এইমাত্র পাওয়া

১০ শিক্ষকের স্কুলে প্রধান হতে ১৮ বছর: বাস্তবতা না খামখেয়াল?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।

গ্রামের নাম ধরুন—শান্তিপুর। সেখানে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে। ছাত্রছাত্রী দেড়শ’র মতো, শিক্ষক মোটে দশজন। একদিন গ্রামের লোকজন শুনলো—স্কুলের প্রধান শিক্ষক অবসরে যাচ্ছেন। নতুন প্রধান শিক্ষক লাগবে। গ্রামের সবাই ভাবল, এই স্কুলে তো অভিজ্ঞ শিক্ষক অনেক আছেন, তাদের মধ্য থেকেই কেউ দায়িত্ব পাবেন।

গ্রামের চায়ের দোকানে বসে এ নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। দোকানের মালিক রহিম বললেন, “আরে ভাই, আমাদের করিম স্যার তো ১২ বছর ধরে পড়াচ্ছেন। ছাত্রদের কাছে খুব জনপ্রিয়। উনাকেই প্রধান শিক্ষক করা যায় না?”

পাশ থেকে এক যুবক বলল, “না, সেটা হবে না। এখন নাকি প্রধান শিক্ষক হতে ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা লাগবে।”

সবাই একটু চুপ হয়ে গেল। তখন বৃদ্ধ মকবুল চাচা হেসে বললেন, “তা হলে তো আমাদের করিম স্যারকে আর ছয় বছর অপেক্ষা করতে হবে! কিন্তু একটা কথা বুঝি না—দেশ চালাতে এমপি হতে কোনো অভিজ্ঞতা লাগে না, মন্ত্রী হতে লাগে না; কিন্তু দশজন শিক্ষক আর দেড়শ ছাত্রের স্কুল চালাতে ১৮ বছর লাগে!”

চায়ের দোকানে হাসির রোল পড়ে গেল। কিন্তু হাসির আড়ালে লুকিয়ে রইল এক গভীর প্রশ্ন—এটা কি বাস্তবতার দাবি, নাকি নীতিনির্ধারকদের খামখেয়াল?
এই প্রশ্নটাই আজ শিক্ষা অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত আছে—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকতে হলে অবশ্যই অভিজ্ঞ হতে হবে। এই ধারণা অযৌক্তিক নয়। একজন প্রধান শিক্ষক শুধু প্রশাসনিক প্রধানই নন; তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈতিক ও একাডেমিক নেতৃত্বের প্রতীক। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা, শিক্ষার মান উন্নয়ন, শৃঙ্খলা বজায় রাখা—এসব দায়িত্বই তার কাঁধে থাকে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই দায়িত্ব পালনের জন্য কি সত্যিই ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা অপরিহার্য?

বাংলাদেশের অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ই ছোট আকারের। অনেক স্কুলে শিক্ষক সংখ্যা ১০ থেকে ১২ জন, শিক্ষার্থী দুই-তিনশ’র বেশি নয়। এমন প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কাজের পরিধিও তুলনামূলকভাবে সীমিত। সেখানে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রয়োজন দক্ষতা, উদ্যম ও আধুনিক চিন্তা—শুধু দীর্ঘ সময় চাকরি করার অভিজ্ঞতা নয়।

শিক্ষাবিদদের অনেকেই মনে করেন, অভিজ্ঞতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অভিজ্ঞতার একটি যৌক্তিক সীমা থাকা উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষাবিদ এক আলোচনায় বলেছিলেন, “নেতৃত্বের জন্য অভিজ্ঞতা দরকার, কিন্তু নেতৃত্বের জন্য তারুণ্যের উদ্যমও দরকার। ১৮ বছরের বাধ্যতামূলক অভিজ্ঞতা অনেক সময় যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষকদের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে।”

তার মতে, অনেক তরুণ শিক্ষক আছেন যারা প্রযুক্তি, আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। কিন্তু দীর্ঘ অভিজ্ঞতার শর্ত তাদের সামনে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে দেয়।

কুষ্টিয়ার এক তরুণ শিক্ষক বললেন, “আমি ১২ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। স্কুলের সব কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। কিন্তু শুধু অভিজ্ঞতার হিসাবের কারণে আমি কোনোদিন নেতৃত্বের সুযোগ পাব না—এটা হতাশাজনক।”

