এইমাত্র পাওয়া

প্রশাসনের মুখোমুখি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, থমথমে বরিশাল

অনলাইন ডেস্ক।।
বরিশালে মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেছে পুলিশ-প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাড়িতে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে নগরে পুলিশ, র‍্যাবের টহল জোরদারের পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই বিবাদে দিনভর ভোগান্তি পোহাতে হয় মানুষকে।
বরিশালে ইউএনওর বাসভবনে হামলার ঘটনায় তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গতকাল রাজধানীতে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে বরিশালে ঘটে যাওয়া ঘটনায় কার ভূমিকা কী ছিল। কেউ যদি ভুলভ্রান্তি করে থাকে, তাহলে তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ দিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বরিশালের মেয়র সেরনিবায়াত সাদিক আবদুল্লাহর গ্রেপ্তার দাবি করেছে বাংলাদেশ এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস এসোসিয়েশন।
জানা গেছে, বুধবার রাতে নগরীর সিঅ্যান্ডবি সড়কের সদর উপজেলা পরিষদ ভবনে ১৫ আগস্ট উপলক্ষে লাগানো ব্যানার-পোস্টার অপসারণ করতে যান ছাত্রলীগ যুবলীগের নেতা-কর্মীরা। ওই ব্যানার-পোস্টার সদর আসনের সাংসদ ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীমের পক্ষে লাগানো হয়েছিল। অনুমতি ছাড়া উপজেলা পরিষদ চত্বরে প্রবেশ করে ব্যানার-পোস্টার অপসারণ করতে বাধা দেন নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার সদস্যরা। একপর্যায়ে ইউএনও মুনিবর রহমান বাসভবন থেকে ঘটনাস্থলে এলে তাঁর সঙ্গে অসদাচরণ করেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। এর পরপরই আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ-যুবলীগের কয়েক শ নেতা-কর্মী উপজেলা পরিষদে গিয়ে ইউএনওর বাসায় হামলা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আনসার সদস্যরা ফাঁকা গুলি করেন। হামলাকারীদের পক্ষ থেকে গুলি করা হয়েছে বলে অসমর্থিত সূত্র জানিয়েছে। খবর পেয়ে র‌্যাব ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালালে তাদের সঙ্গে হামলাকারীরা পাল্টা ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পুলিশের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। রাত ২টায় পর্যন্ত উপজেলা পরিষদ এলাকায় এমন পরিস্থিতি অব্যাহত ছিল। এরপর সিটি করপোরেশনের গাড়িতে কয়েক গাড়ি বর্জ্য এনে উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকসংলগ্ন সড়কের ওপর ঢেলে দেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ বুধবার গণমাধ্যমকে জানান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অংশ হিসেবে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা রাতে উপজেলা পরিষদের গেলে ইউএনও বাধা দেন। খবর পেয়ে তিনিও ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। ইউএনওর নির্দেশে আনসাররা গুলি করলে জীবন রক্ষায় তিনি সেখান থেকে চলে আসেন। মেয়র দাবি করেন গুলিতে প্যানেল মেয়র গাজী নাইমুল ইসলাম লিটুসহ অনেক নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। ১০ জন শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় হাসপাতালে আছেন।
রাত ২টার দিকে ইউএনওর বাসায় যান বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল হাসান বাদল, বরিশাল মেট্রোপলিটনের পুলিশ কমিশনার শাহাবুদ্দিন খান, র‌্যাব-৮-এর অধিনায়ক জামিল হোসেন, বরিশাল জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার বলেন, এ ঘটনা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যাঁরা অন্যায় করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে রাতের ঘটনার জের ধরে মধ্যরাত থেকে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বরিশালে সড়ক যোগাযোগ অচল হয়ে পড়ে। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ওপর এলোপাতাড়িভাবে বাস-ট্রাক রেখে দেওয়া হয়। এতে বরিশালসহ পটুয়াখালী, বরগুনা ও ঝালকাঠি রুটের বাস ও পণ্যবাহী বাস ও ট্রাক চলাচল বুধবার মধ্যরাত থেকে বন্ধ ছিল। বাস শ্রমিকনেতারা দাবি করেন, মেয়র সাদিক আবদুল্লাহকে উদ্দেশ করে গুলি করার প্রতিবাদে ধর্মঘট ডাকা হয়। তবে সাড়ে ১২টার দিকে বাস চলাচল শুরু হয়। এর আগে নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক ধরে গড়িয়ার পাড় মোড় পর্যন্ত (প্রায় ৬ মাইল দূরে) সড়কের ওপর বাস-ট্রাক এলোপাতাড়িভাবে রেখে দেওয়া হয়েছে। একই অবস্থা নগরীর রূপাতলী বাস টার্মিনাল এলাকায়।
বরিশাল বাস মালিক গ্রুপের যুগ্ম সম্পাদক কিশোর কুমার দে বলেন, সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ তাঁদের বাস চালানোর নির্দেশ দেন। একই কথা জানান, বরিশাল-পটুয়াখালী মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাওছার হোসেন শিপন।
অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএর নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিদর্শক কবির হোসেন বলেন, সকাল ৮টা থেকে বরিশাল নৌবন্দর থেকে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেন শ্রমিকনেতারা। পরে বেলা ১টার দিকে লঞ্চ চলাচল শুরু হয়।
এদিকে দুপুর ১২টার দিকে নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর বাসভবনে দলীয় সভা ডাকা হলে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে সেরনিয়াবাত ভবন ঘিরে রাখে র‌্যাব, পুলিশ, ডিবি। এ সময় জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুব্রত দাসকে মেয়রের বাসার সামনে দেখা যায়। এ সময় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে মেয়রের বাসায় ঢোকার চেষ্টা করতে দেখা গেলেও তাঁরা ভেতরে ঢুকতে পারেননি
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস এ প্রসঙ্গে বলেন, মেয়রের বাসায় সভা ছিল। কেন এখানে প্রশাসন তৎপর তা তারা জানার চেষ্টা করছেন।
বুধবার রাতের ঘটনায় কয়েক’শ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীকে আসামি করে সদর ইউএনও এবং পুলিশ বাদী হয়ে দুটি মামলা করেছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৩ নেতা-কর্মীকে। বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর মধ্যে সংঘর্ষে আহত তিনজনকে বরিশাল শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গতকাল দুপুরে হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়ে আসে গোয়েন্দা পুলিশ। এর আগে বুধবার রাতে ইউএনওর বাসায় হামলার সময় ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হাসান মাহমুদ বাবুকে।
গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত বরিশাল নগর ছিল থমথমে। এই অবস্থায় নগরে পুলিশ, র‍্যাবের টহল জোরদারের পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.