আমিনুল ইসলাম :
রাত তখন ২.১০, আমি যখন এ লেখাটা লিখছি তখন বিশ্বজুড়ে ১.৫৮ বিলিয়ন ছাত্র-ছাত্রী তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি পাঠগ্রহণ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। শতাংশের হিসেবে প্রায় ৯১% এর ওপরে ১৮৮টি দেশের শিক্ষার্থীরা এই অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আসলে সারা পৃথিবীই একটি ক্রান্তিকাল অতিবাহিত করছে। সকাল-সন্ধ্যা মৃত্যুর মিছিল, করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় উদ্বেগ আর সুস্থ হবার খবরে স্বস্তি- এই হয়ে পড়ছে আজকালকার দিনলিপি। করোনার এই করাল গ্রাসে মানুষের চলার গতি যেমন থমকে গেছে তেমনি থমকে গেছে শিক্ষা।
সকালে ঘুম ভাঙ্গতেই আমার বিদ্যালয়ের এক কিশোর ফোন করেছিল। চলতি বছর জেএসসি পরীক্ষা দেবে। দেখলাম, খুবই হতাশ ও চিন্তিত সে। আমি বললাম, চিন্তিত হয়না স্কুল বন্ধ হলেও অনলাইনে বা টিভির পর্দায় তো ক্লাস চলছে। কথাগুলো শুনে স্বস্তি পেলো, মনে আত্মবিশ্বাস জমা করলো সে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ আছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, কেউ জানে না। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলে ধারণা অভিভাবকসহ বিজ্ঞদের।
তবে, সুসংবাদ হলো এটা যে, সরকারি নির্দেশনায় সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশনে পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয় গত ২৯ মার্চ থেকে। প্রথমে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ক্লাস সম্প্রচার শুরু করা হয়। প্রতিদিন ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির দুটি করে ১০টি ক্লাস স¤প্রচার করা হচ্ছে। এখন প্রাথমিক, কারিগরী, মাদ্রাসা পর্যায়ের ক্লাসগুলোও দেখা মিলছে টিভির পর্দায়। অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা ভেবে প্রতিদিনের ক্লাসগুলো একই দিন বেলা ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত পুনঃপ্রচার করা হয়।
টিভিতে প্রচারিত প্রতিটি ক্লাসের পর বাড়ির কাজ দেওয়া হয়। আর প্রতিটি বিষয়ের আলাদা খাতায় সেই বাড়ির কাজ শেষ করতে হয়। করোনা পরিস্থিতি উন্নত হলে যখন স্কুল খোলা হবে, তখন শিক্ষকদের সেই বাড়ির কাজের খাতা দেখাতে হবে। বাড়ির কাজের প্রাপ্ত নম্বর ধারাবাহিক মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
পড়ালেখার ঘাটতি পোষাতে দ্বিতীয় আরেকটি দারুণ মাধ্যম হলো, জেলায় জেলায় অনলাইন স্কুল। সারাদেশে খুঁজ নিয়ে দেখলাম, প্রায় ৫০ এর উর্ধ্বে অনলাইন স্কুল চলমান। এই অনলাইন স্কুলে সেচ্ছায় দিন-রাত শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষক যার পিছনে লীড দিয়ে যাচ্ছেন সম্মানিত জেলা শিক্ষা অফিসার মহোদয়, টিটি কলেজ’র স্যারবৃন্দ ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার। যারা ক্লাস নিচ্ছেন এর বেশীরভাগ শিক্ষকই এটুআই এর মনোনীত জেলা অ্যাম্বাসেডর। প্রতি জেলায় অনলাইনে একটি করে ফেসবুক পেজ খোলে শিক্ষার্থী ও অভিভাকদের সাথে যোগাযোগ করে শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করার কাজে নেমে পড়েছেন শিক্ষকরা। সত্যিই একটা সৎ প্রচেষ্টা চলছে, যাতে ওদের লেখাপড়ার গতিটা অব্যাহত থাকে। শিক্ষার্থীরা সরাসরি ফোন করে অথবা লাইভ ক্লাস এর মতামত অপশানে তাদের সমস্যা বা প্রশ্ন জানিয়ে শিক্ষকদের কাছ থেকে উত্তর পাচ্ছে। এটা খুবই ইতিবাচক। সত্যিই অস্বীকার করার উপায় নেই যে, অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক যে কোন সময়, যে কোন স্থান থেকে অনলাইন (লাইভ) ক্লাসে অংশ নিতে পারছে।

