এইমাত্র পাওয়া

ইসলামের দৃষ্টিতে শিষ্টাচারিতা

উসমান বিন আ. আলিম।।

মানব জীবনে শিষ্টাচারের গুরুত্ব অপরিসীম। সমাজ গঠনে বা ব্যক্তি গঠনে যার প্রয়োজনীয়তা অতুলনীয়। শিষ্টাচার সম্পন্ন ব্যক্তি কোনো অন্যায়ের সঙ্গে নিজেকে জড়ায় না, কারো সঙ্গে শত্রুতা করে না বা কারো স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটানোর চেষ্টা করে না।

শিষ্টাচার হচ্ছে ভদ্র, মার্জিত ও রুচিসম্মত আচরণ। শিষ্টাচার মানুষকে সংযমী ও বিনয়ী করে তোলে। শিষ্টাচারের গুরুত্ব সম্পর্কে রসুল (স) বলেন, ‘নিশ্চয়ই উত্তম চরিত্র, ভালো ব্যবহার ও পরিমিত ব্যয় বা মধ্যপন্থা অবলম্বন করা নবুওতের পঁচিশ ভাগের এক ভাগ’। [আবু দাউদ, হা-৪৭৭৬]

হজরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) বলেন, ‘তুমি আদব অন্বেষণ কর। কারণ আদব হলো বুদ্ধির পরিপূরক, ব্যক্তিত্বের দলিল, নিঃসঙ্গতায় ঘনিষ্ঠ সহচর, প্রবাস জীবনের সঙ্গী এবং অভাবের সময়ে সম্পদ’। [ইছবাহানি, মুনতাখাব; সাফারিইনি, গিযাউল আলবাব, ১/৩৬-৩৭।]

আহনাফ আল-কায়েস বলেন, ‘আদব বা শিষ্টাচার বিবেকের জ্যোতি যেমন আগুন দৃষ্টিশক্তির জ্যোতি’। [ফত্ওয়া আল-মিছরিয়া, ১০/৩৫৯, ‘আদব’ অধ্যায়।

রুওয়াইম ইবনু আহমাদ আল-বাগদাদি তার ছেলেকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তুমি তোমার আমলকে লবণ ভাববে, আর তোমার আদবকে মনে করবে ময়দা’। [ড. আলী আব্দুল হামিদ, আত-তাহযিলুদ দিরাসি বিল ক্বাইয়েমিল ইসলামিয়াহ, (বৈরুত :১ম প্রকাশ, ১৪৩০ হিঃ/২০১০ খ্রিঃ), পৃঃ ১৫৪; আল-কুরাফি, আল-ফুরুক্ব, ৩/৯৬।] অর্থাত্ তুমি আমলের চেয়ে আদবকে এত অধিক গুরুত্ব দেবে, লবণ ও ময়দার স্বাভাবিক মিশ্রণে উভয়ের অনুপাত যেভাবে কম-বেশি হয়।

পৃথিবীতে যারা মানুষ হিসাবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন, তারা কেবল শিষ্টাচার ও নম্র-ভদ্র ব্যবহারের মাধ্যমেই মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন। প্রত্যেক ধর্মে শিষ্টাচারের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহানবি (স) ছিলেন শিষ্টাচারের মূর্ত প্রতীক। উন্নত ব্যবহারের জন্য তিনি ছোট-বড় সবার কাছে ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়। সংযম, বিনয়, ভদ্রতা তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কখনো তিনি কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেননি, উদ্ধত আচরণ করেননি। এ কারণেই যুগে যুগে মানুষের কাছে তিনি এত শ্রদ্ধার পাত্র। এক দার্শনিক তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘আকল (বুদ্ধি) ছাড়া যেমন আদব হয় না; তেমনি আদব ছাড়াও বুদ্ধিমান হয় না।’

অর্থাত্ একটি আরেকটির পরিপূরক। শিষ্টাচার হঠাত্ করে কারো মধ্যে গড়ে উঠে না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ প্রস্তুতি পর্ব। শিষ্টাচারের বীজ মূলত বপন হয় শিশুকালেই। আর এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা প্রধান। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। পরিবারের বড়রা যে রকম ব্যবহার করে শিশুরা তাই অনুকরণ করে। বাল্যকালে শিশুদের সংযম, বিনয় ও উন্নত রুচির চর্চা ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে শিষ্টাচার গড়ে তোলে। যে ব্যক্তি শিষ্টাচার অর্জন করতে পারে না, তার মানুষ হয়ে জন্মানোর কোনো সার্থকতা নেই।

শিষ্টাচারহীন উদ্ধত মানুষ কেবল আকৃতির দিক থেকেই মানুষ, তাদের মনুষ্যত্বের কোনো বিকাশ ঘটে না। ফলে তারা সমাজের চোখে হয়ে থাকে ক্ষুদ্র কীট-পতঙ্গ সদৃশ। সমাজ এদের কোনো মর্যাদায় ভূষিত করে না, কুরুচিপূর্ণ এসব মানুষকে ফেলে রাখে আঁস্তাকুড়ে। সমাজে শিষ্টাচারের অভাব নৈতিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে। সমাজজীবন হয়ে উঠে অশান্তিপূর্ণ। নানা কদর্যতা, অন্যায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ফলে সমাজে বসবাসকারী মানুষরা ভোগে অস্তিত্বের সংকটে। শিষ্টাচারহীনতা একটি দেশ ও জাতির উন্নয়নের অন্তরায়। তাই শিষ্টাচার সম্পূর্ণ জীবন গড়ি, আলোকিত সমাজ গড়ি। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বুঝার ও আমল করার তৌফিক দান করুন, আমিন।

লেখক :পরিচালক, বাংলাদেশ কওমি


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.