মোছাব্বের হোসেনযুক্তরাষ্ট্র।।
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির বিস্তার, জলবায়ুর প্রভাব, অর্থনীতির রূপান্তর—সবকিছু মিলিয়ে চাকরির ধরনও বদলে গেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সারা বিশ্বের তরুণেরা নতুন নতুন পেশার দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এই পরিবর্তন যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি কিছু কঠিন বাস্তবতাও সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে তরুণদের মধ্যে এখন প্রযুক্তিনির্ভর কাজের প্রতি আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। সফটওয়্যার তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এসব ক্ষেত্রে কাজের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। অনেক তরুণ এখন ঘরে বসেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করছেন এবং নিজের দক্ষতা দিয়ে বৈদেশিক আয় করছে। এর পাশাপাশি সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রেও আগ্রহ বাড়ছে। ছবি ও নকশা তৈরি, ভিডিও সম্পাদনা, লেখা—এসব কাজে দক্ষতা থাকলে তরুণেরা সহজেই নিজের জায়গা তৈরি করতে পারছেন।
সরকারি চাকরির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে একটি প্রবণতা তৈরি করেছে। অনেকেই বছরের পর বছর ধরে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেকেই সফল হতে পারেন না। ফলে সময় ও সম্ভাবনা নষ্ট হয়।
এ ছাড়া পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক কাজের গুরুত্বও দিন দিন বাড়ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই কৃষি—এসব খাতে দক্ষ মানুষের চাহিদা বাড়ছে। বিশ্ব এখন এমন উন্নয়নের দিকে যাচ্ছে, যেখানে পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা হবে। ফলে এই খাতে আগ্রহী তরুণদের জন্য ভবিষ্যতে অনেক সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। এখানে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন, কিন্তু সেই অনুযায়ী চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও অনেক তরুণ দীর্ঘদিন বেকার থাকছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকলেও বাস্তব কাজের দক্ষতা না থাকায় তাঁরা চাকরি পাচ্ছেন না।
বাংলাদেশের চাকরির বাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দক্ষতার ঘাটতি। শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবমুখী শিক্ষার সুযোগ কম। ফলে একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করার পর কর্মক্ষেত্রে গিয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে পিছিয়ে পড়েন। অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যা নতুনদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো চাকরির সীমিত ক্ষেত্র। সরকারি চাকরির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে একটি প্রবণতা তৈরি করেছে। অনেকেই বছরের পর বছর ধরে শুধু সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিতে থাকেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেকেই সফল হতে পারেন না। ফলে তাঁদের সময় ও সম্ভাবনা নষ্ট হয়।
এ ছাড়া বেসরকারি খাতে অনেক সময় চাকরির নিরাপত্তাহীনতা, কম বেতন ও অনিশ্চিত পরিবেশ তরুণদের হতাশ করে তোলে। আবার অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবও দেখা যায়, যা মেধাবী প্রার্থীদের জন্য বাধা সৃষ্টি করে।
তবে এই সমস্যার মধ্যেও সম্ভাবনার অভাব নেই। বাংলাদেশের তরুণেরা যদি নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেন, তাহলে তাঁরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় বাজারেই ভালো করতে পারেন। প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন, ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে তরুণদের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। শুধু প্রচলিত চাকরির দিকে না তাকিয়ে নতুন ক্ষেত্রগুলোতে আগ্রহী হতে হবে। উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা বাড়ানো দরকার। ছোট উদ্যোগ, নতুন ধারণা ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনা অনেক সময় বড় সফলতার পথ খুলে দেয়।
সরকার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা চালু করা, কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো ও কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা জরুরি। পাশাপাশি তরুণদের জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ প্রদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বজুড়ে চাকরির ধরন বদলে গেলেও বাংলাদেশের তরুণদের জন্য চ্যালেঞ্জ এখনো বড়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষতা অর্জন ও ইতিবাচক মানসিকতা থাকলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। তরুণদের উচিত সময়ের সঙ্গে নিজেদের প্রস্তুত করা ও নতুন সুযোগগুলোকে কাজে লাগানো। তাহলেই তাঁরা শুধু নিজেরাই নয়, দেশের অর্থনীতিকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের মন্টনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
