যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফল কী এখনও পাল্টে যেতে পারে?

অনলাইন ডেস্কঃ
মার্কিন নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে গত ৩ নভেম্বর। মার্কিন সংবাদ মাধ্যমগুলোর প্রকাশিত প্রাথমিক ফলে অনেক এগিয়ে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। তবে নির্বাচনের এই ফল মানতে নারাজ রিপাবলিকান প্রার্থী ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

রবিবার এক ফেসবুক পোস্টে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ‘জো বাইডেন কেন দ্রুত তার মন্ত্রীসভা গঠন শুরু করেছেন যখন আমার তদন্তকারীরা লাখ লাখ জাল ভেটের সন্ধান পেয়েছেন? এই জাল ভোট বাতিল হলে চারটি রাজ্যের ফল উল্টে যাবে এবং নির্বাচনের ফলও উল্টে যাবে। আশা করি আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং দেশ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় আদালত এবং নির্বাচিত জন-প্রতিনিধিরা তাদের সাহস দেখাবেন। বিশ্ববাসী সব দেখছে!’

মার্কিন নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল বের হতে এখনো অনেকটা পথ বাকি। এই সময়ের ফলাফল কি উল্টে দিতে পারবেন ট্রাম্প? আসলেই কি তার হাতে অব্যর্থ কোনো কৌশল রয়েছে? এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।

সেখানে বলা হয়েছে, অভূতপূর্ব সেই কাণ্ড যে তিনি ঘটাতে পারবেন তার কোনো লক্ষণ এখন পর্যন্ত নেই। বরঞ্চ তার আইনজীবীরা যেসব অভিযোগ নিয়ে আদালতগুলোতে যাচ্ছেন, সেগুলো হালে তেমন পানি পাচ্ছে না।

শনিবারও পেনসিলভানিয়ার একটি আদালত রাজ্যে কয়েক মিলিয়ন পোস্টাল ভোট জালিয়াতির এক মামলা যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে খারিজ করে দিয়েছে। বিচারক তার রায়ে যথেষ্ট প্রমাণ ছাড়া ওই মামলা আনার জন্য ট্রাম্পের আইনজীবীদের তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করেছেন।

অন্যান্য জায়গাতেও এমন আরো ডজন ডজন মামলায় ট্রাম্পের আইনজীবীরা যথেষ্ট প্রমাণ হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বৃহস্পতিবার তার প্রধান আইনজীবী, নিউইয়র্কের সাবেক মেয়র রুডি জুলিয়ানি জানিয়ে দেন মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা মামলা তারা প্রত্যাহার করছেন। মিশিগানে জো বাইডেন ১ লাখ ৬০ হাজার বোটের ব্যবধানে জিতেছেন।

জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে পুনরায় ভোট গণনার পরও জো বাইডেন ১২ হাজার ভোট বেশি পাওয়ার পর রাজ্যের নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ ফলাফল সার্টিফাই বা প্রত্যয়ন করে দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিবিসির অ্যান্থনি জুরকার বলছেন দেখেশুনে মনে হচ্ছে ট্রাম্প এখন আইনি লড়াইয়ের বদলে দীর্ঘমেয়াদী একটি রাজনৈতিক কৌশলের পথ নিচ্ছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যা করতে পারবেন বলে তিনি আশা করছেন:

এক. আইনের পথে বা রাজ্য পর্যায়ে রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচিত বা সমর্থক কর্মকর্তাদের দিয়ে ভোট সার্টিফিকেশন বা প্রত্যয়ন প্রক্রিয়া যতটা সম্ভব আটকানোর চেষ্টা করবেন।

দুই. রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত যেসব রাজ্যে জো বাইডেন অল্প ভোটে জিতেছেন ভোট জালিয়াতির যুক্তি তুলে ধরে সেসব রাজ্যের আইনসভাগুলোকে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করতে রাজী করাবেন।

তিন. এরপর ওই সব রাজ্যের আইনসভা ১৪ই ডিসেম্বর তাদের ইলেকটোরাল কলেজ ভোটগুলো জো বাইডেনকে না দিয়ে ট্রাম্পকে দেবে।

চার. রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত এই সব রাজ্যের আইনসভার মাধ্যমে (যেমন উইসকনসিন, পেনসিলভানিয়া, মিশিগান) ইলেকটোরাল কলেজ ভোট নিয়ে ট্রাম্প তার বর্তমানের ২৩২টি ইলেকটোরাল ভোটকে টেনে ২৬৯টি ভোটে নিয়ে যাবেন যাতে জো বাইডেনের সাথে তার টাই হয়ে যায়।

পাঁচ. জো বাইডেনের ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা নামিয়ে টাই করতে পারলে, প্রতিনিধি পরিষদ অর্থাৎ মার্কিন পার্লামেন্টের নিম্ন-কক্ষ ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবে। যদিও প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু গোপন এবং রহস্যময় কিছু বিধির কারণে ট্রাম্প সেখানে সুবিধা পেয়ে যেতেই পারেন।

এই সব ঘটনা ঘটাতে কী করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প?

