এইমাত্র পাওয়া

লটারিতে ভর্তি কতটা যৌক্তিক?

ফরিদা ইয়াসমিন।।

করোনা মহামারিতে বিপাকে পড়া শিক্ষাব্যবস্থায় নিত্য নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। গত ২৫ নভেম্বর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তিসংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লটারির মাধ্যমে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।

এ বছর ক্যাচমেন্ট এরিয়া ৪০ শতাংশের পরিবর্তে ৫০ শতাংশ করা হবে। ক্লাস্টারভিত্তিক ভর্তির ক্ষেত্রে লটারিতে পাঁচটি স্কুল নির্বাচন করতে পারবে। করোনা পরিস্থিতির কারণে নতুন শিক্ষাবর্ষ ২০২১ সালে ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে লটারি অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়। মেধা-দক্ষতা-সৃজনশীলতার ভিত্তিতে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা না হলে জাতি ভবিষ্যতে কতটা উন্নতি করতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। লটারির মাধ্যমে ভর্তির ব্যবস্থা সম্পন্ন হলে শিক্ষার্থীদের ওপর ভালো খারাপ দুই-ই প্রভাব পড়বে।

ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচনের ফলে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন একজন যোগ্য শিক্ষার্থী পায়, ঠিক তেমনি শিক্ষার্থীরাও যোগ্য প্রতিষ্ঠান পায়। যেসব শিক্ষার্থী লেখাপড়ায় অমনোযোগী তাদের ক্ষেত্রে লটারিতে ভর্তি বিষয়টা সত্যিই লটারি জেতার মতো।মনোযোগী শিক্ষার্থীদের জন্য লটারিব্যবস্থা হতাশাজনক। মেধা দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষার্থী পাবে না আশানুরূপ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভের সুযোগ। প্রতিবছর যেখানে ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের মাঝে তুমুল প্রতিযোগিতা থাকে, সেখানে লটারির মাধ্যমে ভর্তি কার্যক্রম হলে শিক্ষার্থীদের মাঝে মেধার প্রতিযোগিতা থাকবে না।

বর্তমানে স্থবির হয়ে থাকা শিক্ষা কার্যক্রমকে গতিশীল করতে হয়তো এই উদ্যোগ আপাতদৃষ্টিতে সুফল বয়ে আনবে বলে মনে হতে পারে। কেননা এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয় আর যদি ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয় তাহলে পিছিয়ে যাবে শিক্ষার্থীরা—এই দৃষ্টিকোণ থেকে সিদ্ধান্তের যথাযথ মূল্যায়ন আমাদের কাছে সুখবর। তবে আমরা কোন পদ্ধতি অবলম্বন করে শিক্ষাকে সচল রাখতে চাচ্ছি সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বর্তমানে শিক্ষা মানে শুধুমাত্র শেখা নয়, বরং পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিগরি জ্ঞান, দক্ষতা, প্রশিক্ষণ অর্জন করা। অভিভাবকরা সকলেই চাই সন্তানরা যেন মানসম্মত কার্যকর শিক্ষা পায়। বলা হয়েছে যে, শিক্ষার্থী সংগ্রহের অঞ্চল ৪০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হবে—এতে হয়তো শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়বে তবে মেধাবী শিক্ষার্থীরা যথাযথ শিক্ষা পাবে কি? অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বাদ পড়বে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই পদ্ধতিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী থেকে আমরা কতটা যোগ্য শিক্ষিত জাতি পাব? উচ্চ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া মানেই উচ্চশিক্ষার দিকে অগ্রসর হওয়া।

দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হলে এখানে উচ্চশিক্ষা প্রত্যাশীদের কী হবে? বিনা পরিশ্রমে অনেক শিক্ষার্থী ভাগ্যের জোরে ভর্তি হতে পারবে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়তো তার মেধার তুলনায় অনেক ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাবে। আর অন্যদিকে ভালো মেধা, দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারবে না অনেকে।শিক্ষার্থীদের ভর্তি হওয়া যতটা প্রয়োজন, ততটাই প্রয়োজন শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য কমিয়ে আনা। ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে শিক্ষিত করা প্রয়োজন, অবশ্যই শিক্ষাকে মানসম্মত গুণগত পর্যায়ে রেখে।

শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.