এইমাত্র পাওয়া

নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা: সড়কে বিশৃঙ্খলা, সরকার কেন নির্বাক?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।

ঢাকার ব্যস্ত এক সকাল। অফিসগামী মানুষের ভিড়, স্কুলপড়ুয়া শিশুদের তাড়া, আর তার মাঝেই হঠাৎ করেই একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বেপরোয়া গতিতে পাশ কাটিয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য থমকে গেল চারপাশ—একটি দুর্ঘটনা ঘটতে পারত, কিন্তু অল্পের জন্য রক্ষা।

এই দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং রাজধানীর প্রতিদিনের বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো—এই বিশৃঙ্খলার দায় কার? আর কেনই বা সরকার যেন নীরব দর্শকের ভূমিকায়?

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা একসময় ছিল অলিগলির যান। ধীরে ধীরে তা উঠে এসেছে প্রধান সড়কে, ভিআইপি রুটেও। কোনো ধরনের ফিটনেস নেই, চালকের নেই বৈধ লাইসেন্স, নেই প্রশিক্ষণ—তবুও তারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজধানীর সড়কজুড়ে। এই চিত্র শুধু যানজটই বাড়াচ্ছে না, বরং প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে তুলছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

প্রশ্ন উঠতে পারে—এই যানবাহন হঠাৎ করে এভাবে ছড়িয়ে পড়ল কীভাবে? এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নীতিহীনতা ও দুর্বল বাস্তবায়ন। বছরের পর বছর ধরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে নানা আলোচনা, নির্দেশনা, এমনকি আদালতের আদেশও এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা বদলায়নি। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

একটি বড় সমস্যা হলো—দায়িত্বহীনতা। কে নিয়ন্ত্রণ করবে এই অটোরিকশাগুলো? সিটি করপোরেশন, নাকি বিআরটিএ? এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই। ফলে এক ধরনের প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই শূন্যতার সুযোগেই বেড়ে উঠেছে নিয়ন্ত্রণহীনতা। যখন একাধিক সংস্থা দায়িত্ব এড়িয়ে চলে, তখন সমস্যার সমাধান তো দূরের কথা, সেটি আরও গভীর হয়।

সরকারের অবস্থানও অনেকটা দ্বিধান্বিত। একদিকে সড়ক শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রয়োজন, অন্যদিকে লাখ লাখ মানুষের জীবিকা। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নিম্নআয়ের বিপুল জনগোষ্ঠী। হঠাৎ করে এই যান বন্ধ করে দিলে তারা কর্মহীন হয়ে পড়বে—এই বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মানবিক বিবেচনার আড়ালে কি আমরা একটি বড় বিশৃঙ্খলাকে প্রশ্রয় দিচ্ছি না?
নীতিনির্ধারকদের এই দ্বিধা আজ নগরবাসীর জন্য যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে নিরাপত্তাহীন সড়ক, অন্যদিকে অনিশ্চিত নীতি। ফলে সমস্যাটি দিন দিন জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে।

অটোরিকশা চালকদের একটি বড় অংশ কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই রাস্তায় নেমে পড়ছে। ট্রাফিক আইন সম্পর্কে তাদের ধারণা সীমিত, অনেক ক্ষেত্রে নেই বললেই চলে। ফলে তারা নিজেরাও ঝুঁকিতে থাকে, অন্যদেরও ঝুঁকিতে ফেলে। একটি যানবাহন যখন সড়কে নামে, তখন সেটি শুধু চালকের নয়, আশপাশের সবার নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। এই মৌলিক সত্যটি যেন আমরা ভুলে যাচ্ছি।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যানবাহনের মান। বেশিরভাগ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা স্থানীয়ভাবে তৈরি, যার কোনো মাননিয়ন্ত্রণ নেই। ব্রেক কাজ করছে কি না, ব্যাটারি নিরাপদ কি না, কাঠামো কতটা মজবুত—এসবের কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়ে যায়।

