এই বিষয়ে নজরুল ইসলাম রনির মতামত বারবার জানার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
‘শিক্ষক নেতার বিচার চেয়ে এমপির ‘ডিও’ ‘ শিরোনামে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ভোরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদন :
একসময় তিনি ছিলেন বিএনপি সমর্থিত শিক্ষক সংগঠনের অর্থ সম্পাদক। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ভোল পাল্টে নৌকার সমর্থক বনে যান। কোনো ধরনের চোটপাট না করে নিজেই একটি শিক্ষক সংগঠন খুলে বসেন। এরপর দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের দাবিতে কিছু শিক্ষককে নিয়ে আন্দোলনে নামেন। নিজেই নিজের পদ ঘোষণা করে বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরামের ‘মুখপাত্র’ তিনি। এরপর জাতীয়করণের দাবিসহ শিক্ষা প্রশাসনের নানা ইস্যুতে সরকারবিরোধী কাজ শুরু করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, স্বঘোষিত এই শিক্ষক নেতা রাজধানীর মিরপুরের সিদ্ধান্ত হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম রনি। তার কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হওয়ার পর বিচার চেয়ে গত ১১ জানুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী বরাবর ‘ডিও’ লেটার দিয়েছেন স্থানীয় সাংসদ মো. আসলামুল হক। এছাড়া করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার যেখানে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে সেখানে এই শিক্ষক নেতা তার স্কুল খোলা রেখে ক্লাস-পরীক্ষা চালু রেখেছেন। এমন অভিযোগ পেয়ে রাজধানীর দারুস সালাম থানার ওসি তোফায়েল আহমেদ গতকাল বুধবার প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম রনিকে থানায় ডেকে নিয়ে জেরা করেছেন
। জানতে চাইলে ওসি তোফায়েল আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখলেও সিদ্ধান্ত হাইস্কুলসহ আরো কয়েকটি স্কুলে ক্লাস-পরীক্ষা চলছে এমন অভিযোগ পাওয়ার পর প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম রনিকে ডেকে নিয়ে এসে মূল ঘটনা জানতে চেয়েছিলাম। প্রধান শিক্ষক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, দশম শ্রেণির সংক্ষিপ্ত সিলেবাস বিতরণের জন্য শিক্ষার্থীদের স্কুলে ডাকা হয়েছিল। ক্লাস-পরীক্ষা হয়নি। এরপর আমি রনি সাহেব বলে দিয়েছি, কোনোভাবেই সরকারের নিয়ম ভাঙা যাবে না।
এদিকে নজরুল ইসলাম রনির বিচার চেয়ে গত ১১ জানুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী বরাবর স্থানীয় সাংসদ যে ডিও লেটার দিয়েছেন তা ভোরের কাগজের কাছে এসেছে। ওই ডিও লেটারে সাংসদ আসলামুল হক লিখেছেন, আমার নির্বাচনী এলাকার মিরপুর সিদ্ধান্ত হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম রনির বিরুদ্ধে ওঠা এমপিও জালিয়াতি, সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা ও জাতির পিতার ছবি অবমাননার বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ওই ডিও লেটারে সাংসদ আরো লেখেন, ১৯১৭ সালে মিরপুর সিদ্ধান্ত হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমান প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম রনির কর্মকাণ্ডে বিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি প্রায় ধ্বংসের পথে। ২০০০ সালের ১৪ মে মিরপুর জান্নাত একাডেমি হাইস্কুলের সৃষ্ট পদে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন তিনি। ওই সময়ে বিধি অনুযায়ী এমপিওভুক্তির সুযোগ না থাকলেও নিয়মবহির্ভূতভাবে অবৈধ উপায়ে তৎকালীন জান্নাত একাডেমির অবসরপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলামের ইনডেক্স নম্বর জালিয়াতি করে এমপিওভুক্ত হন। পরে সিদ্ধান্ত হাইস্কুলে এসে প্রধান শিক্ষক হন এই বিএনপি নেতা। চারদলীয় জোটের আমলে শিক্ষক সমিতির নেতা সেলিম ভূঁইয়ার কমিটির অর্থ সচিবও ছিলেন। এছাড়া মোবাইল চুরির দায়ে জেল খাটা আসামি তিনি।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
