নিউজ ডেস্ক।।
গণপরিবহনের নাজুক অবস্থা ও যানজট এড়িয়ে স্বস্তিতে যাতায়াতের জন্য দেশে দিন দিন বাড়ছে মোটরসাইকেলের জনপ্রিয়তা। তুলনামূলক কম দাম এবং জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ সাশ্রয়ী হওয়ায় দুই চাকার এই বাহনটি এখন অনেকের সঙ্গী হয়ে উঠছে। এছাড়া রাইড-শেয়ারিং সেবা ঘিরে এটি কারও কারও কর্মসংস্থানের উৎসেও পরিণত হয়েছে। মোটরসাইকেল নিয়ে জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এমদাদুল হক তুহিনের তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের তৃতীয় ও শেষ পর্ব আজ।
‘বেতন ৩৬ হাজার টাকা। ছেলে-মেয়ের স্কুলের বেতনই ১৬ হাজার। এই বেতন দিয়ে বাসাভাড়া ও সংসারের অন্য খরচ চালিয়ে নিতে পারছি না। বাধ্য হয়ে অফিস শেষে মোটরসাইকেলে তিন-চার ঘণ্টা রাইড শেয়ার করি। অ্যাপ ও ক্ষ্যাপে চালিয়ে মাসে অন্তত অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা আয় হয়, যা জীবনে কিছুটা স্বস্তি এনেছে।’
পাঠাওয়ের মাধ্যমে একজন সক্রিয় মোটরসাইকেল রাইডার মাসে সর্বোচ্চ প্রায় ৬০ হাজার টাকা এবং একজন কার ক্যাপ্টেন সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করার সুযোগ পান। পাঠাওয়ে আমরা সব সময় প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান, ন্যায্য আয়ের কাঠামো এবং মানসম্মত সেবার মাধ্যমে রাইডার ও ব্যবহারকারীদের ক্ষমতায়নে কাজ করছি।- পাঠাওয়ের সিইও ফাহিম আহমেদ
কথাগুলো এভাবেই বলছিলেন চলিশোর্ধ্ব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার রাহাত রহমান। রাইড শেয়ারিং রাহাতের বিকল্প আয়ের কর্সংস্থান হলেও স্বপনের আয়ের মূল উৎসই এটি। প্রায় ছয় বছর ধরে রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত স্বপনের ভাষায়- ‘আয় যাই হোক, এই আয়ের ওপরই আমার পরিবার চলছে। গ্রামে রেস্টুরেন্টের ব্যবসা দিয়েছিলাম। সেটিতে লোকসান হওয়ায় সব ছেড়ে ঢাকায় এসে রাইড শেয়ারিং শুরু করি। এখন এটিই আমার আয়ের জায়গা, এটিই আমার সব।’
শুধু রাহাত ও স্বপন নন, নিয়মিত বেতন না হওয়ায় গত ডিসেম্বরে একটি সিকিউরিটি কোম্পানির চাকরি ছেড়ে মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং শুরু করেছেন মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আরিফ হোসেন। রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় কথা হলে আরিফ বলেন, ‘গত ১৬ ডিসেম্বর চাকরি ছেড়েছি। কাজ নেই, বসে তো থাকতে পারি না। পরিবার আছে, সংসার আছে। মেয়েটার বয়স তিন বছর। নিয়মিত বেতন না থাকায় চাকরি ছেড়ে বাধ্য হয়ে রাইড শেয়ারিং শুরু করেছি। দিনে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার মতো ভাড়া মারতে পারছি। কিন্তু এই টাকা দিয়ে সংসার চলবে না। তারপরও আপাতত চালিয়ে যাচ্ছি।’
দেশে রাইড শেয়ারিং এখন লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস। এটি কারও প্রধান কিংবা বিকল্প আয়ের উৎস। কেউ অ্যাপসে আবার কেউ বা চুক্তিতে রাইড শেয়ারিং করছেন। উবার ও পাঠাও- এ দুটি অ্যাপস ব্যবহার করে অন্তত আট লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এর বাইরে এ দুটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার না করেও রাইড শেয়ার করছেন লাখ লাখ মানুষ। সে হিসাবে ১০ লাখের বেশি মানুষ রাইড শেয়ারিং পেশায় জড়িত রয়েছেন বলে ধারণা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
প্রথম কয়েক বছর অ্যাপসে চালাতাম। এখন আর অ্যাপসে চালাই না। চুক্তিতে ভাড়া মারি। কারণ অ্যাপসে ভাড়া কম আসে। অ্যাপসে চালালে তেলের টাকাও হয় না।- চালক স্বপন
প্রায় ১৬ বছর ধরে ড্রাইভিং পেশায় জড়িত বরিশালের কবির হোসেন। ৮ বছর ধরে উবারে গাড়ি চালাচ্ছেন তিনি। মধ্য বাড্ডার বাসিন্দা কবির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি ১৬ বছর ধরে ড্রাইভিং করছি। উবারে ৮ বছর কমপ্লিট হয়েছে। এখন টয়োটা এক্সিও গাড়ি চালাই। উবার ব্যবহার করে দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা গাড়ি চালাই। কোনো কোনো দিন ১৪ ঘণ্টাও চালাতে পারি। এখন ২৫ শতাংশ কমিশন নেয়।’
কবির আরও বলেন, ‘এই পেশার ওপর ভর করেই আমার সংসার চলছে। গত মাসে গাড়ি চালিয়ে ১ লাখ ৯ হাজার টাকা আয় করেছি। এর মধ্যে উবারে ৬৬ হাজার টাকা ও বাকিটা চুক্তিতে আয় হয়েছে। গাড়িটি আমার নয়, চুক্তিতে চালাই।’
২০১৬ সালে পাঠাও ও উবার দেশে রাইড শেয়ারিংয়ের যাত্রা শুরু করে। দেশে শুধু পাঠাওয়ের নিবন্ধিত চালক ও রাইডারের (ব্যবহারকারী বা যাত্রী) সংখ্যাই ৪ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল রাইডারের সংখ্যা তিন লাখেরও বেশি। আর এক লাখের বেশি নিবন্ধিত চালক পাঠাও প্ল্যাটফর্মে যুক্ত রয়েছেন। দেশীয় এই প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালে বিশ্বখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সম্ভাবনাময় শীর্ষ ১০০টি স্টার্টআপ কোম্পানির তালিকায়ও উঠে আসে। রাইড শেয়ারিংয়ের বাইরেও প্রতিষ্ঠানটি খাদ্য সরবরাহ, ই-কমার্স, লজিস্টিকস ও ফিনটেক সেবা দিচ্ছে।
গাড়িভাড়া নিয়ে কিংবা কিনে অনেকেই রাইড শেয়ারিং করছেন। এতে তাদের আয়ও ভালো হচ্ছে। এটি অর্থনীতির গতিকে সচল রাখছে। অনেকেই এখানে কর্মসংস্থান পাচ্ছেন। ফলে রাইড শেয়ারিং খাত নিয়ে সরকারের আরও মনোযোগ দেওয়া উচিত।- ডিসিসিআই সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, পাঠাওয়ের মোটরসাইকেল রাইড সেবার মাধ্যমে প্রতি বছর ৪০ লাখের বেশি ব্যবহারকারী যাতায়াত করেন। একই সময়ে পাঠাওয়ের কার রাইড সেবা নেন প্রায় ২৫ লাখের বেশি ব্যবহারকারী। আর পাঠাও ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম সর্বনিম্ন সার্ভিস চার্জ কাঠামো বজায় রাখে। মোটরসাইকেল রাইডের ক্ষেত্রে সার্ভিস চার্জ সর্বনিম্ন ১ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে এবং গাড়ির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় বা নতুন চালকদের জন্য শূন্য শতাংশ সার্ভিস চার্জ সুবিধাও দেওয়া হয়। রাইডারের দৈনিক বা মাসিক কার্যক্রম ও রাইড সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে সার্ভিস চার্জ নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ, যত বেশি রাইড, তত কম সার্ভিস চার্জ।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