রাজ্য স্তরে যারা ফলাফলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন অর্থাৎ ফলাফল প্রত্যয়ন করবেন, তাদের ওপর চাপ তৈরি করছেন ট্রাম্প।প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটাররা আসলে তাদের রাজ্যের জন্য নির্ধারিত সংখ্যক ইলেকটোরাল কলেজ প্রতিনিধি নির্বাচিত করতেই ভোট দেন। এই প্রতিনিধিরা আবার ১৪ই ডিসেম্বর ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেন।

রাজ্যস্তরে নির্বাচিত এই প্রতিনিধিরা সাধারণত ভোটারদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটান। যেমন মিশিগানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সবারই উচিৎ ইলেকটোরাল কলেজ ভোটে জো বাইডেনকে ভোট দেওয়া কারণ তিনিই সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোট পেয়েছেন।

সোমবার মিশিগানের চার সদস্যের নির্বাচনী বোর্ড – যাদের দু’জন ডেমোক্র্যাট এবং দু’জন রিপাবলিকান পার্টির – তারা বৈঠক করে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করবেন যে রাজ্যের ১৬টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট জো বাইডেনের পক্ষে যাবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন চাপ দিয়ে এই প্রচলিত রীতি বদলে ফেলার চেষ্টা করছেন।

রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত রাজ্যগুলোতে তিনি যে এমন চাপ তৈরির চেষ্টা করছেন তার প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায় যখন তিনি মিশিগানের সবচেয়ে বড় শহর ডেট্রয়েটের রিপাবলিকান দলের নির্বাচনী কর্মকর্তাদের টেলিফোন করেন। মার্কিন একজন প্রেসিডেন্ট রাজ্য স্তরে নিম্ন পর্যায়ের দুই নির্বাচনী কর্মকর্তাকে ফোন করবেন- এমন নজির বিরল।

স্মরণ করা যেতে পারে যে ওই দুই কর্মকর্তা নির্বাচনের দিন ডেট্রয়েটে ভোট বন্ধের সিদ্ধান্ত জানালেও পরে তাদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছিলেন। ইঙ্গিত আরো স্পষ্ট হয় যখন মিশিগান আইনসভার রিপাবলিকান নেতাদের শুক্রবার হোয়াইট হাউজে ডাকেন ট্রাম্প এবং তারা সেই আমন্ত্রণ গ্রহণও করেছেন।

ভোটের ফলাফল পুনর্বিবেচনা এমনকি বদলে দেওয়ার জন্য রাজ্যস্তরে আইনসভাগুলোর রিপাবলিকান সদস্যদের ওপর চাপ তৈরি ছাড়াও অন্যান্য উপায়ও তিনি খতিয়ে দেখছেন বলে খবর বেরোচ্ছে।

রাজ্য স্তরে দুই দল মিলে ভোটের ফলাফর প্রত্যয়ন করা আমেরিকার নির্বাচনে একটি নৈমিত্তিক ঘটনা, কিন্তু ক্ষমতা ধরে রাখতে ট্রাম্প এবার সেই রীতি বদলের চেষ্টা শুরু করেছেন।

ট্রাম্প কি সফল হবেন?

বিবিসির অ্যান্থনি জুরকার মনে করেন যে সাফল্যের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ হলেও, একবারে অসম্ভব নয়। প্রথম কথা, ট্রাম্পকে কয়েকটি রাজ্যের ফলাফল উল্টে দিতে হবে যেসব রাজ্যে বাইডেন কয়েক হাজার থেকে লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। এটা ঠিক যে এবারের নির্বাচন ২০০০ সালের নির্বাচন নয় যেখানে ফলাফলের নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছিল মাত্র একটি রাজ্য- ফ্লোরিডা।

এছাড়াও, ট্রাম্পের আইনজীবীরা যেসব রাজ্য টার্গেট করেছেন, (মিশিগান, উইসকনসিন, পেনসিলভানিয়া এবং নেভাদা) সেসব রাজ্যের গভর্নররা ডেমোক্র্যাট দলের। তারা চুপ করে বসে থাকবেন না। যেমন মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমারের ক্ষমতা রয়েছে রাজ্যের নির্বাচনী বোর্ডে পরিবর্তন এনে এমন কাউকে আনা যিনি ফলাফল প্রত্যয়ন করতে ইচ্ছুক।

