।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।
সকালের স্টাফরুমে অদ্ভুত নীরবতা। স্কুলের নোটিশ বোর্ডে নতুন একটি চিঠি টাঙানো হয়েছে। লাল কালি দিয়ে লেখা—
“জাল সনদের অভিযোগে সহকারী শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত।”
শিক্ষক রফিক স্যার চুপচাপ বসে আছেন। সহকর্মীরা কেউ চোখে চোখ রাখছেন না। যেন সবাই বুঝে গেছে—আজ তিনি, কাল হয়তো আরেকজন।
রফিক স্যার নিজেও জানেন, ভুল হয়েছে। সনদ যাচাই না করেই তিনি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মাথার ভেতর একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
“আমার সনদ কি শুধু আমিই দেখেছি? নিয়োগ কমিটি দেখেনি? প্রধান শিক্ষক স্বাক্ষর করেননি? উপজেলা অফিসে ফাইল যায়নি? জেলা অফিসে অনুমোদন হয়নি?”
ফাইল তো একা হেঁটে যায় না। সনদও একা নিজেকে বৈধ ঘোষণা করে না।
চাকরির সময় তাঁর কাগজপত্র যাচাই হয়েছিল। ইন্টারভিউ বোর্ড বসেছিল। গভর্নিং বডি অনুমোদন দিয়েছিল। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ইউএমইও) সুপারিশ করেছিলেন। জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস (ডিইও) থেকে এমপিওর কাগজ গিয়েছিল। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর বেতনও ছাড় হয়েছে। তাহলে হঠাৎ করে সব দায় কেবল তাঁর কাঁধে কেন?
শিক্ষা শুধু পাঠদান নয়; এটি একটি জাতির নৈতিক ভিত্তি নির্মাণের প্রক্রিয়া। অথচ সেই শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরেই যদি আর্থিক অনিয়ম, ভুয়া সনদ, জাল নিয়োগ ও অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনা ঘটে, তাহলে তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়—নৈতিক পতনেরও ইঙ্গিত দেয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) সম্প্রতি ৯৭৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন চালিয়ে প্রায় ৯০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের তথ্য প্রকাশ করেছে।এটিও কী প্রকৃত চিত্র ? বাস্তবতা বলে এর চেয়ে অনেক গুন বেশী আছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮৯ কোটি ৮২ লাখ ২৫ হাজার ৬০৭ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে এবং প্রায় ১৭৬ দশমিক ৫২৩ একর জমি উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। এই তথ্য শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের দীর্ঘদিনের অসংগতি ও দুর্বলতার প্রতিফলন।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে—
© জাল ও ভুয়া সনদ ব্যবহার
© অগ্রহণযোগ্য সনদের মাধ্যমে নিয়োগ
© ভুয়া নিয়োগ প্রক্রিয়া
© অর্থ আত্মসাৎ
© ভ্যাট ও আয়কর সংক্রান্ত অনিয়ম
এগুলো একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর নজরদারির অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক শিথিলতা মিলেই এই পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।
প্রতিবেদনগুলো পাঠানো হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর–এ। প্রয়োজনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়–এও পাঠানো হয়েছে।
এতে বোঝা যায়, বিষয়টি কেবল একটি বা দুইটি প্রতিষ্ঠানের নয়—এটি একটি বিস্তৃত প্রশাসনিক চক্রের ভেতরে গড়ে ওঠা সমস্যা।
প্রশ্ন উঠেছে—এই অনিয়মের জন্য দায়ী কে?
প্রতিষ্ঠান প্রধান?
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার?
জেলা শিক্ষা অফিসার?
ডিডি?
মাউশির পরিচালক?
