।। হাসান ভূইয়া।।
অনেকে কথায় কথায় বলে Past is past. কিন্তু আমি বলি না। সব ক্ষেত্রে অতীত অতীত হতে পারে না। তা কখনো সম্ভব নয়। যে জাতি অতীতকালের ঘটনাদি ভুলে যায়,অতীত ইতিহাস ভুলে যায় বা যে কোন উপকার ভুলে যায়। সে জাতি অকৃতজ্ঞ ।
আর অকৃতজ্ঞ জাতি দেশ ও জাতির জন্য মারাত্মক ক্যানসার রোগের মতো। আমরা জানি, উপকার অস্বীকার করে যে, তাকে অকৃতজ্ঞ বলে। তাই বলা চলে একজন ভালো মানুষের পক্ষে কখনো, কারো উপকার অস্বীকার করা মোটেও সম্ভব নয়। কারন অকৃতজ্ঞ ব্যাক্তি বা অকৃতজ্ঞ জাতি যে কোন দেশ বা জাতির জন্য অভিশাপ স্বরুপ।
যে জাতি বা দেশ ভালো মানুষকে মূল্যায়ন করতে শিখে না, সে দেশে ভালো মানুষ জন্মগ্রহণ করে না। তাই আমরা এমন ঘৃণিত জাতি হতে চাই না। আমরা জাতির উজ্জল নক্ষত্র যথাযথ মর্যাদা দিতে চাই। আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি হতে চাই না। এবার আমরা জানবো, আল্লাহর নেয়ামত পেয়ে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিষয়ে “পবিত্র কোরআনে” কি বলেছেন,
আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন,‘যদি তোমরা নেয়ামত পেয়ে কৃতজ্ঞতা আদায় কর তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নেয়ামত বাড়িয়ে দেব। আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ।’ (সুরা ইবরাহিম : আয়াত ৭)
এ আয়াতের আলোকে আল্লাহর নেয়ামত লাভে আনন্দ বা সুখের সময় তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হচ্ছে শোকর। হাদিসের একাধিক বর্ণনায় সেজদায়ে শুকরিয়া আদায় করার কথা এসেছে। এ সেজদায়ে শুকরিয়া বলতে দুই রাকাআত নামাজ পড়তে বলা হয়েছে । যাকে সালাতুস শোকর বা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের নামাজ বলা হয়। হাদিসে এসেছে-
হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কোনো খুশির সংবাদ বা এমন কিছু পৌঁছত আর তাতে তিনি সন্তুষ্ট হতেন; তখন তিনি আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে সেজদায় লুটিয়ে পড়তেন।’ (আবু দাউদ) উপরের আলোচনায় আমরা বুঝতে পারছি, প্রতিটি নেয়ামত পাওয়ার পর অবশ্যই শুকরিয়া আদায় করতে হবে। তবেই আল্লাহ নেয়ামত বাড়িয়ে দিবে। আল্লাহর প্রতিটি গুনবাচক নামের গুন গুলো আমাদের জীবনের সাথে সমন্বয় করতে হবে। যেমন আল্লাহ দয়ালু। আমরাও দয়াময় হতে হবে। প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি দয়া করতে হবে। আল্লাহ ক্ষমাশীল। আমারা ক্ষমাশীল হতে হবে। মানুষকে ক্ষমা করে দিতে হবে। তেমনি ভাবে আল্লাহ কৃতজ্ঞ মানুষকে পছন্দ করে। আমরাও অল্পতে টুষ্ট হয়ে যে কোন উপকার পেয়ে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে হবে।
তাই এ.কে.এম ফজলুল হক মোল্লার অবদানের কথা, অামাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে।
তৎকালিন সময়ে এই ঘারমোড়া গ্রামে একটি উচ্চ বিদ্যালয় কত প্রয়োজন ছিল তা শুধুমাত্র তিনিই হয়তো অনুভব করেছিলেন। সমাজে তারঁ থেকে বেশি অর্থ হয়তো অনেকেরই ছিল কিন্তু এ বিষয়টি তারা এত গুরুত্ব দেননি।
ঘারমোড়া গ্রামটি নিলুখী, জয়পুর ও ঘারমোড়া ইউনিয়নের মাঝামাঝি হওয়ায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ঘারমোড়া গ্রামে প্রতিষ্ঠা হওয়া কতটা জরুরি ছিল তা আপনাদের সাথে একটু শেয়ার করতে চাই। পুরো বিষয়টি পড়ার অনুরোধ রইল।
