।। ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ।।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে জাকাত
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী হলো এমন একটি নিরাপদ বেড়াজাল যার মাধ্যমে সমাজের অসহায় ও পিছিয়ে পড়া মানুষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। সামাজিক নিরাপত্তা আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের সামাজিক নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদিও এর প্রেক্ষাপট অতি পুরোনো। সামাজিক নিরাপত্তা আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্য কার্যক্রম হলেও প্রাচীনকালেও এর প্রচলন ছিল। বর্তমানে এ কর্মসূচি সুসংগঠিত না হলেও দানশীলতা, মানবতাবোধ ও ধর্মীয় অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সরকারি ও বেসরকারিভাবে এ কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ দেখা যায়। প্রাচীন মিসর, গ্রিস, রোম, চীন, ভারতে এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। বিশ্বমানবতার মহান মুক্তিদূত হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৬২২ সালে স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে যে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, খোলাফায়ে রাশেদিনের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা তার সুপথ প্রদর্শিত হয়ে দীর্ঘদিন মানবকল্যাণে ভূমিকা রেখে চলেছে।
ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বিশ্বমানবতার জন্য চরম এক অভিশাপ। ধনী ও দরিদ্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ইসলাম তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য আর্থিক, মানবিক ও সামাজিক সাহায্যের বিধান রেখেছে। সম্পদ যেন শুধু বিত্তবানদের মধ্যেই পুঞ্জীভূত না থাকে, সে জন্য এতে দরিদ্রের একটা নির্দিষ্ট প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করে দেওয়া হয়েছে। একটি সুখী, সুন্দর ও উন্নত সামাজিক পরিবেশ গঠনে ধনাঢ্য মুসলমানদের অবশ্যই তাদের ‘নিসাব’ পরিমাণ সম্পদের একটি নির্ধারিত অংশ দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিদের দুর্দশা মোচনের জন্য ব্যয় করার বিধান রয়েছে। এর ফলে শুধু অসহায় ও দুস্থ মানবতার কল্যাণই হবে না; বরং সমাজে আয়বণ্টনের ক্ষেত্রেও বৈষম্য হ্রাস পাবে। বস্তুত সমাজে ধনসম্পদের আবর্তন ও বিস্তার সাধন এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের মহান উদ্দেশ্যেই জাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন। পবিত্র কোরআনে ধনসম্পদ বণ্টনের মূলনীতি সম্পর্কে ঘোষণা হয়েছে, ‘যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান, কেবল তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে।’
ধনী লোকেরা তাদের ধনসম্পদের ৪০ ভাগের এক অংশ অসহায়-দরিদ্রদের মধ্যে জাকাত বিতরণ করলে গরিব লোকেরা দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কশাঘাত থেকে মুক্তি পায়। ইসলামি বিধান অনুসারে জাকাত দেওয়ার ফলে সমাজের ঋণগ্রস্ত গরিব-দুঃখী, অনাথ, বিধবা, বৃদ্ধ, রুগ্ণ, পঙ্গু ও অক্ষম ব্যক্তিরা মৌলিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে অভাব মোচন করতে পারে।
জাকাতের অর্থ অভাবী মানুষের হাতে কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বণ্টিত হয়ে তাদের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হয়। ধনী লোকেরা যদি ঠিকমতো জাকাত আদায় করে, তাহলে সমাজে কোনো অন্নহীন, বস্ত্রহীন, আশ্রয়হীন, শিক্ষাহীন দরিদ্র লোক থাকতে পারে না। জাকাতের সুষ্ঠু উশুল ও সুষম বণ্টনের মাধ্যমেই সমাজের দারিদ্র্য দূরীকরণ সম্ভব। যেমনভাবে পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘তাদের ধনসম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের হক।’
জাকাত একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বণ্টনব্যবস্থা। ইসলামি শরিয়তে জাকাত কার্যক্রমকে সে কারণে অন্যান্য আহকামের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। জাকাত হতদরিদ্র, অভাবী ও অক্ষম জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়। কোরআনে সালাত বা নামাজ কায়েমের নির্দেশের পরপরই প্রায় ক্ষেত্রেই জাকাত আদায়ের কথা এসেছে। পবিত্র কোরআনের ১৬টি স্থানে এটি ‘সাদাকাহ’ শব্দে ব্যবহৃত হয়েছে।
অন্যদিকে ভূমির উৎপাদিত ফল-ফসলের জাকাতকে ‘উশর’ নামে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। গচ্ছিত অর্থ, স্বর্ণ-রুপা, ব্যবসায়িক পণ্য, গৃহপালিত পশু, খনিজসম্পদ এবং জমিতে উৎপাদিত ফসলের ওপর জাকাত আদায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ধর্মীয়, নৈতিক ও নানাবিধ ইতিবাচক উদ্দেশ্য থাকলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনের ৩২টি স্থানে সরাসরি জাকাত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবু বকর (রা.) জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের পর্যুদস্ত করেছিলেন এবং জাকাতদানে বাধ্য করেছিলেন।
জাকাতের মূল উদ্দেশ্য হলো, জাকাত গ্রহীতাকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার মাধ্যমে গ্রহীতার পর্যায় থেকে দাতার পর্যায়ে নিয়ে আসা। কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতিতে জাকাত দানের ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন তো হচ্ছেই না; বরং দরিদ্র শ্রেণিকে ভিক্ষুকে পরিণত করা হচ্ছে। কেননা জাকাত প্রার্থীকে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে জাকাতের কাপড় কিংবা পয়সা সংগ্রহের জন্য। এটা ক্রমশ ভিক্ষুকের মতো হাত পাতার অভ্যাস তৈরিতে সাহায্য করছে।
তাছাড়া জাকাত যে সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি, তার সুফলও পাওয়া যাচ্ছে না। যদি সরকারি উদ্যোগে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাধ্যবাধকতার সঙ্গে জাকাত সংগ্রহ এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী তা বণ্টনের ব্যবস্থা করা হতো তাহলে দেশের দারিদ্র্য অনেকাংশে হ্রাস পেত।
লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল