অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী।।
প্রায় ৮০ বছর বয়সে এককালের তুখোড় ছাত্রনেতা ও ব্যর্থ রাজনীতিবিদ ফেরদৌস আহমদ কোরেশী ইন্তেকাল করেছেন। করোনার ভয়ে তার জানাজায় শরিক হতে পারিনি, তবে আমাদের যে নৈকট্য ছিল, তাতে আমার মন আনচান করেছে। নৈকট্য বললাম এ কারণে যে, আন্তরিকতা বললে ভুল হবে। সেই ১৯৬৬ সাল থেকে আদর্শিক দূরত্বে আন্তরিকতা নৈকট্যে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগেই তার নাম শুনেছিলাম। নামিদামি ছাত্রনেতা ও অতি মেধাবী ছাত্র ফেরদৌস আহমদ কোরেশীকে চাটগাঁ ও দেশে মোটামুটি ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ কর্মীরা চিনতেন। মূলত ফেরদৌস ভাই আমার বেশ সিনিয়র হলেও আদর্শের মিল হেতু নৈকট্য এসেছিল, আবার আদর্শের অমিল হেতু দূরত্ব সৃষ্টি হতে হতে বিস্মৃতির পর্যায়ে চলে গিয়েছিল।
তার মৃত্যু তাকে স্মরণ করিয়ে দিল। তিনি পরিণত বয়সেই মারা গেছেন। তবে জীবনের শেষ ৫-৬ বছর অতি যাতনা, দুঃখ, দৈন্যের মধ্যে সময় কেটেছে। সম্বল ছিল ‘দেশবাংলা’ পত্রিকা আর উপার্জনের পথ ছিল ‘দেশবাংলা’ নামাঙ্কিত কয়েকটি বাস আর পত্রিকায় কলাম লেখা। সাম্প্রতিককালে দ্বিতীয়টির কোনো রমরমা ভাব ছিল না, না ছিল তার গঠিত রাজনৈতিক সংগঠন প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক পার্টির কোনো জৌলুস। অসুস্থতার খবর ছাড়া সংবাদপত্রে তাকে দেখেছি বলে মনে হয় না।
১৯৬৫ সালের মাঝামাঝি তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। নির্বাচন সামনে রেখে তিনি এক রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে এলেন। তখন তিনি পদার্থবিজ্ঞানে এমএসসির ছাত্র। সুচালো জুতা, ড্রেন পাইপ প্যান্ট আর হাওয়াই শার্ট পরে বিস্তীর্ণ গোঁফ জোড়া নিয়ে তিনি এলেন। সঙ্গে ছিলেন আবদুর রাজ্জাক, মাজহারুল হক বাকী, লুৎফুল হাই সাচ্চু, ইন্তাজ আলী, মিজানুর রহমান, আমিনুর রশিদ প্রমুখ। আসরটির সর্বকনিষ্ঠ ছিলাম আমি। সে ক্ষুদ্রাকারের সভায় ফেরদৌস কোরেশীকে ডাকসুর প্রতিনিধি হিসেবে চূড়ান্ত নির্বাচন করা হলো এবং সবাই আশ্বস্ত হলেন যে তিনিই হবেন ডাকসুর ভাবী সহসভাপতি।
সেকালে দেশে মৌলিক গণতন্ত্র চালু থাকলেও মৌখিক গণতন্ত্রের আদলে নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য অনুসারে ডাকসু নির্বাচন হতো পরোক্ষ পদ্ধতিতে, হল সংসদগুলোর নির্বাচন ছিল প্রত্যক্ষ ভোটে। ডাকসু প্রতিনিধিরা প্রতিটি হল থেকে ছাত্রছাত্রীদের ভোটে নির্বাচিত হতেন। তারপর পূর্বনির্ধারিত কোটাভিত্তিক সুনির্দিষ্ট আবাসিক হল থেকে ডাকসুর ভিসি, জিএস, এজিএস ও অন্যান্য কর্মকর্তা স্বল্পসংখ্যক প্রতিনিধির ভোটে নির্বাচিত হতেন। সে বছর ডাকসুর সহসভাপতি নির্ধারিত ছিল ফজলুল হক হলের ভাগে। ফেরদৌস কোরেশী ছাড়া দ্বিতীয় কাকে আমরা ডাকসু প্রতিনিধি নির্বাচন করেছিলাম তা এখন একেবারে ভুলে গেছি।
যাক, ভিপি পদের জন্যে ফেরদৌস আহমদ কোরেশীকে ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জ্ঞাতসারে মনোনয়ন দেয়। ছাত্র রাজনীতির প্রারম্ভে ফেরদৌস আহমদ কোরেশী ছাত্র ইউনিয়নের কাছাকাছি ছিলেন। মনোনয়নের পর তিনি ডাকসুর সহসভাপতি হন এবং ১৯৬৫-৬৬ মেয়াদে স্বপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সহসভাপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি হলে থাকতে শুরু করেন। থাকতেন হলের ক্যান্টিন সংলগ্ন দোতলার একটি কক্ষে। আমরা সেখানে প্রায়ই আড্ডা দিতাম আর ‘যুক্ত বাংলা’ নিয়ে ফুসুর-ফাসুর করতাম। এসব আড্ডায় যোগ দিতে আমি আমার ২৩২ নম্বর কক্ষ ছেড়ে মাঝে মাঝে হলের সম্প্রসারিত ভবনে তার সঙ্গে রাত কাটাতাম। সে সময়ে যুক্ত বাংলা আন্দোলনের নেতা ছিলেন মনোরঞ্জন ধর। আমরা যারা আড্ডা দিতাম তাদের মধ্যে ফেরদৌস কোরেশী ছাড়া আরও ছিলেন কবি আল মুজাহিদী, জিয়াউল হক, ওয়াহিদুর রশিদ মুরাদ ও আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের ছেলে হাসু। ১৯৬৫ সালের শেষদিকে ৬ দফা প্রসঙ্গে অন্তত ছাত্রলীগের শীর্ষ পর্যায়ে চাওর হলো আর আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে আমি কোরেশী ভাইদের থেকে ধীরে ধীরে সরে আসতে শুরু করলাম। এক পর্যায়ে আমাদের আদর্শিক দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় আমি তাদের সম্পূর্ণই ছেড়ে দিলাম।
আমি বা আমরা তখনই অনুধাবন করি যে ফেরদৌস আহমদ কোরেশী ৬ দফার প্রতি তেমনটা নিবেদিত নন। এ ব্যাপারে কোনো এক আলোচনায় তার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কিছু কথাবার্তাও হয়। তাকে ফেলে দেওয়ার উপায়ও ছিল না। তাই ১৯৬৭-৬৮ শিক্ষাবর্ষে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে তাকে সভাপতির পদ দিতেই হলো। ভারসাম্য রক্ষার জন্য কট্টর ৬ দফাপন্থি আবদুর রাজ্জাককে পুনরায় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক করা হলো। শিক্ষা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মে আগ্রহী আমি, মনিরুল হক চৌধুরী, শেখ শহীদ প্রমুখ কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হলাম।
সে সময়ের একটা কথা বড্ড মনে পড়ছে। প্রতি রাতে দলের কাজকর্ম শেষে আমরা বর্তমান সচিবালয়ের পাশে একটি রেস্টুরেন্টে খেতে যেতাম। আসতে-যেতে যেসব স্লোগান দিতাম তার দুটো ছিল ‘পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা; পাঞ্জাব না বাংলা, বাংলা বাংলা’। ফেরদৌস কোরেশী আমার কানের কাছে মুখ এনে বলতেন- ‘মান্নান, আসল লোকেরা বলবে, এই ছেলেরা না বুঝেই বাংলা বলছে। তারা বিলেতিটা ধরতে পারলে সেটাই বেছে নেবে।’ ইঙ্গিতটা স্পষ্ট হলেও তিনি বাংলাদেশকে হেয় করার জন্য তেমনটি বলতেন না। তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে এক বছর অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং আমরা তাকে মূলধারা থেকে প্রকাশ্যে বিচ্যুত হতে দিইনি।
১৯৬৯-৭০ সালে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিনি আল মুজাহিদী ও আবদুল মান্নান খানকে যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে চেয়েছিলেন। ইতোমধ্যে ৮ দফার প্রতি ও ৮ দফাপন্থি নেতাদের সঙ্গে তার সৌহার্দ্য আমাদের দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে দাঁড়াল। তার প্রার্থীদের ব্যাপারে মাস্তান মার্কা ছাত্রলীগের সমর্থন ছিল। ভিন্ন ভিন্ন কারণে এদের ওপর আমার প্রভাব ছিল এবং আমি সে প্রভাব কাজে লাগিয়েছিলাম। ছাতকে গিয়েছিলাম ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামে। তোফায়েল আহমেদের দেওয়া বিমান টিকিটে ইন্টার্নশিপ অসম্পূর্ণ রেখে আমি সিলেট থেকে ফেরত এসেছিলাম। আমার প্রভাব কতটা কাজে লেগেছিল জানি না; তবে মাস্তানদের আমি সম্মেলনস্থল থেকে সরিয়ে নিতে সমর্থ হয়েছিলাম। ফেরদৌস কোরেশীর মনোনীত প্রার্থীরা পরাস্ত হলেন আর তারা ছাত্রলীগ বাদ দিয়ে ‘বাংলা ছাত্রলীগ’ গঠন করলেন। ফেরদৌস কোরেশী আতাউর রহমান খানের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটল।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে তার সঙ্গে পুনরায় দেখা আগরতলায়। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ফেলে মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্যে ভারতে গিয়ে তার দেখা পেলাম। তখন তিনি বিবাহিত এবং সম্ভবত এক সন্তানের জনক। তার স্ত্রী নিলুফার পান্না ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছাড়াও শিল্প ও সাহিত্য সংঘের নিয়মিত কর্মী এবং কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। ছাত্রলীগ এবং শিল্প ও সাহিত্য সংঘের সঙ্গে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। নিলুফার পান্না ও অন্যান্যের সঙ্গেও তার নৈকট্য ছিল।
ছাত্রলীগ রাজনীতির অতীত সংঘাতময় আবহের কারণে ফেরদৌস কোরেশী ছিলেন সিরাজুল আলম খানের বিপরীত মেরুর, যদিও দু’জনার জন্ম একই জেলায়। সে কারণে শেখ মনির সঙ্গে ফেরদৌস কোরেশীর বনিবনা ছিল উচ্চ মার্গের। শেখ মনি মুজিব বাহিনী গঠনের দায়িত্ব নিয়ে আমাকে, ফেরদৌস কোরেশী ও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে দিয়ে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে একটা পত্রিকা প্রকাশ ও বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিলেন। এ প্রয়াস ব্যর্থ হলে গাফ্ফার চৌধুরী ও ফেরদৌস কোরেশী কলকাতায় চলে গেলেন, কলকাতায় ফেরদৌস কোরেশী ‘দেশবাংলা’ নামে সাপ্তাহিক প্রকাশের দায়িত্ব নিলেন। পরবর্তীকালের স্বাধীন দেশের ‘দেশবাংলা’ আর আগের ‘দেশবাংলা’ ফেরদৌস কোরেশীর মস্তিস্কজাত শিশু। তিনি তার সম্পাদকও ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের পরও কোরেশী ভাই আর আওয়ামী লীগ বলয়ে ফেরত এলেন না বরং তিনি আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর কট্টর সমালোচক হয়ে পড়লেন। অতীতে এই কারণে তার পক্ষে সামান্য পরিমাণ ৬ দফামুখী হওয়া সম্ভব হলেও ১১ দফা আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অতি সীমিত। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহতের পর তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সহ-সাধারণ সম্পাদক নিয়োজিত হলে আমাদের সঙ্গে শেষ সম্পর্কটুকুও ছিন্ন হলো।
মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখতাম তিনি দল ও ফ্রন্ট বদল করেছেন। বিএনপি ছেড়ে তিনি জেনারেল ওসমানীকে প্রার্থী বানিয়ে নির্বাচনে নামিয়েছিলেন। সর্বশেষ তিনি জেনারেল মইনদের হাত শক্তিশালী করতে ‘কিংস পার্টি’ গঠন করেছিলেন। ফল পূর্ববৎ। শেষমেশ প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক পার্টি নামের রাজনৈতিক দল নিয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় আসার আশায় ছিলেন। এরই মাঝে শুনেছি তিনি পিএইচডি ডিগ্রি করেছেন এবং তার পূর্বের চিন্তায় অর্থাৎ মুক্ত বাংলা আন্দোলনে ফেরত আসার চেষ্টা করেছেন।
তার মৃত্যুতে ব্যথিত হয়েছি, কেননা রাজনীতিতে তার মতো মেধাবীদের আবির্ভাব ও টিকে থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। দোদুল্যমানতা ও যত্রতত্র সিদ্ধান্তহীতার কারণে তিনি রাজনীতিতে সাফল্যের ছাপ রাখতে পারেননি। আখেরে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি ও তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।
মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ; উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
