তিন অক্ষরের ছোট্ট একটি শব্দ-বিদায়। মাত্র তিন অক্ষর। কিন্তু শব্দটির আপাদমস্তক বিষাদে ভরা। শব্দটা কানে আসতেই মনটা কেন যেন বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। এমন কেন হয়? কারণ এই যে, বিদায় হচ্ছে বিচ্ছেদ। আর প্রত্যেক বিচ্ছেদের মাঝেই নিহিত থাকে নীল কষ্ট। বিদায় জীবনে শুধু একবারই নয়, এক জীবনে মানুষকে সম্মুখীন হতে হয় একাধিক বিদায়ের। সে-ই যে জন্ম লগ্ন থেকে বিদায়ের সূচনা, তারপর জীবন পথের বাঁকে বাঁকে আরো কত বিদায় যে অনিবার্য হয়ে আসে…। ক্ষণিক দেখার পর একা হওয়ার বিদায়, প্রিয়জনের মন থেকে বিদায়, একসাথে দীর্ঘকাল থাকার পর বিদায়, কর্মজীবন শেষে বিদায়। এই প্রতিটি বিদায়ের পেছনে থাকে কত-শত স্মৃতি, আনন্দ, বেদনার এবং তিক্ততার গল্প। যেখানে আরও যোগ হয় জীবনের সুখ- দুঃখের হিসাব না মেলানোর হাজারো গল্প।
তাই তো বিদায় সবসময়ই বিষাদময়। আর সে বিদায় যদি আট, নয়, দশ বছরের ভালবাসার প্রিয় মানুষদেরকে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জানাতে হয়, তখন বিষাদটা আবেগী রুপ নেয়। শিক্ষা জীবনে মনের অজান্তেই অসংখ্য স্মৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে পাওয়া আর বন্ধুদের ফেলে যাওয়ার অনুভূতি নিশ্চয়ই দু’একটি কথায় প্রকাশ করা কঠিনতম কাজ। যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
প্রিয় প্রতিষ্ঠানের বন্ধুদের সাথে কাটানো আড্ডা, ঘোরাঘুরি, দরস, তরবিয়তের আরো কতশত স্মৃতি যে নিজের অজান্তেই মনে করিয়ে দিয়ে যায়! সুখ-দুঃখ, রেষারেষি, সময়-অসময়ে, কাজে-অকাজে পাশে পাওয়া বন্ধুরা ও সাথীরা হৃদয়কোণে চিরসবুজ থাকলেও বাস্তবতার কঠিন নিয়ম সবাইকে দূরে ঠেলে দেয় একসময়। চলে যেতে হয় অনেক দূরে। দেখা হয় হয়তো কোনো এক মজলিশে, হয়তোবা কখনো আর দেখা মেলেও না কারো কারো সাথে। আর পরবর্তী জীবনকে ঘিরে ধরে নানা ব্যস্ততা, অন্যের চাহিদা- আকাঙ্ক্ষা পূরণের নানা শর্ত।
বিদায়ের ভাবনাটা যত নিষ্ঠুরই মনে হোক এটাই চির বাস্তবতা!! এটাই সত্য!! এটাই নিয়ম!!
মনে হয়, যেন দূরে কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে একটি ট্রেনের কয়েকজন যাত্রী, পথে চলতে চলতে তাদের পরিচয়, কথোপকথন, আড্ডা, ভালবাসা, তিক্ততা শেষে শেষ স্টেশনে নামার পালা। যে স্টেশন থেকে যে যেভাবে পারে চলে যাবে, নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে। তবে এ বিদায় বেলার কষ্টের মাঝেও একরকম আনন্দ থাকতে পারে। যদি সেখানে সান্ত্বনার সঙ্কট না থাকে। এই সান্ত্বনা হলো শিক্ষা-জীবনের সফলতার সান্ত্বনা ।পক্ষান্তরে যার সান্ত্বনার সঙ্কট থাকে অর্থাৎ বিদায়যাত্রী তার ফেলে আসা দিনগুলোর যখন হিসাব মিলাতে না পারে। তখন সে কষ্টটা হয় সবচে তীব্র এবং তিক্ত ।
নিত্যদিনের বিদায় একরকম, দুরের যাত্রার বিদায় আরেক রকম। কিছু বিদায় প্রকাশ্যে হয়। আর কিছু অপ্রকাশ্যে। কিছু বিদায় সম্ভাষণ, আড়ম্বর আর আনুষ্ঠানিকতায়পূর্ণ। আবার কিছু বিদায় ঘটে সবার চোখের আড়ালে, একান্তে গোপনে, যেখানে হয়তো মুখ ফুটে বিদায় বলার সুযোগটাও থাকে না। তবে যাই হোক, বিদায় যেহেতু সবচেয়ে কষ্টের -বিষাদের তাই জীবনের অন্যান্য বিদায়ের সময়, শেষ বিদায়ের কথা স্মরণ রাখতেই হয়। যেন কোনরূপ পরিতাপ নিজেকে দগ্ধ না করে। কোনো অতীত জীবনের কর্মের জন্য। তাহলেই জীবনের খন্ড খন্ড বিদায়গুলো স্বার্থক হয়ে উঠবে।
জগতের এটাই তো চিরাচরিত নিয়ম, পুরাতনরা জায়গা ছেড়ে দিবে আর নতুনরা সে জায়গা গ্রহণ করবে। তাই এখন প্রতিষ্ঠানের জীবন শেষে সামনের পথে চলার সময়। হ্যা, প্রতিটি ক্ষেত্রই পরিবর্তন হয় উদ্দ্যম আর প্রেরণা নিয়ে। আর একসময় মনে হয়, কবে শেষ হবে এই শিক্ষা জীবন! কিন্তু যখনই হিসেবের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামা হয়। তখনই মনে হয়, বুকে গোঁজা ভারি পাথর আর মাথায় বিশাল বোঝা ছাড়া কিছুই নেই।
প্রিয় প্রতিষ্ঠান আর বন্ধুদের ছেড়ে দিতে মন চায় না। কিন্তু জীবনের গতির সাথে এগিয়ে যেতে যে হবেই । তাই সময়ের স্রোতে ভেসে শিক্ষার্থীরা যখন শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি রেখায় দাড়ায়। তখন তাদের চোখে পড়ে কত-শত আয়োজন, বিদায় সংবর্ধনা আরও কত কি!! জীবনের জমা হওয়া বর্ণাঢ্য ও স্মৃতিময় ঘটনাগুলো সেদিন চোখের সামনে ভেসে ওঠে, স্মৃতিতে যোগ হয় আরও কিছু নতুন গল্প। যেখানে জায়গা করে নিবে নতুনরা। আর জীবনের এই লগ্নের পর অনেকের সঙ্গে হয়তো আর কখনোই দেখা হবে না। কেমন থাকবে তারা। হয়তো ভালো, হয়তো মন্দ। তবে যাই হোক, সূর্য যেমন উদিত হবে, তেমন অস্তও যাবে। সবুজ গাছও একসময় নগ্ন গাছ হবে। এটাই বাস্তবতা।
শুকনো পাতা প্রাকৃতিকভাবে বিদায় নেয় নতুন পাতাকে জায়গা করে দিতে। আবার সেই নতুন পাতাও একসময় বিবর্ণ হয়, শুকিয়ে যায়, ঝড়ে পড়ে। তাই বিদায় মানেই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়, একটা বিদায় আরেকটি নতুন কিছুকে প্রতিস্থাপন করার সুযোগ তৈরি করে দেয় ।
তাই বিদায়ের দায় একটাই, সেটা হলো জায়গা ছেড়ে দেওয়া। পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। হ্যা, পেছনে কারো কারো জলে ভরা চক্ষু থাকবেই, নিজের চোখও হয়তো ছল-ছল করবে জলে, পা চলবে না সামনে, তবু যেতে হবে, চলতে হবে সম্মুখপানে । কারণ বিদায় চিরন্তন, বিদায়-ই মৌলিক। আর বিদায় সব সময় বিষাদময়। সবশেষে অশ্রুসিক্ত লোচনে আর নির্বাক কন্ঠে মৃদু মৃদু শব্দে বলে উঠা ”দেখা হবে বন্ধু হয়তো কোনো এক ক্ষণে”!
লেখক-মোঃ হুসাইন আহমদ
শিক্ষার্থী, ইফতা, দারুস-সুন্নাহ মাদরাসা , টাংগাইল।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
