এইমাত্র পাওয়া

মাঠ পুলিশকে নিরপেক্ষ রাখতে একগুচ্ছ নির্দেশনা

 নিজস্ব প্রতিবেদক।। 

২০১৮ সালের রাতের ভোটের কালিমা মুছতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনানুগ দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চায় পুলিশ। এরই অংশ হিসেবে দেড় লাখ পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নানা দিক নিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে পুলিশ সদর দপ্তর। এ ছাড়া নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা প্রদান করতে একটি বুকলেট তৈরি করছে পুলিশ সদর দপ্তর। যেখানে ভোটের মাঠে পুলিশের কার কী ভূমিকা পালন করতে হবে এবং দায়িত্ব পালনকালে কোন কোন বিষয় কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে, সেই বুকলেটে তা লিখিত নির্দেশনা থাকছে। বুকলেটটি নির্বাচনী দায়িত্ব পালনরত প্রত্যেক মাঠপুলিশের সদস্যদের পকেটে থাকবে।

বুকলেটে উল্লেখ করা হয়েছে- নিরপেক্ষতা, নিষ্ঠা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করা পুলিশ বাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনে ধৈর্য ও সংযম বজায় রেখে আইনানুগ দায়িত্ব পালন, উসকানি এড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলা ও সৌজন্য বজায় রেখে দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে বুকলেটে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন আমাদের সময়কে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানে পুলিশের ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে পালনে আমরা বদ্ধপরিকর। এরই অংশ হিসেবে নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনে পুলিশ সদস্যদের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় নিয়ে একটি বুকলেট তৈরি করা হচ্ছে। যারা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের বুকলেটের নির্দেশনা অনুসরণ বাধ্যতামূলক।

নির্বাচনে পুলিশের নিরপেক্ষ ভূমিকা : নির্দেশনায় বলা হয়েছেÑ কোনো রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা গোষ্ঠীর পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করা যাবে না; সব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে আইনগত সহায়তা প্রদান করতে হবে। দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশকে ব্যক্তিগত মতাদর্শ, প্রভাব বা চাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে হবে এবং ভোটারদের অবাধ ও স্বাধীনভাবে ভোট প্রদানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

নিরপেক্ষতা প্রদর্শনে পুলিশের বর্জনীয় : প্রার্থীদের সঙ্গে ছবি তোলা, আলাপচারিতা বা ঘনিষ্ঠ হওয়া যাবে না; ভোটার বা নির্বাচন অফিসারের কাজে অযথা হস্তক্ষেপ করা যাবে না; প্রিসাইডিং অফিসারের অনুমতি ছাড়া ভোটকক্ষে প্রবেশ করা যাবে না। পুলিশ সদস্যদের ভোটারকে কোনো প্রার্থী বা প্রতীকের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রভাবিত করা যাবে না; কোনো রাজনৈতিক দল প্রার্থী বা সমর্থকের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করা যাবে না; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে না গেলে বলপ্রয়োগ বা লাঠিচার্জ করা যাবে না। কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর মিছিলে অংশগ্রহণ বা কার্যালয়ে উপস্থিত থাকা যাবে না; রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত পছন্দ প্রকাশ অথবা কোনো বক্তব্য প্রদান করা যাবে না; গালাগাল, হুমকি বা অবমাননাকর কোনো আচরণ প্রদর্শন করা যাবে না।

এতে আরও বলা হয়, আইন ও নির্বাচন বিধিমালার পরিপন্থি কোনো নির্দেশ পালন করা যাবে না; সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক পোস্ট, শেয়ার বা কমেন্ট করা যাবে না; প্রচারণায় অযাচিত হস্তক্ষেপ বা একপাক্ষিক সহায়তা প্রদান করা যাবে না; দায়িত্বকালীন অপ্রয়োজনে কোন ফোন ব্যবহার বা সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় থাকা যাবে না; নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে যে কোনো ধরনের অনৈতিক আচরণ বা অসদাচরণ করা যাবে না; ভোটের গোপনীয়তা বা নির্বাচনসংক্রান্ত সংবেদনশীল কোনো তথ্য প্রকাশ করা যাবে না; কোনো খবর বা তথ্য নিশ্চিত না হয়ে মিডিয়া বা সংবাদ কর্মীকে বলা যাবে না।

নির্বাচনে পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্য : নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা, নির্বাচন আইন ও আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। নির্বাচন এলাকায় সামগ্রিক শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে এবং ভোটকেন্দ্রের আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে; স্থানীয় জননিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে; সব রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা সমর্থকদের প্রতি সমতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে; ভোটকেন্দ্র, ব্যালট বাক্সসহ অন্যান্য নির্বাচনসামগ্রী, প্রিসাইডিং অফিসারসহ নির্বাচন কর্মকর্তা ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; নির্বাচন কার্যালয়সমূহ, রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে; শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে ভোটগ্রহণকালে শৃঙ্খলা রক্ষা ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করতে হবে।

