ভাষা আন্দোলনের চেতনা বাঙালির আত্মপরিচয় ও আত্মানুসন্ধানের প্রধান প্রতীক। একমাত্র বাঙালি জাতি ছাড়া পৃথিবীর কোনো জাতি ভাষার জন্য প্রাণ দেয়নি। এটিই আমাদের অহঙ্কার। অন্যদিকে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় আত্মদানের দিন ২১ ফেব্রুয়ারি স্বীকৃত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। এ স্বীকৃতি দিনটির মর্মবাণীর এক বৈশ্বিক প্রাসঙ্গিকতাও ঘোষণা করছে।
তাই দেশের মাতৃভাষা চর্চার অধিকার নিশ্চিত করার দায় আমাদেরই সর্বাগ্রে। উদ্বেগের বিষয় হলো, উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার এখনো উপেক্ষিত। গত বুধবার মামলা রায় সবার বোঝার জন্য ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাতেও লেখার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রয়োজনে অনুবাদকের মাধ্যমে হলেও তা প্রকাশ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা চিফ জুডিসিয়াল আদালত ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আমরা চাই প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানে আদালত সাড়া দেবেন।
আরো বেশি দুর্ভাগ্যজনক হলো অভ্যন্তরীণভাবে সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার এখনো আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। সরকারি-বেসরকারি ওপরমহল থেকে হামেশা বলা হচ্ছে, বিশ্বায়নের যুগে আমাদের টিকে থাকতে হলে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে। বিশেষ করে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্যপ্রবাহ, মুক্তবাজার অর্থনীতি ইত্যাদি কারণে ইংরেজি ভাষাজ্ঞান ও লিখন-কথনের দক্ষতা ছাড়া গত্যন্তর নেই। অতএব আমাদের ইংরেজি শিখতেই হবে। পরিস্থিতি এমন যে, ইংরেজি বিদ্যা অর্জন করতে না পারলে কোনো শিক্ষা আর শিক্ষা হয় না, সব বিফলে যায়।
এ মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি রোধ করতে হবে বাংলা ভাষার বিকৃতিও। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রভাষা থেকে শিক্ষার মাধ্যম এবং জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের দাবি ছিল সর্বজনীন। যাকে সামনে নিয়ে আমরা এগিয়েছি অবিচল লক্ষ্যে, স্বাধীনতা ও স্বাধিকার অর্জনে। কিন্তু বর্তমানে সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহার দারুণভাবে উপেক্ষিত। এটা ঘোরতর অন্যায়। চীন, জাপান, কোরিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স প্রভৃতি রাষ্ট্র মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে আত্মনির্ভরশীল হতে পারলে আমরা কেন ইংরেজিনির্ভর থাকব! আমাদের মূল বাধা কোথায়? সেটা বের করা দরকার।
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩ এবং বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ১৯৮৭-এর ৩ ধারা অনুযায়ী দেশের সব সরকারি অফিস, আদালত, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসহ সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু এসব বিষয় কেবল কাগজে-কলমেই পড়ে থাকে। এ কারণে আইন বাস্তবায়নের বিষয়টি হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। হাইকোর্টের একজন আইনজীবী এ বিষয়ে রিট দায়ের করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রুলনিশি জারির পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন।
এছাড়া বেতার ও টেলিভিশনে বাংলা ভাষার বিকৃত উচ্চারণ ও দূষণ রোধেও হাইকোর্টের একটি স্বপ্রণোদিত রুলসহ নির্দেশনা রয়েছে। এরপরও আশানুরূপ বাস্তবায়ন চোখে পড়ছে না। সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার এবং বাংলা ভাষার দূষণ রোধ করায় সরকারকে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। পাশাপাশি দেশপ্রেম, স্বজাতিপ্রীতি এবং সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাতে হবে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
