এইমাত্র পাওয়া

পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস বিকৃতি পাঁচ শতাধিক ভুল

নিউজ ডেস্ক।।

ভুলে ভরা মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই। একই সঙ্গে করা হয়েছে ইতিহাস বিকৃতিও। এছাড়া সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক-এমন অনেক বিষয় পাঠ্য বইগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ধরনের পাঁচ শতাধিক ভুল ও বিকৃতির তথ্য সামনে এসেছে। মাধ্যমিক স্তরের নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্ব সভ্যতা’ বইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘মুুজিব নগর সরকারের রাষ্ট্রপতি’ বলা হয়েছে। অথচ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বলা হয়েছে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি’। আবার জাতীয় সংগীতও লেখা হয়েছে ভুল। একই শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে বঙ্গভবনকে লেখা হয়েছে প্রেসিডেন্ট ভবন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যকাল পাঁচ বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ সংবিধানের কোথাও আলাদাভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যের কথা উল্লেখ নেই।

এভাবে মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের (৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত) পাঠ্যবইয়ে প্রায় পাঁচ শতাধিক ভুল ও ইতিহাস বিকৃতি তুলে ধরে হাইকোর্টে রিট করেছেন একজন অভিভাবক। ওই রিটের শুনানিকালে গতকাল হাইকোর্ট বলেছেন, দেশে যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সরকার ক্ষমতায়, তখন এ ধরনের ভুল হয় কিভাবে? জনগণের কাছে কি বার্তা যায়? এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে। এর পেছনে কারা তা চিহ্নিত করা দরকার। আগে দু’জন আসুক। এসে কি ব্যাখ্যা দেয় দেখা যাক। ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে শিক্ষা সচিবকেও ডাকা হবে।

পাঠ্যপুস্তকে ভুল ও ইতিহাস বিকৃতির বিষয়ে করা রিটের প্রাথমিক শুনানিকালে গতকাল রবিবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এমন মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে পাঠ্যপুস্তকে থাকা এসব ভুল ও ইতিহাস বিকৃতির ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান এবং বোর্ডের একজন সদস্য (কারিকুলাম)কে তলব করেন হাইকোর্ট। আগামী ১০ নভেম্বর তাদের সশরীরে হাজির হয়ে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

এছাড়া এদেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে নিয়ে বিকৃতি ও ভুলে ভরা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবইয়ের দায়সারা ও দায়িত্বহীন প্রকাশনা কেন অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে এবং ওইসব ভুল ও বিকৃতি সংশোধনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। চার সপ্তাহের মধ্যে শিক্ষা সচিব, ন্যাশনাল কারিকুলাম অ্যান্ড টেক্সটবুক বোর্ডের চেয়ারম্যান, সদস্য (কারিকুলাম), সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের জবাব দিতে বলা হয়েছে। আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আলী মুস্তফা খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার। রিট আবেদনটি দায়ের করেন ভিকারুননিসার নবম শ্রেণির একজন ছাত্রীর বাবা একজন অভিভাবক মো. আলমগীর আলম।

আদেশের পরে বিপুল বাগমার বলেন, আমি আদালতকে বলেছি, জাতির পিতাকে নিয়ে এ সময় যদি তথ্য বিকৃতি হয়, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় রয়েছেন। কারা করছেন, কেন এ ধরনের ভুল করেছেন, কোন উদ্দেশ্যে করেছেন, সেটা তদন্ত করা দরকার। আদালত রুল জারি করেছেন এবং দুজনকে তলব করেছেন। আইনজীবী আলী মুস্তফা খান বলেন, বইতে আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক না লিখে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা লেখা হয়েছে। এ থেকে ভবিষ্যত প্রজন্ম কি শিখবে? এছাড়াও অনেক ইতিহাস বিকৃতি করা হয়েছে বইতে। এজন্য রিট করা হয়েছে। আদালত রুল জারি করেছেন এবং দুজনকে তলব করেছেন।

রিট আবেদনে ৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে অন্তত পাঁচশ ভুল ও ইতিহাস বিকৃতি তুলে ধরা হয়েছে। এস এস পাবলিকেশন্সের একাদশ শ্রেণির পৌরনীতি ও সুশাসন (দ্বিতীয় পত্র) বইয়ের সপ্তম অধ্যায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করা হয়েছে। নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা বইয়ের একাদশ অধ্যায়ের ১৫৩ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘মাইল’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ বর্তমানে দূরত্বের একক হিসেবে কিলোমিটার শব্দটি ব্যবহৃত হয়। একই অধ্যায়ের ১৫৭ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে ‘যুক্তফ্রন্ট মূলত চারটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত’ লেখা হয়েছে। মূলত উক্ত চারটির স্থলে পাঁচটি হবে। একাদশ অধ্যায়েরই ১৮৭ পৃষ্ঠায় ‘দলীয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ এর স্থলে হবে ‘আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’। একাদশ অধ্যায়ের ১৮৯ পৃষ্ঠায় এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা বলা হয়েছে। অথচ তিনি ছিলেন তৎকালীন নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

একই বইতে জাতীয় সংগীতও ভুলভাবে তুলে ধরা হয়েছে দাবি করে রিটে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, পৃষ্ঠা ১৯৩। ‘চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি’ লেখা আছে। অথচ শুদ্ধরূপ হবে; ‘চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে, ও মা আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি সোনার বাংলা’।

