নিউজ ডেস্ক।।
ফাতিমা আল-ফিহরির নেতৃত্বে নবম শতকে প্রতিষ্ঠিত কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয় নারী ও শিক্ষার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক, যা বিশ্বের প্রাচীনতম কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জ্ঞানচর্চা, নেতৃত্ব ও নারী ক্ষমতায়নের শক্তিশালী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। লিখেছেন সাজেদা আক্তার
নারী ও শিক্ষার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছেন ফাতিমা আল-ফিহরি। নবম শতকে প্রতিষ্ঠিত কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বিশ্বের প্রাচীনতম কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, বরং এটি নারী নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। আজও এই প্রতিষ্ঠান নারী ক্ষমতায়ন, জ্ঞানচর্চা ও সভ্যতার বিকাশে ফাতিমা আল-ফিহরির অবদানকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
ফাতিমা আল-ফিহরি জন্মগ্রহণ করেন তিউনিসিয়ার কাইরুয়ানে। পরবর্তী সময়ে তার পরিবার মরক্কোর ফেজ শহরে বসবাস শুরু করে। সে সময় ফেজ ছিল ইসলামি সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র। পারিবারিকভাবে সচ্ছল হওয়ায় ফাতিমা ভালো শিক্ষা ও সংস্কৃতির পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। বাবার মৃত্যুর পর তিনি ও তার বোন মারিয়াম আল-ফিহরি উল্লেখযোগ্য সম্পদের উত্তরাধিকারী হন। এই সম্পদ ব্যক্তিগত ভোগে ব্যয় না করে সমাজকল্যাণ ও শিক্ষাবিস্তারে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্তই ফাতিমাকে ইতিহাসে অমর করে তোলে।
৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে ফাতিমা আল-ফিহরি ফেজ শহরে কারাউইন মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে এটি ছিল একটি মসজিদভিত্তিক শিক্ষাকেন্দ্র। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি পরিণত হয় একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, ভাষা ও আইনশাস্ত্র পড়ানো হতো। এই বহুমাত্রিক পাঠ্যক্রমই কারাউইনকে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গড়ে তোলে।
ইউনেসকো ও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের প্রাচীনতম ধারাবাহিকভাবে কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখান থেকেই ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার প্রাথমিক ধারণা বিকশিত হয়েছে বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন বা পাঠদান করেছেন বহু খ্যাতনামা মনীষী ইবনে খালদুন, আল-ইদ্রিসি এবং পরবর্তী সময়ে ইউরোপের চিন্তাবিদদের ওপরও এর প্রভাব পড়ে।
ফাতিমা আল-ফিহরির উদ্যোগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তিনি নারী হয়েও সমাজের প্রচলিত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে জ্ঞানকে সবার জন্য উন্মুক্ত করেছিলেন। সে সময় নারী শিক্ষার প্রশ্নেই যেখানে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা প্রবল ছিল, সেখানে একজন নারীর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল বিপ্লবী চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। তিনি প্রমাণ করেছেন, নারী কেবল শিক্ষার গ্রহণকারী নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থার নির্মাতা ও দিকনির্দেশকও হতে পারেন।
কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এর অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাদর্শ। এখানে বিভিন্ন অঞ্চল, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পটভূমির শিক্ষার্থীরা জ্ঞানার্জনের সুযোগ পেয়েছে। এই বহুত্ববাদী চর্চা মধ্যযুগীয় সময়ে সহনশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তচিন্তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
আজকের প্রেক্ষাপটে ফাতিমা আল-ফিহরির জীবন ও কর্ম নারীদের জন্য গভীর অনুপ্রেরণার উৎস। শিক্ষা, নেতৃত্ব ও সমাজ পরিবর্তনে নারীর ভূমিকা যে কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তার বাস্তব প্রমাণ ফাতিমা আল-ফিহরি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করে। তার প্রতিষ্ঠিত কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয় আজও জ্ঞানের সেই আলো বহন করে চলেছে, যা শুরু হয়েছিল একজন দূরদর্শী নারীর হাতে
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
