নিউজ ডেস্ক।।
চুক্তির নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হওয়াকে কারণ দেখিয়ে প্রায় ১৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধার ভিডিও সাক্ষাৎকার বাতিল করে দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। সেগুলো এখন ঝুঁকিতে পড়েছে হারিয়ে যাওয়ার।
একই সঙ্গে পরিশোধ করা হয়নি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল। ছয় মাস মেয়াদ বাড়িয়েও কাজ শেষ না হওয়ায় অসমাপ্ত অবস্থানেই ইতি টানা হয়েছে প্রকল্পের। শর্ত ভঙের অভিযোগ মানছে না ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান; যে কারণে ঘটনা গড়িয়েছে আদালতে।
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নির্ধারিত মানদণ্ডে উত্তীর্ণ না হওয়ায় প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রায় ১৪ হাজার ৬৪০টি সাক্ষাৎকারের ভিডিও সংরক্ষণও করা হবে না।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যালোচনা কমিটি ভিডিওগুলো যাচাই করে দেখেছে সাক্ষাৎকারের ভিডিওগুলো যেভাবে সম্পাদনা করার কথা ছিল ‘সেভাবে করা হয়নি’। এসব ভিডিওর শব্দ এবং ভিডিওর মানও ‘যথাযথ নয়’।
একারণে শুধু সাক্ষাৎকারগুলো নয়, প্রায় ৫০ কোটি টাকার পুরো প্রকল্পই বাতিল করা হয়েছে।
এর বিপরীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, নির্ধারিত মানদণ্ড মেনেই তারা ভিডিওগুলো বানিয়ে জমা দিয়েছে। প্রথম ধাপে যেসব ভিডিও মন্ত্রণালয় গ্রহণ করেছে, একইভাবে দ্বিতীয় ধাপের ভিডিওগুলোও তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, মন্ত্রণালয় বিল পরিশোধ না করায় প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রাপ্য বিল তারা পরিশোধ করতে পারেননি। এতে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বাধ্য হয়ে তারা হাই কোর্টে রিট আবেদন করেছে। তবে সেটি এখনও শুনানিতে আসেনি।
কী ছিল প্রকল্পে
বাঙালি জাতির পরাধানীনতার আগল ভাঙার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যেসব বীর মুক্তিযোদ্ধা এখনো জীবিত রয়েছেন, তাদের যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে নেওয়া হয়েছিল এ প্রকল্প।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ সালে ‘বীরের কণ্ঠে বীরগাথা’ শিরোনামে নেওয়া হয় এ প্রকল্প। বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয় ৪৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
প্রকল্পের আওতায় ৮০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকারভিত্তিক তথ্যচিত্র, ৮০ হাজার ইউটিউব কনটেন্ট এবং ১৬টি প্রমাণ্যচিত্র তৈরির কথা ছিল।
প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। এর পাঁচ মাস আগে অগাস্টে গণ অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার।
দরপত্রের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক তথ্যচিত্র নির্মাণের এ কাজ পায় ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (এমটিআই) নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ২০২৩ সালের ১৬ মে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে হয় চুক্তি।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধাদের ভিডিও সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় ১৯টি প্রশ্ন করার কথা ছিল।
সাক্ষাৎকারে একজন মুক্তিযোদ্ধা কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন, কার নির্দেশে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কোথায় ও কীভাবে ছিলেন, সম্মুখযুদ্ধের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল কি না, অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন কি না, যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন কি না, কোন সেক্টর কমান্ডারের অধীনে যুদ্ধ করেছেন- এ ধরনের ১৯টি মানদণ্ড ঠিক করে দেওয়া হয়।
এমটিআই থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রকল্প বাতিল হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি মোট ২৭ হাজার ৪২৮টি ভিডিও চিত্র এবং ৪টি প্রামাণ্যচিত্র বানিয়ে জমা দিয়েছে।
এর মধ্যে প্রথম ধাপে ১২ হাজার ৭৮৮টি ভিডিও চিত্র বিগত সরকারের সময়ে জমা পড়ে। সেগুলো বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরে জমা দেওয়া ১৪ হাজার ৬৪০টি বাতিল করা হয়। এসব ভিডিও এখনও এমটিআইয়ের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
যে কারণে বাতিল
‘বীরের কণ্ঠে বীরগাথা’ প্রকল্পের পরিচালক আফরাজুর রহমান মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যে ভিডিও চিত্রগুলো বাতিল করা হয়েছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করেই বাদ দেওয়া হয়েছে।”
শর্তে ১৯টি মানদণ্ড থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এগুলো এমনভাবে বানিয়ে দেওয়ার কথা ছিল যাতে সোশাল মিডিয়া কনটেন্ট হিসেবে এগুলো দেওয়া যায়।
“শর্ত ছিল ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে যাতে হয়। এর থেকে বড় যাতে না হয়। কিন্তু তারা সেভাবে দেয়নি।”
তিনি বলেন, “প্রত্যেকটা প্রকল্পে ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) থাকে। ডিপিপিতে বলা থাকে যে কী কী শর্ত এবং ওই যে যাচাই-বাছাই করার জন্য একটা কমিটি, এটাও প্রকল্পের ডিপিপিতেই নির্ধারিত কমিটি। আগে (আওয়ামী লীগ আমলে) যিনি মন্ত্রী ছিলেন, ওনার নেতৃত্বে একটা কমিটি এবং বিশেষজ্ঞরাও ছিলেন। তো সেই কমিটি যাচাই-বাছাই করেছে, ওখান (প্রথম ধাপ) থেকেও অনেকগুলো বাদ গেছে। বাকিগুলো আমরা সংরক্ষণ করেছি।”