তার মতে, অভিজ্ঞতার পাশাপাশি দক্ষতা ও নেতৃত্বের যোগ্যতা যাচাই করার ব্যবস্থা থাকা উচিত।

একটি শিক্ষক সংগঠনের নেতা এক সভায় বলেন, “প্রধান শিক্ষক হতে অভিজ্ঞতা দরকার—এটা আমরা মানি। কিন্তু ১৮ বছর বাধ্যতামূলক করা বাস্তবসম্মত নয়। এতে অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষকশূন্য থাকে।”

তার মতে, অনেক স্কুলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার শিক্ষক না থাকায় প্রধান শিক্ষক নিয়োগই দেওয়া যায় না। ফলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে বছরের পর বছর প্রতিষ্ঠান চালাতে হয়।এতে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়ে এবং শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো পেশাগত অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক নয়। একজন সাধারণ নাগরিকও নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য হতে পারেন। অথচ একটি ছোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক প্রধান হওয়ার জন্য দীর্ঘ ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এখানেই তৈরি হয় নীতির অদ্ভুত বৈপরীত্য।
অবশ্য কেউ কেউ যুক্তি দেন—রাজনীতি ও শিক্ষা প্রশাসনের তুলনা করা ঠিক নয়। রাজনীতি একটি ভিন্ন ক্ষেত্র, যেখানে জনগণের ভোটই মূল যোগ্যতা নির্ধারণ করে।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—একটি  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য এত দীর্ঘ অভিজ্ঞতার শর্ত কি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

বিশ্বের অনেক দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দেখা যায়, স্কুল প্রধান নির্বাচনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নেতৃত্বের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ এবং প্রশাসনিক সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অনেক দেশে স্কুল প্রধান হওয়ার আগে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ বা নেতৃত্ব কোর্স সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। সেখানে শুধুমাত্র চাকরির বছর গণনা করাই প্রধান মানদণ্ড নয়।
বাংলাদেশেও যদি এই ধরনের ব্যবস্থা চালু করা যায়, তাহলে হয়তো নেতৃত্বের জন্য আরও যোগ্য মানুষ সামনে আসতে পারবেন।

বাস্তবতা হলো—শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা শুধু অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গি, নেতৃত্বের ক্ষমতা এবং পরিবর্তনের সাহসের উপর।

অনেক সময় দেখা যায়, দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার পরও কেউ প্রশাসনিক নেতৃত্ব দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। আবার তুলনামূলক কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কেউ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারেন।

তাই শুধু অভিজ্ঞতার সংখ্যা বাড়িয়ে দিলেই যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান উন্নত হবে—এমন ধারণা সব সময় সত্য নাও হতে পারে।

সবশেষে আবার ফিরে যাই সেই শান্তিপুর গ্রামের গল্পে।
চায়ের দোকানের সেই আলোচনার শেষে মকবুল চাচা বলেছিলেন, “দেখো ভাই, স্কুল চালাতে অভিজ্ঞতা লাগবে—এটা ঠিক। কিন্তু এত বছর অপেক্ষা করতে করতে যদি ভালো শিক্ষকরা হতাশ হয়ে যায়, তা হলে তো স্কুলেরই ক্ষতি।” তার এই কথার মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে বাস্তবতার উত্তর।

অভিজ্ঞতা অবশ্যই দরকার, কিন্তু অভিজ্ঞতার নামে এমন বাধা তৈরি করা উচিত নয় যাতে যোগ্য ও উদ্যমী শিক্ষকদের সামনে পথ বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষা ব্যবস্থার নীতিনির্ধারকদের উচিত বাস্তবতা, যুক্তি এবং শিক্ষার স্বার্থকে সামনে রেখে এই ধরনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা।

কারণ একটি  স্কুলের নেতৃত্ব শুধু বছরের হিসাব দিয়ে নয়—দক্ষতা, দায়িত্ববোধ এবং দূরদর্শিতার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে।

আর সেই জায়গায় প্রশ্নটা থেকেই যায়—১০ শিক্ষকের স্কুলে প্রধান হতে ১৮ বছর: এটা কি সত্যিই বাস্তবতার দাবি, নাকি নীতির খামখেয়াল?

লেখক : শিক্ষক ও গবেষক।। 

শিক্ষাবার্তা /এ/১৩/০৩/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.