তাছাড়া, আইনসভার রিপাবলিকান সদস্যরা ইলেকটোরাল কলেজে ভোট দেওয়ার জন্য যেসব প্রতিনিধি মনোনীত করবেন, গভর্নর তার ইচ্ছামত বাইডেন সমর্থক প্রতিনিধি মনোনীত করতে পারেন। সে অবস্থায় কারা বৈধ ইলেকটোরাল কলেজ প্রতিনিধি তা নির্ধারণের ভার পড়বে কংগ্রেসের ওপর।

তবে তার মানে এই নয় জো বাইডেনের সমর্থকরা উদ্বিগ্ন নন। ফলাফল উল্টে দিয়ে ট্রাম্পের ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা ততটাই যতটা একজন ব্যক্তির লটারিতে কোটি ডলার জেতার পরপরই বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনার মত। কিন্তু তারপরও সেই বিরল সম্ভাবনার চিন্তাতেও অনেক ডেমোক্র্যাট সমর্থকের এই ঠাণ্ডাতেও ঘাম হচ্ছে।

ট্রাম্পের কৌশল কি আইনসিদ্ধ

ট্রাম্প গত চার বছরর ধরে আমেরিকায় প্রেসিডেন্টের আচরণের প্রচলিত রীতিনীতি একের পর এক ভেঙ্গেছেন। ক্ষমতার শেষভাগে এসে তিনি বদলে যাবেন সে সম্ভাবনা কম।

রাজ্যস্তরে নির্বাচনী কর্মকর্তা বা আইসনসভার সদস্যদের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা নজিরবিহীন বা বিতর্কিত হলেও তা বে-আইনি নয়। আমেরিকার নির্বাচনী রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রথমদিকে রাজ্য আইনসভার সদস্যদের ইলেকটোরাল ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষমতা ছিল। তাছাড়া, আমেরিকার সংবিধানে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই যে পপুলার ভোট বিবেচনায় নিয়েই তাদেরকে ইলেকটোরাল কলেজে ভোট দিতে হবে।

যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো একটি আইনসভাকে পপুলার ভোট অগ্রাহ্য করতে রাজী করাতে পারেন, তাহলে নিশ্চিতভাবে ডেমোক্র্যাটরা আদালতে যাবেন। তবে এ ব্যাপারে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় আইনের ব্যাখ্যাও খুব অস্পষ্ট।

কেউ কি আগে এই চেষ্টা করেছেন?

২০০০ সালে শেষবার আল গোর এবং জর্জ বুশের মধ্যে টান টান প্রতিযোগিতা হয়েছিল, তবে সেটি হয়েছিল একটি রাজ্যে এবং ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র কয়েকশ’। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট ফলাফল নতুন করে পর্যালোচনা বন্ধ করে বুশের পক্ষে রায় দেয়।

তবে একাধিক রাজ্যের ফলাফল নিয়ে বিরোধ-বিতর্কের নজির খুঁজতে ১৮৭৬ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান রাদারফোর্ড হেইজ এবং ডেমোক্র্যাট স্যামুয়েল টিলডনের ভোটের লড়াইয়ের দিকে তাকাতে হবে। তিনটি রাজ্যের – লুইজিয়ানা, সাউথ ক্যারোলাইনা এবং ফ্লোরিডার- ফলাফল নিয়ে মতানৈক্য তৈরি হয় যার কারণে কোনো প্রার্থীই ইলেকটোরাল কলেজ ভোটে সংখ্যাধিক্য পেতে ব্যর্থ হয়। ফলাফল নির্ধারণের দায়িত্ব পড়ে পার্লামেন্টের নিম্ন-কক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ওপর যারা রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিয়েছিল যদিও মি হেইজ ২০০০ সালে বুশ এবং ২০১৬ সালে ট্রাম্পের মত পপুলার ভোটে প্রতিপক্ষের চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন।

ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকার করলে ট্রাম্পের ভাগ্যে কী ঘটতে পারে?

যদি নির্বাচনী ফলাফল উল্টে দেওয়ার প্রচেষ্টায় ট্রাম্প ব্যর্থ হন তাহলে ২০ জানুয়ারি দুপুর ১২টা এক মিনিটে জো বাইডেন আমেরিকার ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেবেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরাজয় স্বীকার করুন আর নাই করুন এটি হবে।

এই পর্যায়ে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী সাবেক প্রেসিডেন্টকে অগ্রাহ্য করতে পারবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার চেষ্টায় সফল না হলেও, নির্বাচনী ফলাফল অস্বীকার করার এই নজিরবিহীন আচরণ আমেরিকার ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য একটি উদাহরণ তৈরি করবে।

ইতিমধ্যেই এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর বহু আমেরিকানের আস্থা পোড় খেয়েছে।

শিক্ষাবার্তা/ বিআ


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.