বাস্তবতা হলো—এরা প্রত্যেকেই প্রশাসনিকভাবে দায় এড়াতে পারেন না। একটি প্রতিষ্ঠানে ভুয়া নিয়োগ বা অর্থ আত্মসাৎ একদিনে সম্ভব নয়। ফাইল পাস হয়েছে, অনুমোদন এসেছে, বেতন বিল ছাড় হয়েছে—অর্থাৎ বিভিন্ন স্তরে স্বাক্ষর ও অনুমোদন রয়েছে।
শুধু প্রতিষ্ঠান প্রধানকে বলির পাঁঠা বানালে সমস্যার মূল ধরা পড়বে না। আবার কেবল মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের শাস্তি দিলেও হবে না, যদি কেন্দ্রীয় পর্যায়ের তদারকি দুর্বল থাকে।
শিক্ষক-কর্মীচারী ঐক্য জোটের সাংগঠনিক সম্পাদক হাওলাদার আবুল কালাম আজাদ বলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। অনেক সময় স্থানীয় রাজনৈতিক চাপ ও গভর্নিং বডির প্রভাবের কারণে প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষ একক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আবার কোথাও কোথাও ব্যক্তিগত লোভও কাজ করে। তাই ব্যক্তিকে নয়, পুরো ব্যবস্থাকে সংস্কার করতে হবে।”তার মতে, আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং তদারকি সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি আরও বলেন, “শাস্তি অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু শুধু কয়েকজনকে বরখাস্ত করলেই হবে না; প্রশাসনিক চেইনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।”
একজন শিক্ষাবিদ মনে করেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়ম মূলত শাসনব্যবস্থার দুর্বলতার ফল। আমাদের শিক্ষা প্রশাসনে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। একই ব্যক্তি যদি নিয়োগ, বেতন অনুমোদন ও তদারকির সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়।”
তিনি বলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জমি বেহাত হওয়া আরও উদ্বেগজনক। এটি কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ হারানোর সমান।”
তার প্রস্তাব—
© শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও আর্থিক হিসাব বছরে অন্তত একবার প্রকাশ্য অডিট করা।
© জেলা পর্যায়ে স্বাধীন নিরীক্ষা সেল গঠন।
© অভিযোগ গ্রহণ ও সুরক্ষিত হুইসেলব্লোয়ার ব্যবস্থা চালু করা।
© প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া সমাধান নয়
এই ঘটনা প্রমাণ করে, নিরীক্ষা কার্যক্রম নিয়মিত হলে অনিয়ম ধরা পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এতদিন কেন ধরা পড়েনি?
সম্ভবত নিরীক্ষা প্রক্রিয়া ছিল অনিয়মিত, অথবা প্রতিবেদন বাস্তবায়নে ছিল গড়িমসি। অনেক সময় দেখা যায়, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও বাস্তবায়ন হয় না। ফলে অপরাধীরা শাস্তি পায় না এবং অনিয়ম চলতেই থাকে।
এখন প্রয়োজন—
© নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুপারিশ বাস্তবায়ন
© দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও ফৌজদারি ব্যবস্থা
© আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায় নিশ্চিত করা
© জমি উদ্ধারে দ্রুত পদক্ষেপ
© কেবল শাস্তি নয়, নৈতিক পুনর্গঠন
শিক্ষা খাতে অনিয়ম মানে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের সঙ্গে প্রতারণা। একজন ভুয়া সনদধারী শিক্ষক যদি নিয়োগ পান, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো প্রজন্ম।
এখানে নৈতিকতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকতা একটি নৈতিক পেশা। যদি এই পেশায় অনিয়ম প্রবেশ করে, তাহলে সমাজে ভুল বার্তা যায়।
অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থানীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। গভর্নিং বডি গঠন থেকে নিয়োগ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে। ফলে প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও অনেক সময় নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না।
এই সংস্কৃতি বদলাতে না পারলে নিরীক্ষা প্রতিবেদন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে।
যা করা যেতে পারে:
© শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণ অনলাইন ও ট্র্যাকিং সিস্টেমে আনা।
© নিয়োগ প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয়ভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন করা।
© নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রকাশ করা।
© অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।
© শিক্ষা প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো।
ডিআইএর এই প্রতিবেদন শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। ৯০ কোটি টাকা ফেরতের সুপারিশ ও ১৭৬ একর জমি উদ্ধারের প্রস্তাব দেখিয়ে দেয়—সমস্যা গভীর।
এখন প্রশ্ন একটাই—এই প্রতিবেদন কি আরেকটি ফাইল হয়ে থাকবে, নাকি এটি হবে শুদ্ধি অভিযানের সূচনা?
দায় কেবল একজনের নয়; দায় একটি ব্যবস্থার। তাই শাস্তিও হতে হবে সর্বস্তরে। ব্যক্তি নয়, পুরো কাঠামোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে সেই মেরুদণ্ডে জমে থাকা দুর্নীতির বিষ দ্রুত অপসারণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা দায়মুক্ত থাকতে পারব না।
লেখক:শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা /এ/০২ /০৩/২০২৬
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল