আইউব আলী।।
যে কোন পেশায় প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষকের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। অফিস ব্যবস্থাপনা এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের উৎকর্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের গুরুত্বের কথা সর্বজন স্বীকৃত। আর সে কারণেই শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এমনকি সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে।
চলতি মাসের ৮ থেকে ১০ তারিখ ব্রিটিশ কাউন্সিলের অর্থায়নে স্পৃহা বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের তত্বাবধানে দিনাজপুর ব্রাক লার্নিং সেন্টারে আন্তর্জাতিক মানের একটি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়। নীলফামারী জেলার স্কুল এবং মাদ্রাসা মিলে ৭০টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং ১জন করে সহকারী শিক্ষক মিলে ৪টি গ্রুপে এ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কানেক্টিং ক্লাসরুম কার্যক্রমের আওতায় প্রশিক্ষণের বিষয় ছিল Leadership এবং Critical thinking and problem solving. . সহকারী শিক্ষকদের জন্য Critical thinking and problem solving এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানদের জন্য Leadership এবং Critical thinking and problem solving এর ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আমাদের প্রশিক্ষক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনষ্টিটিউট-এর সহযোগী অধ্যাপক ড. মোঃ আহসান হাবীব এবং ড. মোঃ সাইদুর রহমান। সহকারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন।
প্রশিক্ষণের বিষয়টি নিয়ে দু’টি কথা লেখার কারণ হচ্ছে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত প্রশিক্ষণ এবং এনজিও কিংবা এ ধরণের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের মধ্যে বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য আমার চোখে পড়েছে। শিক্ষকতা জীবনের ২২ বছরে অনেক প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ হয়েছে যার কিছু সংখ্যক ছিল আবাসিক আর কিছু সংখ্যক ছিল অনাবাসিক। সর্বশেষ ব্রিটিশ কাউন্সিলের এ প্রশিক্ষণটি আমার তথা আমাদের কাছে সর্বসেরা এবং ফলপ্রসু একটি প্রশিক্ষণ হিসেবে মনে হয়েছে। সরকারি প্রশিক্ষণ এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রশিক্ষণের মধ্যে আমাদের কাছে বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রশিক্ষকের উপস্থাপনা কৌশল, প্রশিক্ষণ পরিবেশ, আবাসন ব্যবস্থা, খাদ্যের মান এবং আচরণ কোনটাই অন্যান্য প্রশিক্ষণের সাথে মিলে না।
Leadership এবং Ges Critical thinking and problem solving বিষয়ে আমরা ইতোপূর্বে সরকারিভাবেও প্রশিক্ষণ পেয়েছি। বাস্তব জীবনে প্রশিক্ষণ থেকে লব্ধ জ্ঞান কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু সেভাবে কখনই গুরুত্ব দেয়া হয়নি এ প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর যেভাবে আমরা উদ্বুদ্ধ হয়েছি। প্রতিষ্ঠান প্রধানগণ সবাই লিডার। সবার জীবনেই প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। নিজস্ব জ্ঞান এবং বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আমরা এসব সমস্যার সমাধান করে থাকি। এ প্রশিক্ষণটি পাওয়ার পর লিডাশীপের ক্ষেত্রে আমাদের ত্রæটিগুলো দূর হয়ে গেছে এবং জটিল সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা অনেকগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যান্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বাসায় আসতে আসতে লব্ধ জ্ঞান অনেকটাই ভুলে যাই, মনে রাখার আগ্রহ থাকেনা এক সময় সবকিছু হারিয়ে যায়। কিন্তু এ প্রশিক্ষণের প্রভাবে আমরা যেভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছি তাতে অবশিষ্ট চাকুরী জীবনে উপরোক্ত বিষয়ের ওপর আর কোন প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হবে বলে মনে হয় না।
Critical thinking and problem solving বিষয়টি মূলতঃ শিক্ষার্থীদের জন্য। প্রশ্নপত্র প্রণয়নের ক্ষেত্রে উচ্চতর চিন্তন দক্ষতা তথা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমরা ইতোপূর্বে প্রশিক্ষণ পেয়েছি কিন্তু তারপরও শিক্ষার্থীরা অনেকেই মুখস্ত থেকে সরে আসতে পারছে না। এ প্রশিক্ষণে উক্ত বিষয়ে যে কলা-কৌশলগুলো শেখানো হয়েছে তাতে একজন মেধাহীন শিক্ষার্থীও সৃজনশীল হতে পারবে যদি শিক্ষক আন্তরিক হন। যে সকল সহকারি শিক্ষক এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন আমার মনে হয় তারা সকলেই উক্ত কৌশলগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রয়োগ করার মত মন-মানসিকতা নিয়েই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ত্যাগ করেছেন।
মূলতঃ স্পৃহা বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন কর্তৃক মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের খবর দেয়া থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে উপস্থিতি, থাকা, খাওয়া, প্রশিক্ষণ গ্রহণ সর্বশেষ বিদায় সবকিছুই ছিল প্রশিক্ষণের অংশ। আবাসন, স্বাস্থ্য সম্মত খাওয়া সবকিছুতেই ছিল ভিন্ন ধারা যা অন্য কোন প্রশিক্ষণে পাওয়া যায়নি। প্রশিক্ষক থেকে শুরু করে এম.এল.এস.এস পর্যন্ত সবার আচরণ ছিল চিরদিন মনে রাখার মত। মোট কথা, তিন দিনের সংক্ষিপ্ত এ প্রশিক্ষণে মনে হয়েছিল যে বাংলাদেশেও শিক্ষকের মর্যাদা আছে!
প্রশিক্ষকবৃন্দ ছিলেন অতিশয় দক্ষ এবং আন্তরিক। অতিশয় আন্তরিকতার মাধ্যমে সাবলীল ভাষায়, বিভিন্ন ভিডিও প্রদর্শন করে, বিভিন্ন নেতার গুণাবলী উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে আমাদেরকে নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য জগতে। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম আমাদের দৈন্যতার কথা, বৈষম্যের কথা, পরিবার পরিজনের অভাব-অভিযোগের কথা। সর্বদাই মনে হয়েছিল আমরা দেশের কর্ণধার, আমাদের ওপর অনেক দায়িত্ব, আমাদের সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে না হলে দেশ অনেকটাই পিছিয়ে পড়বে। বাংলাদেশ সরকারও ইচ্ছে করলে শিক্ষক সমাজকে উচ্চ মর্যাদায় নিয়ে যেতে পারে কিন্তু সদিচ্ছার বড়ই অভাব। তাদের ধারণা শিক্ষক সমাজ যদি উচ্চ মর্যাদায় যায় তাহলে আমলা সর্বোপরি রাজনীতিবিদদের কি হবে? আর তাই শিক্ষার্থীদের বেঞ্চে বসে, পেট নষ্ট করা খাবার খেয়ে সস্তা প্রশিক্ষকের মাধ্যমে আমাদেরকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়। আর তাই ফলাফলও হয় সে রকম তথা বাড়ী পৌঁছার পূর্বেই স্মৃতি থেকে সব হারিয়ে যায়, প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
পরিশেষে ব্রিটিশ কাউন্সিলকে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ, ধন্যবাদ জানাই স্পৃহা বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনকে। কৃতজ্ঞতা জানাই প্রশিক্ষকবৃন্দকে যাদের সান্নিধ্যে এসে আমাদের চিন্তা-চেতনার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ব্রিটিশ কাউন্সিল কর্তৃপক্ষের প্রতি আমার অনুরোধ-দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এ প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসুন।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