এ ছাড়া ভোটকেন্দ্রের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রিসাইডিং অফিসারের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; জাল ভোট, ভয়ভীতি, সহিংসতা বা আচরণবিধি লঙ্ঘনের অপচেষ্টা হলে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনকালে প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করতে হবে; কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও নির্বাচন কর্মকর্তাকে অবহিত করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনানুগ ও পরিমিত বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

অফিসার ইনচার্জদের দায়িত্ব : ভোটগ্রহণের কমপক্ষে ৭২ ঘণ্টা পূর্বে নির্বাচনী এলাকায় সন্দেহভাজন ও বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুলিশ প্যাট্রল পরিচালনা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ও আশপাশের সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও সহিংসতাসহ যে কোনো অপ্রীতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ ও সার্বিক নিরাপত্তার কাজে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্বাচনপরবর্তী বিজয় মিছিলের সময় সহিংসতা রোধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ; ভোটগ্রহণের সূচনা, অগ্রগতি এবং পরিস্থিতি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে দ্রুত প্রতিবেদন প্রদান করতে হবে।

এ ছাড়া ভোটকেন্দ্রের আশপাশে অস্ত্র মহড়া, ভাঙচুর বা ভয়ভীতি সৃষ্টিকারী কার্যকলাপের যথাযথ প্রতিরোধ করতে হবে। সড়ক ও মহাসড়কে একক অথবা যৌথভাবে নিয়মিত ও আকস্মিক চেকপোস্ট পরিচালনা করতে হবে। ভোটকেন্দ্রে প্রেরণের পূর্বে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের অস্ত্র ও গোলাবারুদের কার্যকারিতা যাচাইপূর্বক তাদের নিকট তা সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ভোটকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় সিসি ক্যামেরা সরবরাহসহ পুলিশ ও আনসার সদস্যদের প্রিসাইডিং অফিসারের নিকট প্রেরণ এবং তাদের দায়িত্ব, কর্তব্য, করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় সম্পর্কে মাইকযোগে সমন্বিত ব্রিফিং প্রদান করতে হবে।

ভোটকেন্দ্রে নিয়োজিত অফিসার ও ফোর্সের দায়িত্ব : ভোটকেন্দ্রে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে নিয়োজিত ফোর্স ও অন্যান্য তদারককারী অফিসাররা সব প্রকার প্ররোচনার ঊর্ধ্বে থেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। ভোটারদের সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধ হয়ে ভোট প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। যারা ইতোমধ্যে ভোট প্রদান করেছেন, তাদের ভোটকেন্দ্রের বেষ্টিত এলাকা (৪০০ গজ ব্যাসার্ধ) ত্যাগ করতে অনুরোধ করবেন এবং কোনো অবস্থাতেই তাদের বেষ্টনীর ভেতরে অবস্থান করতে দেওয়া যাবে না। পুলিশ ও আনসার সদস্যদের এমনভাবে মোতায়েন করতে হবে, যাতে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং বাইরে থেকে কেউ কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারে। ভোটারদের সঙ্গে সর্বদা বিনয়ী আচরণ করতে হবে।

পুলিশ, আনসার, দফাদার ও চৌকিদারগণ যেন কোনোভাবেই উত্তেজনাকর আচরণ না করেন এ বিষয়টি অফিসার ইনচার্জকে নিশ্চিত করতে হবে। অস্ত্র ও গোলাবারুদের হেফাজতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পুলিশ, আনসার, দফাদার ও চৌকিদার সদস্যগণ তাদের খাবার ও আবাসনের জন্য কোনো অবস্থাতেই কোনো প্রার্থী বা তার এজেন্টের ওপর নির্ভরশীল হতে পারবেন না। ভোটগ্রহণ ও ভোটগণনা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটকেন্দ্র থেকে ব্যালটবাক্সসহ সব নির্বাচন সামগ্রী সহকারী রিটার্নিং অফিসার বা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে এসকর্ট করে পৌঁছানো পর্যন্ত সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ, আনসার সদস্য, দফাদার ও চৌকিদারগণ কোনো প্রার্থীর পক্ষে কোনো ধরনের প্রচারণা চালাতে বা কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করতে পারবেন না। তাদের আচরণে কোনোভাবেই পক্ষপাতিত্ব প্রকাশ না পায়, এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যে কোনো সাধারণ ভোটকেন্দ্রকে গোলযোগপূর্ণ কেন্দ্র ঘোষণা করে তাৎক্ষণিক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।

ভোটকেন্দ্রের বেষ্টিত এলাকার মধ্যে ধূমপান ও দিয়াশলাই, লাইটারসহ দাহ্য বস্তু বহনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। সংবেদনশীল কেন্দ্রসমূহের (ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র) দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের মধ্য হতে একজন সদস্যকে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করতে হবে এবং কোনো ধরনের গুজব, অপপ্রচার বা মিথ্যা প্রচারে বিচলিত না হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন অফিসারদের নির্দেশনা ও সহযোগিতা নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.