আফরাজুর বলেন, “পরবর্তীতেও আমরা যাচাই-বাছাই করেছি, পরেরগুলো তারা এত তাড়াহুড়ো করে করেছে, আমরা বলেছি এডিট করে দিতে, তারা এডিট করে দেয়নি। তারা যখন জমা দিয়েছে, তখন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ।
“ফলে কমিটি বলেছে, এরা যেভাবে দিয়েছে, এটা গ্রহণ করার মতো কোনো কিছু হয় নাই। এটা নেওয়া যাবে না। সেজন্য আমরা অর্ধেক নিতে পারি নাই। অর্ধেক নিয়েছি ওই অর্ধেকটার বিলও পেমেন্ট হয়েছে।”
সেই প্রকল্পের এখন কী অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছয় মাস সময় বাড়ানো হলেও তারা শর্ত মেনে বাকি ভিডিওগুলো এডিট করে দেয়নি। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর পর কাজ না হওয়ায় সরকারের নির্দেশনায় প্রকল্প সমাপ্ত করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর তিন দিন পর ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।
সরকারে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে ফারুক-ই-আজম বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক ভিডিও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। কমিটির সভাপতি করা হয় মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদকে।
কমিটর প্রধানও একই তথ্য দিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই কমিটি এবং আরও বিশেষজ্ঞ কমিটি উপদেষ্টার সভাপতিত্বে তারা দেখেছে। দেখে সেগুলো ১৯টি মানদণ্ডের মেজরগুলোর মধ্যে উত্তীর্ণ না হওয়ায় বাতিল করা হয়েছে।”
এই কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় নির্ধারিত কাঠামো অনুসরণ করা হয়নি। কোথাও ভিডিও ও শব্দের মান নির্ধারিত মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়নি।
উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজমের সভাপতিত্বে ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সভায় এ প্রকল্পের আওতায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
কী বলছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ৮০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার ভিডিওভিত্তিক সাক্ষাৎকার নেওয়ার প্রথম ধাপে বিগত সরকার আমলে ১২ হাজার ৭৮৮টি সাক্ষাৎকার জমা দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ জন্য তিনটি বিলে তাদের ৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার পরিবর্তনের পর বাকি ভিডিও জমা দিয়ে ৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বিল পরিশোধের দাবি জানায় প্রতিষ্ঠানটি। তখন সাবকমিটি গঠন করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের (এমটিআই) ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার আজমল কবির রাব্বি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রকল্পে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর প্রায় ৩০ হাজার ভিডিও আমরা সংগ্রহ করি মাঠ পর্যায়ে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৭৮৮টি ভিডিও মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া এবং ওগুলোর বিলও ছাড় হয়েছে। পরের ১৪ হাজার ৬৪০টি ভিডিও আমরা সঠিক সময়ে জমা দিয়েছি এবং সেগুলি সব এডিটেড ভার্সন। সেগুলি র’ ফাইল এবং ডিটেড ফাইল সবকিছুই আমাদের কাছে আছে।”
তিনি বলেন, “এই কার্যক্রম যখন শুরু হয়, মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যেকটা জেলার জেলা প্রশাসক বরাবর একটা অফিস আদেশ দেওয়া হয়। সেই আদেশের আলোকে প্রত্যেক জেলা প্রশাসক ইউএনও এবং সেখানকার মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডারদের সঙ্গে মিটিং করতেন। এরপর আমাদের যে অ্যাডমিন টিম থাকত, সেই অ্যাডমিন টিম তাদের সাথে আলোচনা করে ইন্টারভিউ নিত।”
ডিপিপিতে যে টাইপের প্রশ্ন ছিল, যেভাবে করতে হবে, সে মোতাবেক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় কর্মীদের। এরপর মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু হয় বলে দাবি তার।
তার ভাষ্য, “এই সমস্ত যে কার্যক্রম, এগুলো সবই মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনার বাইরে গিয়ে আমরা করিনি। পিডি যেটা বলছেন যে ১৯টি মানদণ্ড ঠিক হয় নাই বা ঠিকমতো সম্পাদনা করেনি, উনি নিজেই প্রথম থেকে মাঠ পর্যায়ে গেছেন, উনি এই ভিডিওগুলো নির্দেশনা দিয়ে করিয়েছেন, উনিই বিল দিছেন। আবার এই ১৪ হাজার ৬৪০টির ক্ষেত্রে গিয়ে উনি বলতেছেন যে মানদণ্ড ঠিক হয় নাই বা আপনার ভিডিও সম্পাদনা ঠিক হয় নাই।”
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই মন্ত্রণালয় এসব ভিডিও বাতিল করে জানিয়ে আজমল বলেন, “এখন বিষয় হচ্ছে যে, ৫ অগাস্টের পরে যখন সরকার এল, এরপর মন্ত্রণালয় যে মিটিংগুলো করছে, এগুলোর কোনো কিছুতেই আমাদের ডাকেও নাই, আমরা জানিও না। তারা নিজেদের মতো করেই আলোচনা করছে। তারপর ওনারাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ভিডিওগুলো হয় নাই।”
বিষয়টি নিয়ে আদালতে যাওয়ার তথ্যে দিয়ে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে রিট মামলা চলমান। তবে এখন পর্যন্ত কোনো শুনানি হয়নি।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
