ম তারেক মাহমুদ।।
পাখিরা মনের সুখে আকাশে ডানা মেলে উড়ছে। কিছু পাখি গাছের উঁচু ডালে বসে একে অপরের সঙ্গে ঠোকরাঠুকরি খেলছে। কেউ ডানা ঝাপটে উড়ে যাচ্ছে, কেউবা উড়ে এসে ডালে বসছে। চারদিকে শত শত পাখির কিচিরমিচির শব্দ আর শব্দ। পাখির শব্দে এ এলকার মানুষের ঘুম ভাঙে।
এ যেন শুধু পাখির রাজ্য। এরকমই চিত্র দেখা গেল ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের আশুরহাট গ্রামে। এ গ্রামের মানুষ পাখির মিষ্টি মধুর ডাক ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করতে পারে না। পাখিদের প্রতি পরম ভালোবাসা থেকে নিজ গ্রামকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলেছেন তারা। যে কারণে এ গ্রামকে এখন সবাই পাখির গ্রাম বলেই চেনে। শীত এলেই এসব পাখির আনাগোনা বেড়ে যায়।
কিন্তু শিকারিদের অত্যাচারে শান্তিতে নেই আশুরহাটের এ পাখিরা। দিনের বেলায় গ্রামবাসী পাহারার ব্যবস্থা করলেও রাতের আঁধারে শিকারিরা নির্বিচারে পাখি শিকার করছে। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার প্রত্যন্ত একটি গ্রাম আশুরহাট। গ্রামটির মধ্যপাড়ায় পুরনো আমলের তিনটি বিশালাকার দীঘি রয়েছে। দীঘি তিনটির চারপাশে রয়েছে বড় বড় শিমুল, কড়ই, মেহগনি ও জামগাছসহ ঘন বনজঙ্গল।
২০১০ সাল থেকে গ্রামটির দীঘিগুলোর পাড়ের একটি বিশালাকার মিশুল গাছে এশীয় শামুকখৈল ও পানকৌড়ি পাখি বাসা বাঁধতে শুরু করে। সে বছর শীত শেষে তারা চলে যায়। পরের বছর আবার এসে সেই শিমুল গাছেই আশ্রয় নেয় পাখিরা। প্রথম দিকে তারা আসা-যাওয়া করতে থাকলেও গত ছয় বছর থেকে ওই শিমুল গাছে তারা স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধে বসবাস শুরু করেছে। এখন তারা নিয়মিত প্রজননের মাধ্যমে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটাচ্ছে। এতে দ্রম্নত বংশ বিস্তার হচ্ছে এসব বিলুপ্তপ্রায় পাখির।
ভোরে এসব পাখি আহার সংগ্রহে বের হয়। সন্ধ্যার আগে আবার ফিরে ওই এলাকার বিভিন্ন গাছে রাত কাটায়। এভাবে অল্প দিনেই গ্রামটি পাখির অভয়াশ্রম হয়ে উঠেছে। গ্রামে শুধু এ পাখিই নয়, বিকাল হলে ডোবা-নালা ঘিরে বসে শালিক, ঘুঘু, বকসহ ৪-৫ হাজার দেশীয় পাখি। পাখিদের অবস্থানে অপরূপ সৌন্দর্যে ভরে উঠে চারিদিক। এ সৌন্দর্য অবলোকনে ছুটে আসেন দূর-দূরান্তের মানুষ। আশুরহাট গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক জানান, বর্তমানে পাখির সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। শামুকখৈল ছাড়া এরা শামুক ভাঙা এশিয়ান ওপেন বিল স্কক নামেও পরিচিত। নিজেদের গ্রামকে পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণা করে স্থানীয়রা দিনে রাতে এদের পাহারা দিয়ে আসছেন। তার পরেও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিকারিরা বন্দুক নিয়ে এ শামুখ ভাঙা পাখি শিকার করতে আসে। এ নিয়ে শিকারিদের সঙ্গে গ্রামবাসীর প্রায়ই গোলযোগ হয়ে থাকে।
পাখিপ্রেমিক রেহানা খাতুন জানান, গত বছরে উপজেলা প্রশাসন পাখি রক্ষার জন্য দুইটি সাইনবোর্ড দিয়েছেন। আর দিনের বেলায় পাহারা দেওয়ার জন্য দুইজন গ্রাম পুলিশ মোতায়েন করেছিল। কিন্তু পাহারা উঠে যাওয়ার পর থেকে আবারও পাখি নিধন শুরু হয়। এখানে রাতের অন্ধকারে লোকেরা বস্তা নিয়ে এসে পাখি ধরে জবাই করে বস্তায় ভরে নিয়ে যায়। বিলুপ্ত প্রজাতির পাখি রক্ষার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। অপর একজন ফাতেমা রহমান জানান, মানুষ রাতের বেলায় পাখি ধরে নিয়ে যায়। স্থানীয়রা পাহারা দিচ্ছেন তারপরও তারা পাখি শিকারিদের হাত থেকে পাখিগুলো রক্ষা করতে পারছেন না।
এখন যেকোনোভাবেই হোক পাখিগুলো রক্ষা করা দরকার। ওই গ্রামের আরেক বাসিন্দা মতলেব মিয়া জানান, এই গ্রামের পাখিগুলো রক্ষার জন্য গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে অনেক কিছুই বলা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় আজ পর্যন্ত এই পাখিগুলো রক্ষার জন্য কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ জানান, গত ৭-৮ বছর গ্রামটিতে হাজার হাজার এশীয় শামুকখৈল ও পানকৌড়ি পাখি বাসা বেঁধেছে।
এখানে তারা প্রজননের মাধ্যমে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে বংশ বৃদ্ধি করে চলেছে। গ্রামটির নাম এখন পাখির গ্রাম বলে দেশ-বিদেশে পরিচিত হয়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য নিশ্চিতে পাখিগুলো রক্ষার জন্য যেকোনো সহযোগিতা করবে জেলা প্রশাসন।
শিক্ষাবার্তা/এসজেড
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