কারন আমি নিজেই এর ভুক্তভূগি। আমার বাড়ি ফতেরকান্দি। আমার আব্বা ১৯৯৫ সালে আমি কাশিপুর হাসেমিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করান। আমার ভর্তি রোলনং-৮১। সুদিনে বা গ্রীষ্ম মৌসমে আমি কালিপুর ইরি ক্ষেতে আইল দিয়ে হেটেঁ হেটেঁ স্কুলে যাইতে হতো, স্কুলে পৌছতে একটি খাল ও কাশিপুর বাজারে তিতাস নদীতে গোদারা মানে নৌকায় নদী পার হতে হতো। এভাবে তিন মাস যাওয়ার পর আসলো বর্ষাকাল। কালিপুরের ইরি ক্ষেতে বর্ষার পানি উঠে গেল। নৌকা ছাড়া আর আমার পক্ষে বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সবসময় নৌকাও পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া পুরো রাস্তা নৌকায় যাওয়া ব্যয় বহুল। আমার আর কাশিপুর হাসেমিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে যাওয়া হলো না।
এখন কি করবো? কোথায় পড়বো? ফতেরকান্দি হতে হোমনা অথবা মাথাবাঙ্গা অনেক দূরে, যা আমার পক্ষে যাওয়া মোটেও সম্ভব না। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় লজিং থাকাও সম্ভবনা। তাছাড়া আমাদের এলাকায় লজিং প্রথাও তেমন ছিল না। এমত অবস্থায় আমার দাদা (আব্দুল লতিফ ভূইয়া) আমাকে নতুন করে আবার কলাগাছিয়া এম এ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করালেন। এটি হলো আমার ষষ্ঠ শ্রেণিতে দ্বিতীয়বারের মতো ভর্তি । আমার ভর্তি রোলনং-১১২। নতুন করে যেতে শুরু করলাম কলাগাছিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। কলাগাছিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে যেতেও তিতাস নদীতে গোদারা পার হতে হতো। গ্রামের পর গ্রাম পায়ে হেটেঁ বিদ্যালয়ে যেতে হতো। বিদ্যালয় থেকে পায়ে হেটেঁ বাড়িতে এসে অনেক ক্লান্ত হয়ে যেতাম। রাতে আর পড়ালেখায় মন বসতো না। এভাবে চলতে থাকলো আমার লেখাপড়া। শুধু কি আমি? আমার গ্রামের সকল শিক্ষার্থীদের একই অবস্থা!
শুধু আমাদের গ্রাম নয়,এই অবস্থা ঘারমোড়া ইউনিয়ন তথা নিলুখী ও জয়পুর ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে। কারন উল্লিখিত কোন গ্রামে তৎকালিন সময়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিলনা। বেশী আগের কথা নয়, আমি নব্বই দশকের কথা বলছি। তখন উল্লেখিত এলাকার শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক লেবেলের লেখাপড়া করার জন্য হোমনা, মাথাভাঙ্গা, কলাগছিয়া ও কাশিপুরের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেতে হতো। যা ছিল আমাদের এই এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক দূরে ও খুবই কষ্টকর। তাছাড়া যাতায়াতের রাস্তা ও যানবাহনের ব্যবস্থা কোনটি ভাল ছিল না। ফলে কারো পক্ষেই প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। সবচেয়ে বড় সমস্যা বর্ষাকালে এই এলাকায় শিক্ষার্থীরা নৌকা ছাড়া বা গোদারা ব্যাতিত উল্লিখিত এলাকার মাধ্যমিক বিদ্যালয় গুলোতে যাওয়া যেত না। তাই বর্ষাকাল আসলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে যেত। আর এভাবে বেশী দিন বিদ্যালয়ে না যাওয়ার কারনে এক সময় তাদের লেখাপড়া স্থায়ী ভাবে বন্ধ হয়ে যেত। তাছাড়া অনেক গরিব দুঃখি শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া বর্ষার সময়ে স্থায়ী ভাবে বন্ধ হয়ে যেত। চৈত্রের খরায় এক ফোটা বৃষ্টির পানির জন্য মাটি ফেটে যেমন চৌচির হয়ে যায়, তেমনি ভাবে অত্র এলাকায় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনার জন্য শিক্ষার্থীদের বোক ফেটে কান্না করতে থাকে। এলাকার অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মনে দুঃখ ও কষ্টের হাহাকার চলতে থাকে। তাদের দুঃখ ও কষ্ট দেখার বা বুঝার কেউ ছিল না। ফলে বলতে গেলে এই এলাকার শিক্ষার আলো নিবে অন্ধকারের পথে চলছিল……… ঠিক এমন একটি মূহর্তে শিক্ষার আলোর প্রদীপ নিয়ে এগিয়ে আসলেন মহান শিক্ষাবীর, অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের পরম বন্ধু, ছোট ঘারমোড়া গ্রামের কৃতি সন্তান তথা কুমিল্লার গর্ব এ.কে.এম ফজলুল হক মোল্লা।
