নিউজ ডেস্ক।।
করোনাভাইরাসের কারণে বাঙালির প্রাণের মেলা এবার দেরিতে শুরু হয়েছে। উদ্বোধনের পর দ্বিতীয় দিনই ছিল শুক্রবার- ছুটির দিন। এদিন আগের নিয়মেই বইমেলার ফটক আগেভাগেই সকাল ১১টায় খোলে। সকালের দিকে ততটা ভিড় না থাকলেও দুপুরের পর থেকে মেলায় দল বেঁধে লোকজন আসতে শুরু করেন। ক্রেতা-দর্শনার্থীদের পদচারণায় মেলা প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে।
বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের চেকিংয়ের আগের গেট পেরোতে হয়েছে দর্শনার্থীদের ধাক্কাধাক্কি করে। বইমেলায় ভিড় বাড়লেও মাস্ক ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তবে এ ভিড়কে কষ্টকর মনে হয়নি রিশাদের। তেজগাঁও কলেজে পড়ছেন, এখন কলেজ বন্ধ থাকায় মোটরসাইকেলে যাত্রী আনা-নেওয়া করে কিছু রোজগারও করে নিচ্ছেন। বন্ধুদের সঙ্গে মেলায় ঢুকে স্টল থেকে স্টলে ঘুরতে ঘুরতে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘মাই ফাদার, মাই বাংলাদেশ’সহ বেশ কয়েকটি বইও কিনে ফেলেছেন। বললেন, ‘মেলায় এসে ভালোই লাগছে। অনেক প্রকাশনী এখনও গোছানো হয়নি। এ ছাড়া পছন্দের অনেক লেখকের বইও আসেনি, কয়েকদিন পর আবার আসতে হবে।’
প্রচুর ধুলা উড়ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলার মাঠে। বিকেলে অগুনতি মানুষের পদচারণায় ধুলায় ধূসর হয়ে উঠেছিল পরিবেশ। তার ওপর কয়েকটি প্যাভিলিয়নের কাজ এখনও শেষ না হওয়ায় উদ্যানে কয়েকটি জায়গায় ছড়িয়ে আছে কাঠ-লোহাসহ নানা উপকরণ। এগুলো বিরক্তি বাড়িয়েছে অনেকের।
এবারের মেলায় প্যাভিলিয়নগুলো উদ্যানের মাঝখানে থাকায় পাঠকের ভিড় বেশি ছিল সেখানে। কথা হলো অন্যপ্রকাশের প্যাভিলিয়নে বই দেখতে থাকা হাসানুল হক দোলনের সঙ্গে। একাই এসেছেন বইমেলায়। রাজনীতির ইতিহাস নিয়ে আগ্রহের জায়গা থেকে বাতিঘরের স্টল থেকে সংগ্রহ করেছেন মহিউদ্দিন আহমেদের ‘লাল সন্ত্রাস :সিরাজ শিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি’ বইটি। তবে এখনও স্টলগুলো ঘুরে দেখা শেষ হয়নি। জানালেন, ‘বইমেলার সব বই তো কিনে ফেলা সম্ভব নয়। তাই আগে স্টল-প্যাভিলিয়নগুলোতে ঘুরে পছন্দের লেখকের বইয়ের তালিকা করছি। মেলা তো আছেই, পরে ধীরেসুস্থে কেনা যাবে।’
শোভা প্রকাশনীর প্যাভিলিয়নে থাকা বিক্রয়কর্মী আব্দুল্লাহ ফাহাদও বললেন, ‘আজ ছুটির দিন হলেও বইমেলায় এখনও সেভাবে বিক্রি বাড়েনি। সবাই আসছেন, দেখছেন, তবে কিনছেন খুব কম।’
প্যাভিলিয়ন থেকে শিশুচত্বরের দিকে গেলে খুব একটা ভিড় দেখা যায়নি। তবে অনেকেই বইয়ের স্টলগুলো দেখে যাচ্ছেন। চত্বরের একটি স্টলে গিয়ে পাওয়া গেল শামীম হোসেন ও ফারহা অন্তরা খান নিশি দম্পতিকে। শিশুদের বই কিনতে এলেও নিজের সন্তান আয়াতকে নিয়ে আসেননি। বললেন, ‘বইমেলা যে হচ্ছে, তা তো জানতামই না। এখানে টিএসসিতে ঘুরতে এসে মেলার খবর জানতে পারি। ভাবলাম, এত কাছে যেহেতু, চলেই এলাম, ওর জন্য কয়েকটা বই কিনে নিয়ে যাই। ওর বয়স চারের কম, এখনও ঠিকমতো পড়া শেখেনি। ঘুমানোর আগে গল্প শুনতে সে খুব ভালোবাসে। তাই ঈশপের কয়েকটা গল্পের বই কিনলাম, আরও কয়েকটি দেখছি।’ নিশি এবার যোগ দেন কথোপকথনে। বলেন, ‘আমি খেয়াল করে দেখেছি, আয়াত ইদানীং স্মার্টফোনের দিকে ঝুঁকছে। তাই এই অভ্যাসটা সরিয়ে বইয়ের দিকে নিয়ে আসতেই প্রতিরাতে গল্প শোনাই। এবার বই নিয়ে যাচ্ছি, কারণ স্মার্টফোনের বিকল্প বিনোদন মাধ্যম হিসেবে বইকে আমি ওর কাছে পরিচিত করাতে চাই।’