একাদশ অধ্যায়ে ১৯৫ পৃষ্ঠায় ‘মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরে’ লেখা হয়েছে। অথচ মেহেরপুর এখন পৃথক একটি জেলা। একই পাঠ্যপুস্তকের ২০৩ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্র হবে একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’। অথচ প্রকৃতপক্ষে সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র’।

নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় শীর্ষক বইয়ের ২ থেকে ৯ পৃষ্ঠার বিভিন্ন জায়গায় ‘শেখ মুজিব’ লেখা হয়েছে। অথচ বর্তমানে সকল ক্ষেত্রে তার নামের পূর্বে বঙ্গবন্ধু লিখতে হবে। ১১ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘১৯৭০ সালের নির্বাচন ও পরবর্তী ঘটনা’ উপ-শিরোনামে লেখার ভেতরে জাতীয় পরিষদের ‘একক’ সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্থলে ‘নিরঙ্কুশ’ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হবে। ২৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘প্রেসিডেন্ট ভবন’ এর স্থলে ‘বঙ্গভবন’ হবে।

নবম-দশম শ্রেণির পৌরনীতি ও নাগরিকতা বইয়ের ৫৮ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘কোন দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি নিজের বিচার বিবেচনা অনুযায়ী জাতীয় সংসদের যে কোন সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন’ মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সংবিধানে এমন কোন বিধান নেই।

একই পৃষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যকাল পাঁচ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ সংবিধানের কোথাও প্রধানমন্ত্রীর কার্যের মেয়াদ আলাদাভাবে উল্লেখ নেই।

৬ষ্ঠ শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে শিরোনাম-মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি : ৩ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো এক সাহসী, ত্যাগী, ও দূরদর্শী নেতার ‘আবির্ভাব’ হয়। অথচ প্রকৃত সত্য এ যে, বঙ্গবন্ধু হঠাৎ কোনো ‘আবির্ভূত’ নেতা নন। তিনি তিলে তিলে বাঙালি জাতির নেতা হয়ে উঠেছেন। সপ্তম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে ১০ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে-১৯৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ‘এ নির্বাচন ছিল শুধু পূর্ব পাকিস্তানের।’ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের সব প্রদেশে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন হয়েছিল। এমন অসংখ্য ভুল সংশোধন করতে অনেক অভিভাবক এনসিটিবিকে চিঠি দিলেও কর্ণপাত করেনি তারা। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন ওই অভিভাবক।

আরও যেসব ভুল রিটে তুলে ধরা হয়েছে : বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা বইয়ের ১৭৪ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘দলীয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ লেখা হয়েছে। এর স্থলে হবে আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একই বইয়ের ২০৭ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি’ লেখা হয়েছে। এর স্থলে হবে ‘যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনি’। একই পৃষ্ঠায় প্রধান বিচারপতি সাহবুদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে এর স্থলে হবে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়।

নইবম-দশম শ্রেণীর বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বইয়ের ৮৮ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে ‘সার্বভৌম আদর্শই হলো আইন’। এটা হবে ‘সার্বভৌম আদেশই আইন’। একই বইয়ের ১০১ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘রাষ্ট্রপতি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করবেন’ এর স্থলে সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হইবেন, রাষ্ট্রপতি তাহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন’ এইরূপ বিধান রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে নয়।

একই বইয়ের ১০২ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি যদি বুঝতে পারেন যে’ এর স্থলে ‘রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে’ হবে। ১১৩ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘কমিশনারের’ স্থলে হবে কাউন্সিলর এবং চেয়ারম্যানের স্থলে হবে ‘মেয়র’।

এভাবে বিভিন্ন বইয়ের পাঁচ শতাধিক ভুল তুলে ধরে তা সংশোধনেরও দাবি জানানো হয়েছে রিটে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ পাঠ্যপুস্তক তৈরির ক্ষেত্রে সরকারের কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। এর পেছনে শিক্ষা বিশেষজ্ঞসহ গবেষক দল কাজ করে থাকেন। এত কিছুর পরও এই ভুল ও ইতিহাস বিকৃতির দায় এনটিসিবি কোনোভাবে এড়াতে পারে না।

কেন এত বড় ধরনের ভুল জানতে চাওয়া হলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র সাহা আমাদের সময়কে বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা আমরা যথাযথ পালন করব। এখন আমরা আমাদের বক্তব্য আদালতে তুলে ধরব। আসলে ইতিহাস যখন লেখা হয়েছিল, ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে যে ভাষা, যে তথ্য সেটিই বইয়ের পান্ডুলিপিতে তুলে ধরা হয়েছে।

যেমন এক সময়ে আমরা দূরত্ব বোঝাতে ‘মাইল’ হিসেবেই জানতাম পড়তাম। কিন্তু সেটি এখন কিলোমিটার- কি.মি. হিসেবে পড়ানো হয়। এটি ভুল না। আবার কেউ যদি বলেন শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে ‘বঙ্গবন্ধু’ লেখা হয়নি বইয়ের ইতিহাসে। এখন আমাদের তো আগে জানতে হবে কবে তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়েছে। এরপরও পাঠ্যবইয়ে যে মৌলিক ‘ভুল’ তথ্য বলে প্রতীয়মান হবে- সেগুলো পরিমার্জন করা হবে। প্রতি বছর পাঠ্যবই ছাপানোর আগে বানান, বাক্য, তথ্যগত পরিমার্জন করা হয়ে থাকে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.