তারঁ একান্ত প্রচেষ্টায় ঘারমোড়া গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় “ঘারমোড়া এ.কে.এম ফজলুল হক মোল্লা মাধ্যমিক বিদ্যালয়”। তিনি হলেন এই প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নদ্রষ্টা এ.কে.এম ফজলুল হক মোল্লা। ঘারমোড়ায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হওয়ায় আমার মত অসংখ্য ছাত্রছাত্রীদের কষ্ট লাঘব হয়। সকলের মুখে ফুটে উঠে হাসি। আমিও এবার ভর্তি হলাম নতুন এই বিদ্যালয়ে। আমার রোলনং ছিল ১৪৭। শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতার ভালবাসায় এখান থেকেই এস.এস.সি পাস করলাম। বিদ্যালয়টি এখন দুই যুগ পেরিয়ে চলছে। ২১/০৩/২১ইং তারিখে হঠাৎ শুনলাম এ.কে.এম ফজলুল হক মোল্লা আর নেই। একথা শুনার পর চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। তাকে হারানো ব্যাথা নিজেকে বুঝাতে পারছিনা। শরীরের প্রতিটি শিরা, উপশিরা আজ ব্যথাহত । তারঁ এই শূন্যতায় মনের মধ্যে চলছে হাহাকার। প্রতিটি রক্ত কনিকায় কম্পন শুরু হয়েছে। আস্তে আস্তে সমস্ত শরীর মর্মাহত ও শোকাহত হয়ে যায় আমার। কতক্ষণ কি যেন করেছে আমার শরীর ও মনটা আমি আপনাদের বলতে ও লিখে বুঝাতে পারব না। আমরা তাকে খুবই ভালবাসতাম। মন থেকে ভালবাসতাম। কিন্তু সে আজ আর নেই। আমাদের ছেড়ে চির এতিম করে ওপারে চলে গেল। তিনি আমার জীবন সহ হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবনের হ্রদয়ের স্পন্দন ছিলেন। আমরা তাকে কোন দিন ভুলতে পারবো না। তিনি জাতির সূর্য সন্তান ও সজ্জন ব্যাক্তি ছিলেন।
হে শিক্ষাবীর তুমি আমাদের মাঝে চিরদিন বেঁচে থাকবে। তুমিতো মরেও আজ অমর । আজ কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।কি লিখবো তা মনে করতে পারছিনা। এভাবে লিখে হয়তো আমার মনের অগুছানো কথাগুলো লিখা সম্ভব নয়। কারন আমার মতো অতি সামান্য মানুষের পক্ষে এমন আলোকিত মানুষ সম্পর্কে কিছু লিখা আসলে অনেক কষ্টকর। আলোকিত মানুষ সম্পর্কিত লিখতে হলে আলোকিত মানুষের প্রয়োজন। কথায় বলে, “যে যারে চিনে, সে তাকে কিনে”। আমরা তোমাকে বেচেঁ থাকতে চিনতে পারিনি। তোমার যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারিনি। আমাদের ক্ষমা করে দিও তুমি। এই আলোকিত মানুষ শিক্ষাবীর নিয়ে সারাদিন লিখেও আমি শেষ করতে পারবো না।
তাই পরিশেষে আমি অত্র এলাকার সর্বস্তরের জনগণ, মান্যগণ্য ব্যাক্তিবর্গ সহ অত্র বিদ্যালয়ের সকল অভিভাবক ও আমার প্রাণপ্রিয় ছাত্রছাত্রী ভাই-বোনদের প্রতি একটি বিনীত অনুরোধ আপনারা সকলে এই মহান শিক্ষা প্রেমিকের জন্য দোয়া করবেন, তিনি যেন ওপারে পরম সুখে শান্তিতে থাকে। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। আমাদের সকলের এই মূহর্তে একটি প্রার্থনা, হে আল্লাহ আপনি তাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করেন। তারঁ কবরটি কে জান্নাতের বাগান বানিয়ে দেন। আমিন। আমিন। আমিন।।।
কলামটি ছিল ছোট ঘারমোড়া গ্রামের কৃতিসন্তান, উর্জ্জল নক্ষত্র ও শিক্ষাবীর এ.কে.এম ফজলুল হক মোল্লার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। জানিনা লিখাটি কতটুকু সার্থক হয়েছে। আশাকরি আমার অজান্তে ভুলভ্রান্তির জন্য ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
লেখক
(প্রতিষ্ঠা কালিন ছাত্র)
ঘারমোড়া এ.কে.এম ফজলুল হক মোল্লা মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
প্রভাষক,
কুমিল্লা আইডিয়াল কলেজ।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