আমার দেখা দেশে চলমান কিছু অনলাইন স্কুল’র নাম: ময়মনসিংহ অনলাইন স্কুল, রংপুর অনলাইন স্কুল, ঢাকা অনলাইন স্কুল, কুমিল্লা অনলাইন স্কুল, চট্রগ্রাম অনলাইন স্কুল, বরিশাল অনলাইন স্কুল, খুলনা অনলাইন স্কুল, নরসিংদী অনলাইন পাঠশালা, সিলেট বিভাগীয় অনলাইন স্কুল, রাজশাহী বিভাগীয় অনলাইন স্কুল, বাংলাদেশ অনলাইন মাদ্রাসাসহ আরোও অনেক অনলাইন স্কুল খুব অল্প সময়ের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে যাতে, শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করতে ব্যাপক সহযোগিতা করছে।
এ ছাড়া কিশোর বাতায়ন নামে আরেকটি শিক্ষামূলক পোর্টাল রয়েছে, যা শিশু-কিশোরদের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে, যার ঠিকানা হচ্ছে http:// konnect.edu.bd/ এটিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে এবং এটুআই প্রোগ্রামের অধীনে আইসিটি বিভাগের তত্তাবধানে এবং UNDP কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এ পোর্টালটি তৈরি করা হয়। এতে শিশু-কিশোরদের উপযোগী বিভিন্ন মজাদার আকর্ষণীয় কনটেন্ট রয়েছে। যেমন বিভিন্ন গল্প, কবিতা, ভ্রমণকাহিনি, মজার অভিজ্ঞতা, শাহানা কার্টুন, মিনা কার্টুন, বিভিন্ন বিখ্যাত শিশুতোষ বা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র, কমিকস, হাতে আঁকা ছবি, নিজের তোলা ছবি প্রভৃতি রয়েছে এই সাইটটিতে।

প্রতিদিনি এই কিশোর বাতায়ন’র ফেসবুক পেজ থেকে দেশের মেধাবী শিক্ষকরা নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির বিষয় ধরে ধরে লাইভ ক্লাস নিচ্ছেন। লাইভ ক্লাসে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে।
আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে অনলাইন ভিত্তিক লাইভ ক্লাস পরিচালনা করা একটি নতুন অভিজ্ঞতা। কিছু প্রতিষ্ঠান এবং অল্প সংখ্যক শিক্ষক নিজ উদ্যোগে গুগল ক্লাসরুম বা অন্যান্য লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমস ব্যবহার করলেও এটি মূলত কন্টেন্ট শেয়ারে সীমাবদ্ধ ছিল। আসলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে করোনার প্রকোপ একরকম বাধ্যই করেছে অনেক প্রতিষ্ঠানকে অনলাইন ব্যবস্থায় পাঠদান শুরু করতে। সে হিসাবে এদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা।
অনলাইন পাঠদানের সাথে ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি এবং ইন্টারনেট ইনফ্রাস্ট্রাকচার একটি ইস্যু, সম্ভবত: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। উন্নত দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের এই সমস্যাটির সম্মুখীন হতে হয় না, যেটি ইন্টারনেটে ইনফ্রাস্ট্রাকচারে পিছিয়ে থাকা একটি দেশের শিক্ষার্থীকে মোকাবেলা করতে হয়। তাছাড়া, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে একটি বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত কম্পিউটার নেই, অনেকেরই সঙ্গতি নেই উচ্চমূল্যের ব্যান্ডইউথ কিনে লাইভ ক্লাসে সংযুক্ত থাকার। হতাশার বিপরীতে আশার কথা হলো, আমাদের বিপুল সংখ্যক মানুষ আজ মোবাইল ফোনের ব্যবহারকারী। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই স্মার্ট ফোনের ব্যবহারকারী। সুতরাং ব্যান্ডইউথের গতি আর দাম-এই দুটোই মূলত প্রধান অন্তরায় অনলাইন ভিত্তিক শিক্ষাদান পদ্ধতি ব্যাপক অর্থে ছড়িয়ে পড়ার জন্য।


সব শেষে বলতে পারি, ‘অনলাইন স্কুল’ আমাদের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনা। যদিও বিষয়টি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটু কঠিন। ক্লাসরুমের চার দেয়াল, চেয়ার, টেবিল, বোর্ড আর বন্ধুর পাশে বসে ক্লাস করার যে আনন্দ, তা কি আর ফোন কিংবা ল্যাপটপের স্ক্রিনে পাওয়া যায়। তবুও এই দুর্যোগের মুহূর্তে সারাদেশের অনলাইন স্কুল’র উদ্যোগী শিক্ষকদের সাধুবাদ জানাচ্ছি।’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গীকার হোক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম এবং প্রায়োগিক ও উদ্ভাবনী গবেষণায় আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা।
লেখক:
আমিনুল ইসলাম
শিক্ষক, লেখক ও এডুকেশন জার্নালিষ্ট
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
