হিন্দু উত্তরাধিকার আইন সংস্কারের প্রস্তাব

অনলাইন ডেস্ক ||

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশের হিন্দু নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন আইনের খসড়া প্রণয়নে সহায়তা করে আসছে। বিবাহ নিবন্ধন, বিবাহবিচ্ছেদ ও ভরণপোষণ—এই আইনগুলোতে নারীর অধিকার নিশ্চিত করার দাবি মূলত আসে প্রত্যন্ত অঞ্চলের হিন্দু নারীদের কাছ থেকে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনগুলো গ্রাম পর্যায়ে যখন বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী নারীদের সঙ্গে পারিবারিক আইন অনুসারে নারীর অধিকার বিষয়টি আলোচনা করে, তখন প্রশ্ন ওঠে হিন্দু নারীদের আইন অনুযায়ী কী অধিকার রয়েছে।

২০০৭ সালে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনের সমন্বয়ে জাতীয় পর্যায় গঠন করা হয় ‘হিন্দু আইন প্রণয়নে নাগরিক উদ্যোগ’ নামের একটি কোয়ালিশন। শুরু থেকেই এই কোয়ালিশনের সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করে আসছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। গ্রাম পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই কোয়ালিশন একটি পূর্ণাঙ্গ হিন্দু বিবাহ আইনের (বিবাহ নিবন্ধন, বিবাহবিচ্ছেদ ও ভরণপোষণ) খসড়া প্রণয়ন করে। কিন্তু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় সংসদে ২০১২ সালে শুধু বিবাহ নিবন্ধন আইন প্রণয়ন করা হয়। এরপর থেকে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইনের বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা সারা দেশে মানুষকে বিবাহ নিবন্ধন সম্পর্কে সচেতন করা, বিবাহ রেজিস্ট্রারদের নিয়ে সভা ও বিবাহিত দম্পতি ও তঁার পরিবারের সদস্যদের বিবাহ নিবন্ধন করতে সহায়তা করা ও আগ্রহী করে তোলার কাজ করছি।

পরবর্তী সময়ে পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে নারীর অধিকার বিষয়টি উল্লেখ করেন। ২০১৮ সালের ১৮ এপ্রিল আইন সহায়তা দিবসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে তিনি উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন ও সংশোধন করতে চান, যদিও তিনি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের কথা উল্লেখ করেননি।

আমরা অর্থাৎ ‘হিন্দু আইন প্রণয়নে নাগরিক উদ্যোগ’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণায় সাড়া দিয়ে ২০১৮ সাল থেকেই হিন্দু উত্তরাধিকার আইন সংস্কারের লক্ষ্যে কাজ শুরু করি। আইনটি প্রণয়নের লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন দেশের উত্তরাধিকার আইন পর্যালোচনা করি এবং এখানে ভারতীয় উত্তরাধিকার আইনটিকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কোয়ালিশনের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘ দুই বছর আলোচনার মাধ্যমে একটি খসড়া আইন প্রণয়ন করা হয়।

খসড়া উত্তরাধিকার আইনটি নিয়ে ৭টি বিভাগে কর্মশালার আয়োজন করা হয়, যেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের আইনজীবীরা, সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা, স্থানীয় পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের হিন্দু নেতারা অংশগ্রহণ করেন। এ আইন নিয়ে আমরা কমিউনিটিতে আলোচনা করেছি। হিন্দু নারী-পুরুষ এর পক্ষে মত দিয়েছেন। সবার মূল্যবান মতামত খসড়া আইনটিতে যুক্ত করা হয়।

বিভাগীয় পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে খসড়া আইনটিকে আরও সমৃদ্ধ করা হয়। পরে এই খসড়া আইনটি পর্যালোচনা করে মতামত প্রদানের জন্য সম্মানিত বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ ও বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিনহাকে প্রদান করা হয় এবং তঁাদের মতামত খসড়া আইনটিতে যুক্ত করা হয়।

খসড়া হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে সব উত্তরাধিকারীর মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে সম–অধিকারের নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। কারণ, মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা ও সিডও দলিলের নীতির ভিত্তিতেই বিষয়টি সব সময় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা পরিষদ নব্বইয়ের দশক থেকেই ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড প্রণয়নের জন্য দাবি জানিয়ে এসেছে, যেখানে পারিবারিক আইনে সব ধর্মের সব নারীর কথাই বলা হয়েছে। যেহেতু এই আইনের প্রস্তাবটি এখন পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি, তাই হিন্দু নারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই কোয়ালিশন হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের পরিবর্তন এবং নারীর সম–অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছে খসড়া হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে।

নারীর উত্তরাধিকার শুধুই সম্পত্তির অধিকার বা অর্থনৈতিক অধিকার নয়। উত্তরাধিকার নারীর পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর অবস্থান সুদৃঢ় করে। এখানে সম্পত্তির পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে। বর্তমানে পরিবারে নারীর প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ নেই, আমরা প্রত্যাশা করি এই আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তা প্রতিষ্ঠিত হবে। আজকের আলোচনায় হিন্দু উত্তরাধিকার আইন সংস্কারের খসড়া উপস্থাপন করা হলো


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.