এতসব সমস্যার পরও কেন এই যানবাহন বন্ধ করা যাচ্ছে না? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। শহরে প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ কাজের সন্ধানে আসছে। তাদের অনেকের জন্য অটোরিকশা চালানো একটি সহজ ও দ্রুত আয়ের উৎস। কোনো বিশেষ দক্ষতা ছাড়াই এই পেশায় প্রবেশ করা যায়। ফলে এটি হয়ে উঠেছে এক ধরনের ‘সেফটি ভালভ’—যেখানে বেকার মানুষ সহজে যুক্ত হতে পারছে।

কিন্তু এই সহজ সমাধানই এখন বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিকল্পনাহীনভাবে একটি খাতের বিস্তার শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকেই অকার্যকর করে তোলে। অটোরিকশার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটিই ঘটেছে।

সরকার বিকল্প হিসেবে ই-রিকশার কথা বলছে। এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে, যদি সেটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। ই-রিকশা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই পরিকল্পনা কবে বাস্তব রূপ পাবে? বাজেট স্বল্পতা, নীতিগত জটিলতা—এসব কারণে যদি উদ্যোগটি থেমে থাকে, তাহলে বর্তমান সংকটের সমাধান কোথায়?

সমাধান খুঁজতে গেলে প্রথমেই প্রয়োজন একটি স্পষ্ট নীতি। অটোরিকশা চলবে কি চলবে না—এই দ্বিধা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যদি চলতে দেওয়া হয়, তাহলে তা অবশ্যই নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। লাইসেন্স, ফিটনেস, নির্দিষ্ট রুট—এসব নিশ্চিত করতে হবে। আর যদি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে তার জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, তার বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে অনেক ভালো ভালো আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগের অভাবে সেগুলো কার্যকর হয় না। অটোরিকশার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। নিয়ম আছে, নির্দেশনা আছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন নেই।

এখানে প্রযুক্তির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন, জিপিএস ট্র্যাকিং, অনলাইন লাইসেন্সিং—এসবের মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এতে যেমন নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে, তেমনি স্বচ্ছতাও বাড়বে।

সচেতনতার অভাবও একটি বড় সমস্যা। চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া—এসব উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে যাত্রীদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা নিরাপদ যানবাহন বেছে নেয়।

সবশেষে আসা যাক মূল প্রশ্নে—সরকার কেন নির্বাক? আসলে এটি সম্পূর্ণ নীরবতা নয়, বরং সিদ্ধান্তহীনতা। বিভিন্ন পক্ষের চাপ, বাস্তবতার জটিলতা—এসবের মধ্যে পড়ে সরকার একটি স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারছে না। কিন্তু এই অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। কারণ এর মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।

প্রতিদিনের সড়ক দুর্ঘটনা, যানজট, অনিয়ম—এসব আমাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। একটি আধুনিক নগরীর জন্য এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। উন্নয়নের কথা বলা হলেও, যদি সড়ক ব্যবস্থাই অনিয়ন্ত্রিত থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা অর্থবহ?

এখন সময় এসেছে কঠোর কিন্তু বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অটোরিকশা সমস্যাকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। এটি শুধু একটি যানবাহনের সমস্যা নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, অর্থনীতি, নিরাপত্তা—সবকিছুর সঙ্গে জড়িত।
ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকার, প্রশাসন, বিশেষজ্ঞ, চালক—সবাইকে নিয়ে একটি সমাধান বের করতে হবে। একপাক্ষিক সিদ্ধান্তে কাজ হবে না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকে যায়—আমরা কি একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল নগর চাই, নাকি বিশৃঙ্খলাকে মেনে নিয়ে চলতে রাজি? সরকার যদি এখনো নির্বাক থাকে, তাহলে এই বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে, আরও প্রাণহানি ঘটবে, আরও দুর্ভোগ বাড়বে।

সময়ের দাবি একটাই—নীরবতা ভেঙে কার্যকর পদক্ষেপ। এখনই।

শিক্ষাবার্তা /স/০৪ /০৪/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.