শিল্পকারখানা খুললেও শ্রমিক উপস্থিতি কম

নিউজ ডেস্ক।।

লকডাউন চলমান। তার মধ্যেও খুলে দেওয়া হয়েছে শিল্প-কলকারখানা। কঠোর বিধি নিষেধের পরও হঠাৎ করেই কারখানা খোলার পর ঢাকামুখী শ্রমিকের ঢল নামে। এসময় গণপরিবহন সংকট প্রকট থাকায় গতকাল রোববার বেশিরভাগ কারখানায় শ্রমিকের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে কম। অতীতেও একই ধরনের ভ্রান্তিতে সরকারকে ঘুরপাক খেতে দেখা গেছে। রফতানিমুখী শিল্প ও কলকারখানা খুলার কারণে এবার সারা দেশের উৎপাদনমুখী সব ধরনের স্থানীয় শিল্প ও কলকারখানা ও ব্যাংক খোলার দাবি তুলেছে বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)।

সরকার শুধু বড়দের দাবি রাখবে আর শ্রমিক, মুদি দোকানি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কথা শোনার বোর্ড থাকবে না এটা কাম্য নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা জানান, অবশ্যই জীবন জীবিকার সমন্বয় করবে সরকার এটা স্বাভাবিক, কিন্তু একটি ঘোষণা দিয়ে দায় সারলে হবে না। এর সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলোর কথাও ভাবতে হবে বলে মনে করেন তারা। তারা আরও বলেছেন, বারবারই এসব সমন্বয়হীনতার চিত্র তুলে ধরার পরেও পুনরাবৃত্তি ঘটেই চলেছে। সমন্বয়হীন কর্মকা- অবসানের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে গার্মেন্টস শ্রমিক নেতারা বলেছেন, শিল্পকলকারখানা খুললে শ্রমিকরা গ্রাম থেকে কর্মস্থলে ফিরবেন কিভাবে সেটা একবারও ভেবে দেখা হয়নি। আকস্মিকভাবে একটি ঘোষণা দিয়ে পথে পথে ভিড় তৈরি করা হচ্ছে, স্বাস্থ্যবিধি সেখানেই ভেঙে পড়ছে। সঙ্গে রয়েছে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ভোগান্তি, অবর্ণনীয় কষ্ট আর অর্থের শ্রাদ্ধ। শিল্প-কলকারখানা খুলে দেওয়া সরকারি সিদ্ধান্তকে অনেকটাই নেতিবাচক চোখে দেখছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, করোনার সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি প্রতিরোধ করতে হলে অন্তত দুই সপ্তাহের কঠোর লকডাউন মানার বিকল্প নেই। তাহলে করোনা বিস্তারের চেইন অনেকটাই ভাঙা সম্ভব হতো। তাদের শঙ্কা, লকডাউন দুই সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই কলকারখানা খুলে দেওয়ায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়বে। শিল্পকারখানা খোলার পর করোনার সংক্রমণ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, এর ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি কিভাবে সামলানো হবে, এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী- তা স্পষ্ট করার দাবি তোলেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে লকডাউনে শিল্পকারখানা খুলে দেওয়ায় অনেকটাই আতঙ্কিত স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তার আশঙ্কা, চলমান সর্বাত্মক লকডাউনের মধ্যে পোশাক ও শিল্পকারখানা খুলে দেওয়ায় ফের করোনা সংক্রমণ বাড়বে। গতকাল রোববার দুপুরে রাজধানীর মহাখালীর বিসিপিএস মিলনায়তনে প্রথমবর্ষের এমবিবিএস ক্লাসের (২০২০-২১) উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি তার আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আজ (গতকাল) থেকে গার্মেন্টস খুলে দেওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু তারা স্বাস্থ্যবিধি মানেননি বা মানছেন না। ফলে করোনা সংক্রমণ আরও বাড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। যদিও জীবনের জন্য জীবিকার দরকার হয়। এসবই সরকারকে সমন্বয় করে চলতে হয়।

শ্রমিকদের এই বেপরোয়া মনোভাবের বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘শ্রমিকরা যেভাবে রাস্তায় নেমে চলে আসার উদ্যোগ নিয়েছে, তা কোনভাবেই শুভ লক্ষণ নয়। তাতে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে পড়েছে। বিষয়টি দেখে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, শ্রমিকরা যাতে সুন্দরভাবে ঢাকায় আসতে পারে তার ব্যবস্থা করতে। এজন্য সীমিতভাবে হলেও গণপরিবহন চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তাই আমরা আপাতত এই ছাড় দিয়েছি। ব্যবসায়ীরা বলেছে, শুধু ঢাকায় থাকা শ্রমিকদের দিয়ে কারখানা চালু করা হবে। সরকার সেটাই বিশ্বাস করেছে। যদিও এটা কে সমর্থন করার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি তো আমাদের জন্য নতুন নয়। তাই সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এটা বুঝা উচিত ছিল। তাহলে এই সমালোচনায় পড়তে হতো না।’
এবিষয়ে ভোরের পাতার মুখোমুখী হন নৃ-বিজ্ঞানী সৈয়দ আশেক মো.জেবাল। তিনি তার প্রতিক্রিয়া এভাবে প্রকাশ করলেন।‘কারখানা খোলার আগে শ্রমিকদের কথা কেউ কি ভেবেছিল? অথচ দিনদুয়েক আগ পর্যন্ত সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীই বলে আসছিলেন যে আগস্টের ৫ তারিখ পর্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে সরকারের অবস্থান দৃঢ়। তার মতে, এখানে দুটি বিষয় খুবই অবাক লাগছে- প্রথমত পুরো বিষয়টিতে সরকারের একধরনের আত্মসমর্পণ বা অসহায়ত্ব যা প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে এবং দ্বিতীয়ত এই পুরো ব্যবস্থাপনার (মূলত শ্রমিকদের যাতায়াত-স্বাস্থ্য নিরাপত্তার) অংশটুকু অস্পষ্ট রয়ে গেছে। অথচ সরকার চাইলেই প্রজ্ঞাপনের কিছু উপধারায় কিছু বিষয় যুক্ত করে এই বিষয়গুলোকে আরো পরিষ্কার করতে পারত- মালিক ও শ্রমিক উভয়ের কাছে।’

সৈয়দ আশেক মো. জেবাল আরও বলেন, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, নরসিংদীর মত জনবহুল জেলাগুলোতে অধিকাংশ গার্মেন্টস কারখানা অবস্থিত। এসব জনবহুল এলাকাগুলোতে শ্রমিকদের পাশাপাশি সাধারণ জনগণ তথা যারা করোনার অতি ঝুঁকির অন্তর্ভুক্ত পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষও বাস করেন। বর্তমান করোনা মহামারি সময়ে শুধু শ্রমিক আর মালিকের কথা ভাবলেই হবে না। এসব জনবহুল এলাকাগুলোর শ্রমিকেরা যখন কারখানায় আসা-যাওয়া চলাচল করবেন তখন এমনিতেই করোনার বিধি-নিষেধের উপকারিতা থেকে এই অঞ্চলের মানুষ বঞ্চিত হবেন। আবার, বারবার বিধিনিষেধ আরোপের কারণে অন্যান্য পেশাজীবী, শ্রমজীবী বা ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। মনে রাখা দরকার, অপরিকল্পিত ও হুটহাট সিদ্ধান্ত মানুষ সহজভাবে নিতে পারে না, এতে সাধারণ মানুষ বিরক্ত হয় এবং এর ফলে সরকারের জনপ্রিয়তাও অনেকটাই তলানিতে পৌঁছে যায়।

