নিজস্ব প্রতিবেদক।।
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির কাছে ‘গুরুতর অসদাচরণের’ অভিযোগ করেছেন দেশের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক। শুধু অসদাচরণ নয়, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং নিয়োগ বাণিজ্যেরও অভিযোগ এনেছেন তারা। বিশিষ্টজনেরা বলছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের রক্ত এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
রাষ্ট্রপতিকে চিঠি পাঠিয়ে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের অনুরোধ করেছেন বিশিষ্টজনরা। পাশাপাশি অভিযোগের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তাদের দায়িত্ব পালনে বিরত থাকারও অনুরোধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে সরাসরি কথা বলার জন্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চেয়ে অনুরোধও জানিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা ইত্তেফাককে বলেন, অভিযোগের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। বিস্তারিত না জেনে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিকের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক রাষ্ট্রপতির কাছে এই চিঠিটা পাঠিয়েছেন। শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অসদাচরণ ও আর্থিক অনিয়মের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রপতি বরাবর আবেদনের বিষয়টা তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়েন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ সরকার।
সংবাদ সম্মেলনে ড. শাহদীন মালিক বলেন, আমরা সবাই মনে করেছি দায়িত্ব গ্রহণ করার পর নির্বাচন কমিশন যেসব কার্যকলাপ করেছে সেগুলো গুরুতর অসদাচরণ। সাংবিধানিক পদে যারা আছেন তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করার ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের। দুদক বা পুলিশ এটা করতে পারবে না। রাষ্ট্রপতি এ নির্দেশ দিতে পারেন। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ জানিয়েছি। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সুপারিশ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তাদের পদ থেকে অপসারণ করবেন।
ড. শাহদীন মালিক বলেন, সংবিধানের ৪৮(৫) অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে মন্ত্রিপরিষদের আলোচনার জন্য এটি উপস্থাপন করতে পারেন। নির্বাচন কমিশনারদের অপসারণের আশা প্রকাশ বাস্তবসম্মত কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, অতীতেও কিছু খারাপ নির্বাচন হয়েছে। ছিয়ানব্বই সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ নির্বাচন। এখন যেগুলো হচ্ছে সেগুলোও একইরকম। এ ধরনের নির্বাচন কোনো ব্যক্তির কাছে কাম্য নয়। আমরা মনে করি গভীর সংকট রয়েছে।
গত ১৪ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিভিন্নভাবে গুরুতর অসদাচরণে লিপ্ত হয়েছেন। কমিশনের সদস্যগণ একদিকে গুরুতর আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, যা অভিশংসনযোগ্য অপরাধ। একইভাবে তারা বিভিন্নভাবে আইন ও বিধিবিধানের লঙ্ঘন করে গুরতর অসদাচরণ করে চলেছেন। আমরা আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়মসহ কমিশনের গুরুতর অসদাচরণের অন্য কয়েকটি ক্ষেত্র আপনার সদয় অবগতির জন্য চিহ্নিত করছি।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারী বিশিষ্ট নাগরিকরা হলেন—১. অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ২. এম হাফিজউদ্দিন খান ৩. ড. আকবর আলী খান ৪. সুলতানা কামাল ৫. রাশেদা কে চৌধুরী ৬. ড. হামিদা হোসেন ৭. আলী ইমাম মজুমদার ৮. অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম ৯. খুশী কবির ১০. অধ্যাপক পারভীন হাসান ১১. ড. বদিউল আলম মজুমদার ১২. ড. ইফতেখারুজ্জামান ১৩. অধ্যাপক আহমেদ কামাল ১৪. অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ ১৫. অ্যাডভোকেট জেড. আই খান পান্না, ১৬. ড. শাহদীন মালিক ১৭. আলোকচিত্রী ড. শহিদুল আলম ১৮. অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ১৯. ড. আহসান মনসুর ২০. সাবেক সচিব আবদুল লতিফ মণ্ডল ২১. স্থপতি মোবাশ্বের হাসান ২২. শামসুল হুদা, ২৩. অধ্যাপক সি. আর আবরার ২৪. ব্যারিস্টার সারা হোসেন ২৫. সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ২৬. অধ্যাপক আসিফ নজরুল ২৭. অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদ ২৮. লুবনা মরিয়ম ২৯. অধ্যাপক আকমল হোসেন ৩০. অধ্যাপক আদনান ৩১.শারমিন মুরশিদ ৩২.অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন ৩৩. অধ্যাপক ফিরদৌস আজিম ৩৪. সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ ৩৫. সাংবাদিক আবু সাঈদ খান ৩৬. সাংবাদিক গোলাম মোর্তুজা ৩৭. অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস ৩৮. অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা ৩৯. অ্যাডভোকেট জোতির্ময় বড়ুয়া্ ৪০ অধ্যাপক নায়লা জামান খান ৪১. জাকির হোসেন ও ৪২. নূর খান লিটন।
ইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ :রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদনে দুই ধরনের ৯টি অভিযোগ করা হয়েছে। একটি হচ্ছে আর্থিক অনিয়ম ও দ্বিতীয়টি হচ্ছে নির্বাচনি অনিয়ম। দুর্নীতি ও অর্থসংশ্লিষ্ট তিনটি অভিযোগ হচ্ছে—১. ‘বিশেষ বক্তা’ হিসেবে বক্তৃতা দেওয়ার নামে ২ কোটি টাকা নেওয়ার মতো আর্থিক অসদাচরণ ও অনিয়ম, ২. নির্বাচন কমিশনের কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ৪ কোটি ৮ লাখ টাকার অসদাচরণ ও অনিয়ম এবং ৩. নিয়মবহির্ভূতভাবে তিন জন কমিশনারের তিনটি গাড়ি ব্যবহারজনিত আর্থিক অসদাচরণ ও অনিয়ম। নির্বাচন সংক্রান্ত ৬ অভিযোগ-১. ইভিএম কেনা ও ব্যবহারে গুরুতর অসদাচরণ ও অনিয়ম, ২. একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে গুরুতর অসদাচরণ ও অনিয়ম, ৩. ঢাকা (উত্তর ও দক্ষিণ) সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোতে গুরুতর অসদাচরণ ও অনিয়ম, ৪. খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে গুরুতর অসদাচরণ ও অনিয়ম, ৫ গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে গুরুতর অসদাচরণ ও অনিয়ম এবং ৬. সিলেট, বরিশাল ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে গুরুতর অসদাচরণ ও অনিয়ম।
আর্থিক অসদাচরণ : নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আর্থিক অসদাচরণের অভিযোগ এনে পত্রিকায় প্রকাশিত খবর উদ্ধৃত করে বলা হয়, সিইসি ও কমিশনারেরা নির্বাচনি প্রশিক্ষণের জন্য বক্তৃতা না দিয়েই ২ কোটি টাকার বেশি নিয়েছেন।
কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি : গত বছরের নভেম্বরে সিইসির বিরুদ্ধে কর্মচারি নিয়োগে ৪ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ করেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার।
নিয়মবহির্ভূতভাবে বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার :পত্রিকায় প্রকাশিত আরেকটি সংবাদের বরাত দিয়ে বলা হয়, তিন জন নির্বাচন কমিশনার নিয়ম বহির্ভূতভাবে তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করছেন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করা একটি গুরুতর অসদাচরণ।
ইভিএম ক্রয় ও ব্যবহারে অসদাচরণ ও অনিয়ম : বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ইভিএম সম্পর্কিত মতামতকে উপেক্ষা করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ব্যবহূত ইভিএমে যদি ভোটার ভ্যারিফায়াবেল পেপার অডিট ট্রেইল যুক্ত না থাকে তাহলে ভোটের ফল নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা নিরীক্ষার কোনো সুযোগ থাকে না। ইভিএম তৈরির জন্য বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কারিগরি ও পরামর্শক কমিটি বাংলাদেশে ব্যবহূত ইভিএমে পেপার ট্রেইল যুক্ত করার সুপারিশ করলেও কমিশন তা অগ্রাহ্য করে। বিগত জাতীয় নির্বাচনের আগে ইভিএম ব্যবহারে কমিশন এতই উত্সাহী ছিল যে ইভিএম ক্রয় প্রকল্প পাশ হওয়ার আগেই কমিশন ইভিএম ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু করে। বাংলাদেশে ইভিএম ক্রয়ে ভারতের চেয়ে ১১গুণ বেশি খরচ করা হয়েছে। এত খরচ করে ইভিএম ক্রয়ের পরও বিগত জাতীয় নির্বাচনে ব্যবহূত ইভিএমে ক্রটি ছিল বলে পরবর্তীতে স্বীকার করে নেন সিইসি।
এর বাইরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে গুরুতর অসদাচরণ ও অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে ইসির বিরুদ্ধে। তাতে বলা হয়, নির্বাচনপূর্ব আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ভোটের দিন সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে অনেক অস্বাভাবিকতা ও অসঙ্গতি দেখা গেছে। ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে যা সম্ভব নয়। ৫৯০টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ বৈধ ভোট তা একটিমাত্র প্রতীকেই পড়েছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার সই করা প্রাথমিক ফলাফলের সঙ্গে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলেও অমিল পাওয়া গেছে। ৩২টি আসনে বৈধ ভোট বেড়েছে ৪৫ হাজার ৫৯৬টি। ১৯টি আসনে বৈধ ভোট কমেছে ১০ হাজার ৯৩০টি। অন্যদিকে ৪০টি আসনে ১০৯৮৭টি অবৈধ ভোট বেড়েছে এবং ২০টি আসনে ৫ হাজার ৮২০টি অবৈধ ভোট কমেছে। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ও পেপার ব্যালটে ভোটের হারে ৩০ শতাংশ ব্যবধান ছিল। যা ফলাফলকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলের সঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তার ঘোষিত ফলাফলের গড়মিল ভোট জালিয়াতিরই নিদর্শন, যা গুরুতর অসদাচরণ।
বর্তমান ইসির বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ ওঠায় তাদের স্বেচ্ছায় পদত্যাগের পরামর্শ দিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন সরাসরি আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অসদাচরণে জড়িয়ে পড়েছে, যা আগে কখনো কোনো কমিশন করেনি। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কমিশন বিজয়ের মাসে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করেছে। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা সচেতন মানুষ হিসেবে রাষ্ট্রের অভিভাবক রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগটি করেছি। আমরা তো ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাখি না। পাশাপাশি দেশের মানুষও জানতে পারল বিষয়টি। এখন রাষ্ট্রপতি যদি গুরুত্ব দেন তাহলে তদন্ত হবে।’
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
