এইমাত্র পাওয়া

সরকারি স্কুল-কলেজে গভর্নিং বডির সভাপতির স্বামীর নামে ভবন!

নিউজ ডেস্ক।।

ঢাকা মডেল ডিগ্রি কলেজ। রাজধানীর মিরপুর ১৩ নম্বর সেকশনের পুলিশ কনভেনশন হল সড়কের এ কলেজে একটি সাততলা ভবন নির্মাণের জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সোয়া ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল বছর চারেক আগে। কিছু দিন আগে ভবনটির কাজ শেষ হয়েছে। সম্প্রতি এলাকাবাসী দেখতে পান ভবনের গা-জুড়ে এক বিশাল সাইনবোর্ড। তাতে লেখা- ‘মতিউর রহমান মাইকেল একাডেমিক ভবন, ঢাকা মডেল ডিগ্রি কলেজ’।

এলাকাবাসী জানান, মতিউর রহমান মাইকেল হলেন স্কুলের গভর্নিং বডির বর্তমান সভাপতি আফিফা আল বেলীর স্বামী। বছর দেড়েক আগে তার মৃত্যু ঘটেছে। কলেজটির প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত কোনো কার্যক্রমে তার কোনো অবদান ছিল, এরকম জানা নেই তাদের কারও। বরং এলাকায় তাকে নিয়ে রয়েছে নানা নেতিবাচক আলোচনা। তাই সরকারি অর্থে নির্মিত ভবনের নামকরণ গভর্নিং বডির স্বামীর নামে কেন করা হলো, তা নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে।

কেবল এই একটি ঘটনাই নয়- কলেজটির অদূরেই মিরপুর ১৩ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের ৪ ও ৫ নম্বর সড়কের সংযোগস্থলে হাজী আলী হোসেন উচ্চবিদ্যালয়। বছর দুয়েক আগে স্কুলের আরেকটি ভবন তৈরির জন্য এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। ভবনটির কাজ এখন শেষের দিকে। কয়েকদিন আগে এলাকাবাসী দেখতে পান ভবনের গায়ে আরেকটি বিশাল ব্যানার। তাতে লেখা, ‘মতিউর রহমান মাইকেল একাডেমিক ভবন, মিরপুর-১৩, ঢাকা-১২১৬, হাজী আলী হোসেন উচ্চবিদ্যালয়’।

স্কুল-কলেজের নামকরণের নিয়ম সম্পর্কে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক রবিউল আলম সমকালকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো ভবন কারও নামে করার ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ নেই। তবে একটা নীতি রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে কোনো বিশিষ্ট বা গুণী ব্যক্তি যেমন কবিগুরু, জাতীয় কবি বা জাতীয় কোনো ব্যক্তিত্বের নামে করা হলে কোনো সমস্যা নেই। এছাড়া ওই ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে যদি মোট ব্যয়ের বড় অংশ অনুদান কোনো ব্যক্তি দিয়ে থাকেন, তাহলে সেটি তার নামেও হতে পারে। এর বাইরে গেলে বোর্ড তদন্ত করে সেই নামকরণ বাতিল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে ঢাকা বোর্ড অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে।

ঢাকা মডেল ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুল্লাহ বলেন, কলেজের নাম পরিবর্তন করতে গেলে বোর্ডের অনুমতি লাগে। কিন্তু ভবনের নামকরণে এর প্রয়োজন হয় বলে জানা নেই তাদের। মতিউর রহমান শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাছে ভবনটি তৈরির জন্য অনেক তদবির করেছিলেন। এ জন্য এলাকার লোকজনের দাবি ছিল তার নামে ভবনের নাম রাখা হোক। পরে গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তে এই নামকরণ হয়েছে। তবে ভবন তৈরির জন্য মতিউর রহমান নিজে কোনো টাকা ব্যয় করেননি, যা হয়েছে সরকারি টাকায়।

হাজী আলী হোসেন উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মীর আশরাফ হোসেন বলেন, ‘মতিউর রহমান সাহেবের কোনো অনুদান এই ভবন বা স্কুলে নেই। এভাবে নামকরণ করা যায় কিনা, তাও আমি স্পষ্ট জানি না। দেশের আইনকানুন সম্পর্কেও আমি ভালো বুঝি না। তবে গভর্নিং বডির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এর বাইরে আর কিছু জানা নেই।’

ভবন নির্মাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী বলেন, অধিদপ্তর থেকে কেবল ভবনের জন্যই টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ভবনের কোনো নাম নির্ধারণ করা ছিল না। ইতোমধ্যে ঢাকা মডেল ডিগ্রি কলেজের ভবনটির কাজ শেষ হয়েছে। হাজী আলী হোসেন উচ্চবিদ্যালয়ের ভবনটির কাজও খুব শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে।

পরিদর্শনে দেখা গেছে, পুলিশ কনভেনশন হলের পাশ দিয়ে উত্তরের দিকে এগোলেই ডান দিকে ঢাকা মডেল ডিগ্রি কলেজের অবস্থান। ভবনটি তৈরি করা হয়েছে সড়কের পাশ ঘেঁষে। তিনতলায় পুরো ভবনের গা ঘেঁষে বসানো হয়েছে মতিউর রহমান মাইকেল একাডেমিক ভবনের সাইনবোর্ড। এর নিচে আরেকটি হোর্ডিংয়ে লেখা ‘ঢাকা মডেল ডিগ্রি কলেজ’। তার নিচে আরেকটি ছোট সাইন বোর্ডে লেখা, ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমী, কাফরুল ক্যাম্পাস’। আলী হোসেন উচ্চবিদ্যালয়ে দেখা যায়, বাইরে কোথাও স্কুলের নামের সাইন বোর্ড বা ব্যানার নেই। নবনির্মিত ভবনের দোতলায় বিশাল ব্যানারে লেখা ‘মতিউর রহমান মাইকেল একাডেমিক ভবন, হাজী আলী হোসেন উচ্চবিদ্যালয়’।

স্থানীয়রা জানান, যেখানে স্কুলের একাডেমিক ভবন তৈরি করা হয়েছে, সেখানে একটি পুকুর ছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ সেই পুকুর ময়লা-আবর্জনা দিয়ে ভরাট করে সেখানে ভবন তৈরির সুযোগ করে দেয়। অথচ স্কুল ক্যাম্পাসে আরও প্রায় তিন বিঘা জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে। এ নিয়েও তখন এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মতিউর রহমান মাইকেল এক সময় জাতীয় পার্টির ছাত্রসংগঠন ছাত্রসমাজের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৯১-এর পর বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হন। ওয়ান ইলেভেনের পর ফেরদৌস আহমদ কোরেশীর নেতৃত্বাধীন পিডিপিতে যোগ দেন। পরে আবার আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ওঠবস শুরু করেন। কয়েক বছর আগে কাফরুল থানা আওয়ামী লীগের কমিটিতে তাকে সহসভাপতি করা হলে কেন্দ্র থেকে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। পরে সেই কমিটি থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়। ওই এলাকায় গড়ে ওঠা ৪নং ওয়ার্ড মার্কেট ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। সেই সমিতির আর্থিক কার্যক্রম নিয়েও তার বিরুদ্ধে ছিল বিস্তর অভিযোগ।

এ প্রসঙ্গে কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি ও মতিউর রহমান মাইকেলের স্ত্রী আফিফা আল বেলী বলেন, দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই তার স্বামীর অনেক অবদান রয়েছে। তিনিও এক সময় ঢাকা মডেল ডিগ্রি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ছিলেন। এছাড়া তিনি এক সময় বিটিভিতে কাজ করেছেন। এছাড়া রাজনৈতিক নেতাও ছিলেন। কাজেই তার নামে নামকরণ করা হয়েছে। নামকরণের নীতিমালা অনুযায়ী তা করা হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, এ নিয়ে পরে একদিন বিস্তারিত কথা বলবেন।

স্থানীয় কাউন্সিলর, কাফরুল থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র জামাল মোস্তফা জানান, তিনি ওই এলাকার দীর্ঘদিনের কাউন্সিলর। নিয়ম অনুযায়ী তাকে ওই স্কুল ও কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে রাখার কথা। তিনি কখনোই স্কুল-কলেজের গভর্নিং বডিতে নেই। তিনি বলেন, ‘এসব কীভাবে হলো তা ওপরওয়ালা জানেন।’সুত্র সমকাল


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.