এইমাত্র পাওয়া

খেজুরের কাঁচা রস পান পরিহার করুন

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ।।

নিপাহ ভাইরাস একটি মারাত্মক জেনেটিক রোগ, যা প্রাণী থেকে মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার সুঙ্গাই নিপাহ গ্রামে প্রথম এ ভাইরাস শনাক্ত হয় এবং ওই গ্রামের নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয় নিপাহ। গবেষণায় দেখা যায়, শূকরের মাধ্যমে ভাইরাসটি অন্যান্য প্রাণীতে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ২০০১ সালে এবং এরপর থেকে প্রায় প্রতিবছরই শীত মৌসুমে এ রোগের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে এবং অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও আমাদের দেশকে নিপাহ ভাইরাসের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ধরা হয়ে থাকে।

নিপাহ ভাইরাসের প্রধান বাহক হলো ফলখেকো বাদুড়। বাদুড়ের লালা ও মলমূত্রের মাধ্যমে ভাইরাসটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। বাংলাদেশে ডিসেম্বর থেকে মে মাসে খেজুরের কাঁচা রস সংগ্রহের সময় সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। বাদুড় রসের হাঁড়িতে লালা বা মলমূত্র ত্যাগ করলে সেই কাঁচা রস পান করার মাধ্যমে মানুষ আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া বাদুড়ে আংশিক খাওয়া ফলমূল, দূষিত খাবার, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এবং আক্রান্ত মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটতে পারে।

ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ৫ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে সাধারণত রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। অবশ্য কেউ কেউ উপসর্গহীনও থাকতে পারেন। শুরুতে জ্বর, মাথা ও পেশিতে ব্যথা, কাশি ও দুর্বলতা দেখা যায় এবং পরবর্তী সময় শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি ও মস্তিষ্কে এনসেফালাইটিসজনিত গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি এবং যারা বেঁচে যান, তাদের অনেকেরই স্থায়ী স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেয়।

নিপাহ ভাইরাস শনাক্তে পিসিআর ও এলাইজা পরীক্ষার ব্যবহার হয়। তবে এ রোগের কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা টিকা এখনও নেই। তাই লক্ষণ দেখামাত্র দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা দিতে হয়। রোগীর পরিচর্যায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের মাস্ক, গ্লাভস ও পিপিই ব্যবহারসহ কঠোর সতর্কতা মানতে হবে।

নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। শীতের সময় জনপ্রিয় হলেও খেজুরের কাঁচা রস কোনোভাবেই পান করা উচিত নয়; পান করতে হলে অবশ্যই ভালোভাবে ফুটিয়ে নিতে হবে। তবে খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড় কিংবা রান্না করা পায়েস ও পিঠা নিরাপদ। রস সংগ্রহের সময় হাঁড়ি নেট, পলিথিন বা বাঁশের বানা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে, যাতে বাদুড় রসের সংস্পর্শে আসতে না পারে। যারা রস সংগ্রহ করেন, তাদের মাস্ক পরা এবং পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া জরুরি। কাঁচা রস বিক্রি বন্ধ করতে হবে এবং ফলমূল ভালোভাবে ধুয়ে খেতে হবে। পাখি বা বাদুড়ে আংশিক খাওয়া ফল না খাওয়াই উত্তম। নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে এবং আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। আক্রান্ত মায়েদের ক্ষেত্রে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে।

যেহেতু নিপাহ ভাইরাসের নির্দিষ্ট চিকিৎসা বা টিকা নেই, তাই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই হলো প্রধান হাতিয়ার। কাঁচা খেজুরের রস পান থেকে বিরত থাকতে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.