তিনি আরও বলেন, গার্মেন্টস শিল্প অবশ্যই আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্প। কিন্তু আমরা কেন যেন এই শিল্পটিকে কেবল রফতানির মানদ- দিয়েই মাপার চেষ্টা করি। যে কত বিলিয়ন ডলার আমাদের রফতানি হলো, কত লাখ কার্যাদেশ আমরা পেলাম তার ভেতরেই সবকিছু সীমাবদ্ধ রাখি। কিন্তু এই বাইরেও বিশাল শ্রমিক সংখ্যা, তাদের পরিবার, তাদের সাংস্কৃতিক আবহকে কেন যেন আমরা বার বার হিসেবের বাইরে রেখেই সকল হিসেব কষে ফেলি। এটা অনস্বীকার্য যে, গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশের কারণে সমাজে নারীর অবস্থা যেমন উন্নতি হয়েছি তেমনি সামাজিকভাবে বিকাশ হয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতির। এই বিকাশমান অর্থনীতি আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে। কিন্তু বারে বারে শ্রমিকেরা আমাদের হিসেবের বাইরেই থেকে যান কোন্ কারণে? এই দেশের পোশাকশিল্পের উন্নতির পেছনে যতটা না সবুজ কারখানা/গ্রীন ফ্যাক্টরি বা ভালো ম্যানেজম্যান্টের অবদান, তার সমান বা বেশি অবদান রয়েছে অল্প বেতন পাওয়া এই শ্রমিকদের, যারা মেশিনের মতো সকাল-সন্ধ্যা নিরলস শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন।
সৈয়দ আশেক মো.জেবাল বলেন, যত দুর্যোগই আসুক-সমতা, ন্যায়বিচার, অন্যকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শণ এসব মূলনীতি ও সংস্কৃতি থেকে আমরা যেন দূরে সরে না যাই। একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই দেশ, এই জাতি তথা পুরো বিশ্ব এখন ভীষণভাবে দিশেহারা। এই দুর্যোগকালে আমাদের একতা দরকার, আমাদের ঐক্য দরকার যা নিশ্চিত হতে পারে পুরো বিষয়টির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে পরিষ্কারভাবে সকলকিছু তুলে ধরার মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে ৫০ লাখ শ্রমিককে যদি আমরা এই দুর্যোগ হতে নিরাপদ না রাখতে পারি তবে আমরা কেউই নিরাপদ থাকব না। একতাই শক্তি এবং এই একতার শক্তিতেই আমরা অতীতে বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি এবারেও তা প্রদর্শনের সুযোগ এসেছে।

এদিকে মিরপুর-১১’র ইপিলিয়ন গার্মেন্টসের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের শ্রমিকদের বেশিরভাগই রাস্তায় আটকে আছে। কেউ গাড়ি পাচ্ছে না, কেউ যানজটে আটকে আছে। যেহেতু গণপরিবহন চলাচলের সুযোগ দিয়েছে, আশা করছি সবাই চলে আসবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ৬০ শতাংশ শ্রমিক কাজে যোগ দিয়েছেন। প্রতিটি লাইনেই লোক শর্টেজ (কম) আছে।’ টিউনিক অ্যান্ড ওডিল আপিরিয়ালস লিমিটেডের এক কর্মকর্তাও তার কারখানায় কম শ্রমিক উপস্থিতির কথা জানিয়েছেন। রানা নামের ওই কর্মকর্তা জানান, আশা করছি ৫ আগস্টের আগে সবাই কর্মস্থলে উপস্থিত হবে। এদিকে নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় দেশে নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার হার ৩০-এর আশপাশে। গত এক সপ্তাহ ধরে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই মারা যাচ্ছেন দুইশ’র বেশি মানুষ। সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে তাতে পরিস্থিতি কিভাবে সামলা দেওয়া যাবে সেটি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর চিন্তিত। যদিও করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধের লক্ষ্যে চলমান বিধিনিষেধ ৫ আগস্টের পরও আরও ১০ দিন বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.