ডঃ নূর জাহান সরকারঃ
চলতি বছর বন্যার স্থায়িত্ব ও প্রভাব ১৯৮৮ কিংবা ১৯৯৮ সালের বন্যাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। প্রাকৃতিক নিয়মে বন্যা চলাকালে বন্যপ্রাণী তথা সাপ মানুষের কোনো ক্ষতি না করে বাড়ি কিংবা বাড়ির উঁচু জায়গাতে আশ্রয় নেয়।
এ সময় সাপে কামড়ানোর প্রকোপ বেশি দেখা দেয়। বিবিসির খবরে জানা যায়, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ ৯৭টি সাপে কামড়ানোর ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে মারা গেছে ৩৬ জন। সাপের কামড় থেকে রক্ষা পেতে কয়েকটি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই আমরা সমস্যাটি মোকাবিলা করতে পারি- ১. মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হবে। মশারির কারণে সাপের কবল থেকে অনেকটাই রক্ষা পাওয়া সম্ভব। ২. মাটিতে অর্থাৎ ফ্লোরে ঘুমানো ঠিক নয়; কেননা সাপ চলাচলের সময় ঘুমন্ত ব্যক্তির হাত-পা নড়াচড়ার কারণে ইঁদুর ভেবে কামড় দিতে পারে মশারির বাইরে থেকে। ৩. গোলাঘরের আশপাশে ঘুমানো ঠিক নয়। কেননা গোলাঘরে ইঁদুর আসে শস্য খাওয়ার জন্য, আর গোলাঘরে সাপ আসে ইঁদুর খেতে। ৪. লাকড়ির ঘর কিংবা রান্নাঘরে ঢুকতে সাবধানতা অবলম্বন জরুরি। এসব জায়গায় রাতে ইঁদুরের উপস্থিতি থাকে এবং সাপ আসে। ৫. সন্ধ্যার পরপরই ঘরের বাইরে যাওয়া ঠিক নয়; কেননা সন্ধ্যার সময় সাপ শিকারের খোঁজে বেরোয়। ৬. রাতের বেলায় ঘরের বাইরে বের না হওয়াই ভালো। যদি প্রয়োজনে বের হতে হয় তাহলে জুতা পরে টর্চ নিয়ে বেরোতে হবে।
ফসল রক্ষায় সাপের জুড়ি নেই। সাপ ইঁদুর খেয়ে কোটি কোটি টাকার ফসল রক্ষা করে। যেখানেই শস্য সেখানেই ইঁদুর, যেমন- শস্যক্ষেত, গোলাঘর প্রভৃতি। যেখানেই ইঁদুর সেখানেই সাপ, সুতরাং আমাদের বিষয়টি বুঝে চলতে হবে। বাংলাদেশে প্রায় ৮০ প্রজাতির সাপ আছে। এ সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে পরিবেশ ধ্বংস, সাপের আবাস ধ্বংস, সাপ মেরে ফেলা, ধরা, অপরিকল্পিতভাবে ইঁদুর মারার রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বেশিরভাগ মানুষই মনে করে সব সাপ অপকারী ও বিষধর, যে কারণে সাপ দেখার সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলার প্রবণতা বেশি। এসব ভুল ধারণা দূরীকরণ, প্রকৃতিতে সাপের উপকারিতা, বিশেষ করে বাস্তুসংস্থানে এদের ভূমিকা, অর্থনীতিতে সাপের গুরুত্ব প্রভৃতি বিষয়ে দেশের জনগণকে বাস্তব জ্ঞানদান প্রয়োজন। এ উদ্দেশ্য সামনে রেখেই আমরা সাপের কামড় সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছি। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, এক বছরে সংঘটিত সাপের কামড়ের ঘটনা ৯৯৩টি; যার মধ্যে ২০১ জন মৃত্যুবরণ করে। অর্থাৎ মৃত্যুহার ২০.২৪ শতাংশ। প্রতি লাখে সাপের কামড়ের ঘটনা চার থেকে পাঁচজন। তবে বরিশাল ও চট্টগ্রামের দুর্ঘটনা কিছুটা বেশি, যা প্রতি লাখে ছয় থেকে সাতজন। তবে সবচেয়ে কম ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে, যা প্রতি লাখে দু’জন। ৯৯৩ জন সাপে কামড়ানো রোগীর মধ্যে ৭৪৬ জনই ছিল পুরুষ এবং ২৪৭ জন নারী, যার অনুপাত দাঁড়ায় ৩ :১। সাপের কামড়ে যারা মারা যায়, তাদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। পেশার দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এর মধ্যে কৃষক শ্রেণিই বেশি। বয়সের বিচারে দেখা যায়, ২১ থেকে ৩০ বছরের রোগীই বেশি। তবে সাপের কামড়ে যারা মারা গেছেন, তাদের প্রায় ৫০ শতাংশই ৭০ বছর বয়সী। ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের যদিও সর্প দংশনের ঘটনা সর্বোচ্চ, তবে তাদের মৃত্যুহার সর্বনিম্ন। রাতে সাপে কামড়ানোর ঘটনায় মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। যেসব জায়গা থেকে সাপে কামড়ায় তা হলো- ঘর, বাড়ির ঝোপঝাড়, বাগান, ক্ষেত ইত্যাদি। নদী ও কাদামাটি এলাকায় কম। সাপ পায়েই সবচেয়ে বেশি কামড় দেয়, যা প্রায় ৭৫ শতাংশ। তবে সাপ হাত-মুখ ও ঘাড়েও কামড় দেয়। ঘাড়ে কামড়ের মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৭০ শতাংশ। জুন থেকে আগস্টের মধ্যে সর্প দংশন বেশি ঘটে এবং ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ ঘটনা কম।
সাপের কামড়ের দাগ অন্য প্রাণীর কামড়ের মতো নয়। বিষধর সাপের বিষদাঁতের চিহ্ন সহজেই বোঝা যায়। বিষধর সাপে কামড়ালে একটু দূরত্বে দুটি বিষদাঁতের চিহ্ন দেখা যায়। নির্বিষ হলে ছোট ছোট পাশাপাশি কয়েকটি দাঁতের চিহ্ন দেখা যায়। আমাদের দেশে সাপের কামড়ের যত ঘটনা ঘটে, তার প্রায় ৫২ শতাংশই বিষধর। বাকি ৪৮ শতাংশ নির্বিষ। বাংলাদেশে সাপের কামড়ে মৃত্যু হয় ২০ থেকে ২২ শতাংশ। পুরুষ ও নারীর মৃত্যুহার যথাক্রমে ৭৫ ও ২৫ শতাংশ। কেননা বেশিরভাগ পুরুষই কৃষিক্ষেত ও বন-জঙ্গলে কাজ করেন। অন্যদিকে মেয়েরা বেশিরভাগই ঘরে কাজ করেন। ৫৪ শতাংশ সর্প দংশন ঘটে ক্ষেত-খামারে ও ৪৬ শতাংশ ঘটে বাড়িতে। গ্রামের মানুষ শস্য ঘরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখেন, যা খেতে ইঁদুর আসে। আর ইঁদুর খেতে সাপ আসে। এ ছাড়া তারা রাতে মশারিও তেমন ব্যবহার করেন না।
গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে সাপে কামড়ানোর ঘটনা বেশি। কেননা এ সময় বেশিরভাগ সাপের ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়। অত্যধিক বৃষ্টিপাতের কারণে সাপের আবাসস্থলও ডুবে যায়। ফলে এরা তুলনামূলকভাবে উঁচু জায়গা অর্থাৎ ঘরে চলে আসে। এ সময় সাপে কামড়ানোর ঘটনাও বেশি ঘটে। শীতকালে সাপ সাধারণত শীতনিদ্রায় থাকে। এ সময় সাপে কামড়ানোর ঘটনা নেই বললেই চলে। দেশের প্রতিটি হাসপাতালে সাপের কামড়ের চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন থাকা বাঞ্ছনীয়। সাপে কামড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রোগীর ক্ষতস্থানের একটু ওপরে কষে বাঁধতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যথাযথ ডাক্তারের কাছে চিকিৎসার জন্য নিতে হবে। ডাক্তারের চিকিৎসা ছাড়া কোনো চিকিৎসাই যথাযোগ্য নয়। কোনো কোনো সময় ওঝা বা সাপুড়ের চিকিৎসায় রোগী ভালো হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে বুঝতে হবে সাপটি কামড় দেওয়ার সময় যথেষ্ট বিষ প্রয়োগের সুযোগ পায়নি। নির্বিষ সাপ কামড়ালে রোগী এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। জনগণ সচেতন হলেই সাপের কামড়ের সংখ্যা কমে আসবে।
পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষাবার্তা/ বিআ
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
