নিজস্ব প্রতিবেদক।।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি)। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (স্কুল ও কলেজ) অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেনের তথ্য-উপাত্ত দিয়েছে সংস্থাটি। টিআইবি বলছে, শিক্ষকের এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সাড়ে তিন লাখ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। আর এসব নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্বে থাকা স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি) এবং কলেজ পরিচালনার দায়িত্বে থাকে গভর্নিং বডির (জিবি) সংশ্লিষ্টরা জড়িত বলেও টিআইবির গবেষণায় উঠে এসেছে।
‘মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশে গতকাল বুধবার দুপুরে আয়োজিত ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় টিআইবি। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, মোহাম্মদ রফিকুল হাসান, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসির পরিচালক ও গবেষণা দলের প্রধান শাহজাদা এম আকরাম, সিনিয়র ফেলো-রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি আবু সাঈদ মো: জুয়েল মিয়া প্রমুখ সংযুক্ত ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে এমপি বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির হস্তক্ষেপে সভাপতি মনোনীত করা হয়। এতে অনেকাংশে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সম্পৃক্ত হতে পারে না, যা শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কমিটির সভাপতি/সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অশিক্ষিত লোক কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। এতে করে শিক্ষকদের সাথে কমিটির সদস্যদের কার্যক্রম পরিচালনায় বিভিন্ন সমস্যা ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।
গবেষণায় আরো উঠে এসেছে, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) কর্তৃক সুপারিশকৃত সহকারী শিক্ষকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগদানে ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। সহকারী গ্রন্থাগারিক নিয়োগে দুই থেকে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। এসব নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়েও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্বে থাকা স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি) ও কলেজ পরিচালনার দায়িত্বে থাকে গভর্নিং বডির (জিবি) সংশ্লিষ্টরা জড়িত।
অন্য দিকে গবেষণা কাজের পরিপ্রেক্ষিতে টিআইবি মনে করছেÑ শিক্ষাপ্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গতিশীলতা আনয়ন এবং শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিতকরণে জাতীয় শিক্ষানীতিতে (২০১০) বিভিন্ন কৌশল নির্ধারণ করা হলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। সেই সাথে শিক্ষা খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে সুনির্দিষ্ট ২০টি সুপাারিশও করেছে সংস্থাটি।
গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহে কেন্দ্রীয়সহ মাউশির বিভিন্ন পর্যায়ের (বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা) কার্যালয় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের ১৮টি উপজেলায় অবস্থিত ৫৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (প্রতি উপজেলায় দু’টি বেসরকারি এমপিওভুক্ত ও একটি সরকারি) থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচনে নতুন ও পুরাতন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি বা সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয়করণকৃত প্রতিষ্ঠান, ভৌগোলিক অবস্থান ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়।
গবেষণা প্রতিবেদনে আইন, বিধি-বিধান ও আদেশ একত্রিত করে শিক্ষানীতির আলোকে একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রবর্তন সম্পর্কে বলা হয়েছেÑ দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর খসড়া শিক্ষা আইনটি নিয়ে কাজ করা হলেও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতায় এটি এখনো কার্যকর হয়নি। নির্বাহী আদেশ ও নির্দেশে মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। টিআইবি জানায়, উন্নয়ন পরামর্শ প্রদানে যথাযথ ক্ষমতা ও দক্ষতাসম্পন্ন একটি ‘প্রধান শিক্ষা পরিদর্শকের অফিস’ স্থাপন, মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসনে যথাযথ জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিশ্চিতে ‘পৃথক মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর’ গঠন, শিক্ষানীতির সময়োপযোগী ও প্রয়োজনে পরিবর্তন করার সুপারিশ তৈরি করা এবং শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পরামর্শকারী সংস্থা হিসেবে আইনের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসিত সংবিধিবদ্ধ একটি ‘স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ গঠন সম্পর্কে বলা হলেও এখন পর্যন্ত সে জন্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। যদিও সম্প্রতি ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ গঠনের কাজ শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নির্বাচনে সরকারি কর্মকমিশনের অনুরূপ ‘বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশন’ গঠন সম্পর্কে বলা হয়Ñ এ ক্ষেত্রে ‘শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠন করা হয়। শিক্ষকদের বেতনভাতা ও অন্যান্য সুবিধার সুপারিশে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা, শিক্ষকদের জন্য নৈতিক আচরণ বিধিমালা প্রণয়ন করা, পেশাগত আচরণবিধি লঙ্ঘনে অভিযুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শাস্তিমূলক পদক্ষেপগুলো সস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে বলা হলেও আজ পর্যন্ত শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিতে উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ বেগবানে প্রত্যেক বিভাগে একটি করে ‘আঞ্চলিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করা, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দক্ষতা মূল্যায়নে নিবিড় পরিবীক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং কোনো দুর্বলতা পরিলক্ষিত হলে বিশেষ ব্যবস্থায় তা দূর করা হবে বলা হলেও কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জন মূল্যায়নে পদ্ধতি নিরূপণ এবং বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ সম্পর্কে বলা হলেও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এতে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের পাঠ আত্মস্থ করতে পারছে কি না তা যাচাইয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় গুণগত শিক্ষার ভিত তৈরিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখা প্রণয়ন করা হলেও এটি বাস্তবায়নে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় চ্যালেঞ্জের (অধিক যোগ্যতা ও দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষক ও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাতে) ঝুঁকি রয়েছে। মাধ্যমিকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অনুপাত পর্যায়ক্রমে ২০১৮ সালের মধ্যে ১:৩০-এ উন্নীত করার কথা বলা হলেও এ পর্যন্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর নির্ধারিত অনুপাত প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সব শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের মনোযোগ দেয়া যেমন সম্ভব হচ্ছে না, শিক্ষার্থীরাও যথাযথ শিক্ষা নিতে পারছে না।
গবেষণায় আরো উল্লেøখ করা হয়, শিক্ষা খাতে একটি দেশের জিডিপির ছয় শতাংশ অথবা বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা উচিত বলে পরামর্শ দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা-ইউনেস্কো। কিন্তু বাংলাদেশে গত ১০ বছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ পর্যালোচনায় দেখা যায় শতকরা হিসাবে এটি ১০ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। শিক্ষা খাতে জিডিপির সাপেক্ষে বরাদ্দ অনেক কম যা দুই শতাংশ থেকে প্রায় তিন শতাংশ। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো শিক্ষা খাতে জিডিপির প্রায় তিন শতাংশ থেকে ছয় শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ দিয়ে থাকে।
শিক্ষা খাতের উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মাঠপর্যায়ের তদারকি ও তত্ত্বাবধান। কিন্তু জনবল ঘাটতির কারণে এ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মাউশি অধিদফতরাধীন এবং এর সহযোগী সংস্থার অনুমোদিত জনবলের বিপরীতে পদের শূন্যতা রয়েছে যেমন উপজেলা/থানা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার অনুমোদিত পদের প্রায় ১২.০ শতাংশ পদ, প্রায় ৬৪.০ শতাংশ উপজেলায় সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ, অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজারের প্রায় তিন শতাংশ পদ, প্রায় ৩৮.০ শতাংশ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ এবং জেলা ও আঞ্চলিক কার্যালয়সহ সহকারী পরিদর্শকের অনুমোদিত পদের বিপরীতে ১১.০ শতাংশ পদ শূন্য।
মাধ্যমিক শিক্ষা খাতে শিক্ষকদের পদোন্নতিতে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। দীর্ঘদিন পদোন্নতি না হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, পাঠদানে উৎসাহ হ্রাস পায়, মানসিকভাবে তারা ভেঙে পড়েন, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেসরকারি এমপিওভুক্ত প্রভাষকদের চাকরিজীবনে প্রভাষক থেকে সর্বোচ্চ সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে। প্রভাষক পদে চাকরির আট বছর পূর্তিতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়ে থাকে।
শিক্ষা খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে টিআইবি যে ২০টি সুপারিশ করেছে তার মধ্যে রয়েছেÑ শিক্ষানীতি ২০১০-এর আলোকে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মাঠপর্যায়ে সরাসরি রাজস্ব খাতের আওতাভুক্ত সমন্বিত জনবল কাঠামো তৈরি করতে হবে। বয়স অনুযায়ী যেসব শিক্ষার্থীর জন্য কোভিড-১৯ টিকা প্রযোজ্য তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে।
অনলাইনে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা, শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পূরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়াও ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে বৃদ্ধি করতে হবে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
