এইমাত্র পাওয়া

ই-লার্ণিং; চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ধারায় পরিবর্তনের পথে শিক্ষা

।। অলোক আচার্য।।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জোয়ারে প্রযুক্তির বিকাশায়ন ঘটেছে দ্রুত গতিতে। ইন্টারনেট আবিষ্কারের পর থেকেই এই গতি আরো দ্রæততর হয়েছে।

শিল্প বিপ্লব ধারণাটির সাথে আমরা সবাই আজ কমবেশি পরিচিত। কারণ আমরা শিল্প বিপ্লবের ধাপ পার করেই আজকের যান্ত্রিক সভ্যতায় উপনীত হয়েছি। কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থাকে পাল্লা দিয়ে আজ শিল্প তার স্থান দখল করে নিয়েছে। শিল্পন্নোত দেশগুলোই আজ পৃথিবীতে উন্নত দেশ, শক্তিশালী রাষ্ট্র।

যান্ত্রিকরনের ছোঁয়া মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই। প্রাক শিল্প বিপ্লবের অর্থনীতি এবং শিল্প বিপ্লবের পরের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি ভিন্ন। বলা যায়, শিল্প বিপ্লবের ফলে অর্থনীতির গতিতে জাদুকরী পরিবর্তন হয়েছে।

পরিবর্তন হয়েছে মানুষের অভ্যাস ও রুচির ক্ষেত্রে। প্রথম শিল্প বিপ্লবের বহু যুগ পেরিয়ে আজ আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাড়িয়ে আছি। অপেক্ষা শুধু সেই পরিবর্তনের সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য প্রস্তুত করা। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাড়িয়ে আমরা আজ নিজেদের প্রস্তুত করছি।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং তার ব্যবহারে শিক্ষা, কৃষি,চিকিৎসা, উৎপাদন ব্যবস্থা,যোগাযোগসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার করে নিজেদের চতুর্থ বিপ্লবের পরিবর্তনে উপযোগী করে তোলা। প্রযুক্তিকেই আধুনিকায়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

হাতে হাতে এন্ড্রয়েট চালিত মোবাইল ফোন,ট্যাবলেট,ল্যাপটপ,ইন্টারনেট,ক্ষুদ্র ও শক্তিশালী সেন্সর,কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা,কাজের ক্ষেত্রে মানুষের পরিবর্তে রোবটের ব্যবহার,জিন প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং- এসবকিছু মিলিয়েই চতুর্থ শিল্প বিপ্লব।

আমরা আজ এই পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি আমাদের সামনে। খুব দ্রæতই এসব পরিবর্তন ঘটছে। শিল্প ক্ষেত্রে মানুষের স্থলে রোবটের ব্যবহার শুরু হচ্ছে। দেশে মেধাবীরা রোবট নিয়ে গবেষণা করছে।

মাঝে মাঝে পত্রপত্রিকায় সেসব রোবটের ছবি ছাপা হচ্ছে। উন্নত বিশ^ প্রতিনিয়ত এসব আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে শিক্ষা,চিকিৎসা,কৃষি,উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই ধারায় পরিবর্তনের পথে শিক্ষা। অতীতকাল থেকে চলে আসা শিক্ষাব্যবস্থায়, পদ্ধতিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। একসময় শিক্ষাগ্রহণ এবং শিক্ষাপ্রদান যে প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হতো সে ধারণায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। ক্লাসের বেঞ্চিতে বসে সামনে চক,ডাষ্টার নিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার চিত্র এখনো রয়েছে।

তবে সেই ধারায় পরিবর্তন হচ্ছে। প্রথাগত পদ্ধতি থেকে বের হয়ে এখন প্রযুক্তির সাহায্যে শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। তবে নানা সিমাবদ্ধতায় এখনও শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার সিমাবদ্ধই রয়েছে। বর্হিবিশে^র বহু দেশ শিক্ষায় প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষাপদ্ধতিকে আরা সহজ এবং গতিশীল করেছে। করোনা অতিমারিতে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা বুঝতে সাহায্য করেছে। কারণ এই দীর্ঘ সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়ার একমাত্র হাতিয়ার ছিল প্রযুক্তি। এখন পর্যন্ত যেটুকু অর্জন তা এই প্রযুক্তির সহায়তায়।

ফলে আমাদের দ্রæতই স্থির করতে হবে আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সাথে নিজেদের সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে কত দ্রæত শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে পারি। নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করার কোনো বিকল্প আমাদের হাতে নেই। আমাদের লক্ষ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া। উন্নত রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থাও হবে সহজ এবং শিশুদের দোরগোরায়। উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিগত সুবিধার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে।

ই-লার্নি প্লাটফর্ম এখন শিক্ষা ক্ষেত্রে আলোচিত বিষয়। একজন শিক্ষার্থী প্রত্যন্ত গ্রামে বসে কেন কোয়ালিটি এডুকেশন বা উন্নত শিক্ষা পাবে না সেটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর ফলে যা হচ্ছিল, গ্রামের শিক্ষার্থীর সাথে শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশে পার্থক্য হয়েছে। কারণ প্রত্যন্ত গ্রামে থেকে শিক্ষার্থী সেই সুবিধা পায়নি যা শহরে থেকে পাওয়া সম্ভব ছিল।

ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষায় শহর এবং গ্রামের শিক্ষার্থীর শিক্ষার বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে। একসময় ই-লার্নিং ধারনাটি পরিচিত ছিল না। প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে ই-লার্নিং ধারণাটি সবার কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। দেশসেরা শিক্ষকদের ক্লাস যদি ঘরে বসেই প্রত্যন্ত গ্রামের একজন শিক্ষার্থী সেই ক্লাস করার সুবিধা পায় তাহলে বিষয়টি প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমাদের লক্ষ্য শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করা।

সে লক্ষ্যে শিক্ষার আধুনিকায়ন অর্থাৎ সবার জন্য সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হবে। এজন্য ডিভাইস সুবিধা,ইন্টারনেট সুবিধা প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌছাতে হবে। আমরা করোনাকালীন সময়ে দেখেছি অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হলেও তা সবার জন্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

এর কারণ সবার কাছে ক্লাসে অংশ নেওয়ার মতো ডিভাইস নেই এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা। কাগজে,কলমে লেখাপড়ার সেই গতানুগতিক পদ্ধতি পরিবর্তন হওয়া এখন সময়ের অপেক্ষামাত্র। উন্নত বিশে^ এখন তা রীতিমতো শুরু হয়েছে। পড়া বিষয়টা যে শুধু বই পড়ে মুখস্থ করা নয় বরং তা আরো আকর্ষণীয় করতে ভিডিওচিত্র তৈরি করে তা উপস্থাপন করা যায় এবং সেটাই বেশি গ্রহণযোগ্য তা প্রমাণিত। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে অন্যসব ক্ষেত্রের সাথে শিক্ষায়ও পরিবর্তন আনতে হবে।

লেখক-

শিক্ষক ও কলাম লেখক
পাবনা।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.