বাংলা একাডেমি তথ্যকেন্দ্র থেকে জানা গেল মেলায় শুক্রবার নতুন বই এসেছে ৫৫টি। এর মধ্যে আগামী এনেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘মাই ফাদার, মাই বাংলাদেশ’, আসাদ মান্নানের ‘এলিজি মুজিব নামে’, মঈনুল আহসান সাবেরের ‘পাথর সময়’, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘শেখ কামাল যদি আজ বেঁচে থাকতেন’, গ্রন্থকুটির এনেছে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ‘বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতা’, অনন্যা এনেছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘মানুষ মানুষের জন্য এবং অন্যান্য’, হরিশংকর জলদাসের ‘পৌরাণিক গল্প’, অনিন্দ এনেছে মোশতাক আহমেদের ‘দ্য নিউ ওয়ার্ল্ড’ ইত্যাদি। এ ছাড়া উদ্যানের পশ্চিমে লেখক বলছি মঞ্চের অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন রঞ্জনা বিশ্বাস, আশরাফ জুয়েল ও মঈনুল হাসান।
মূল মঞ্চে অনুষ্ঠান: গতকাল অমর একুশে বইমেলার দ্বিতীয় দিনে বিকেল ৪টায় বাংলা একাডেমির মূল মঞ্চে আলোচনা অনুষ্ঠান হয়েছে। ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী :বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুভাষ সিংহ রায়। আলোচনায় অংশ নেন সংসদ সদস্য আরোমা দত্ত এবং নাসির উদ্দীন ইউসুফ। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। সুভাষ সিংহ রায় বলেন, কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই এই ৭ মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তবু তার উচ্চারিত শব্দে কোনো দ্বিধা ও পুনরাবৃত্তি ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান প্রেরণা ছিল বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ। এ ভাষণ হলো সব ধরনের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে বজ্রতুল্য ঘোষণা।
আলোচকরা বলেন, বঙ্গবন্ধুর ১৮ মিনিটের ভাষণটি তার স্বভাবসুলভ তাৎক্ষণিক বক্তব্য ছিল, আগে তৈরি করা বক্তৃতা নয়। এটি মূলত রাজনীতির কবিতা। এর মহত্ত্ব ও বিরাটত্বের কারণে ২০১৭ সালের অক্টোবরে ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ ভাষণটিকে পৃথিবীর অন্যতম ‘ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভাষণটির অসাধারণত্ব হলো এর স্বতঃস্ম্ফূর্ততা, নির্ভীকতা, সম্যক উপলব্ধি ও তেজস্বী উচ্চারণ। এ ভাষণ বাঙালি জনগণের স্বাধীনতার চরম ও পরম আকাঙ্ক্ষাকে প্রথমবারের মতো বাঙ্ময় করে তোলে।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বলিষ্ঠ ঘোষণা। এই ভাষণ মূলত বিন্দুতে সিন্ধু। মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনার এ ভাষণের মধ্য দিয়ে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা আসন্ন মুক্তির যুদ্ধে উপনীত জাতিকে সুসংগঠিত করেন এবং বিজয়ী প্রত্যয়ের প্রেরণা দেন। বস্তুত এ ভাষণের মধ্য দিয়ে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সূচনা।
আজকের অনুষ্ঠান: আজ শনিবার অমর একুশে বইমেলার তৃতীয় দিনে মেলা চলবে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে হবে ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী : স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আবুল মোমেন। আলোচনায় অংশ নেবেন আবুল কাশেম এবং আবদুল মান্নান চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল ইসলাম।সুত্র সমকাল
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
