নিউজ ডেস্ক।।
আইন ও নীতিমালা লঙ্ঘনে অভিযুক্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জানুয়ারি সেশন থেকে দেশের দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের প্রোগ্রামে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো- বরিশালে অবস্থিত গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এবং নারায়ণগঞ্জের ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি। ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক ড. মো. সুলতান মাহমুদ ভূইয়ার স্বাক্ষরিত পৃথক পত্রে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
ইউজিসি জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে না। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারির আগেই যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন, তাদের শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলবে।
ইউজিসির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা আমাদের সময়কে জানান, সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটির সুপারিশ ও ইউজিসির ৫৮তম সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে অনিয়ম : ইউজিসি সূত্র জানায়, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা সরেজমিন পরিদর্শনের জন্য গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি একাধিক প্রশাসনিক ও একাডেমিক ঘাটতির কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে শিক্ষকের ঘাটতি, ল্যাব ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতার অভাব এবং আইন অনুযায়ী তথ্য সংরক্ষণে অনিয়মের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টির সেক্রেটারির দায়িত্বে রয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। তার স্ত্রী সৈয়দা আরজুমান বানু নার্গিস বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং কন্যা এস. আমরিন রাখি ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেনÑ এ বিষয়টিও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে এসেছে।
অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজির ক্ষেত্রে সার্টিফিকেট সংক্রান্ত অভিযোগ, ওয়েবসাইট ডোমেইন পরিবর্তন, শিক্ষার্থী তথ্যের অসঙ্গতি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে। এসব অনিয়ম যাচাইয়ে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই ভর্তি বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়।
ইউজিসির কড়া নির্দেশনা : ইউজিসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, উভয় বিশ্ববিদ্যালয়কে বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের বিস্তারিত তথ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কমিশনে জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে ন্যূনতম শিক্ষক ও জনবল নিয়োগ, প্রয়োজনীয় ল্যাব সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং সব ধরনের বেতন ও ফি লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ইউজিসির পরিচালক ড. মো. সুলতান মাহমুদ ভূইয়া বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সুরক্ষা আমাদের প্রধান দায়িত্ব। অনিয়ম চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’
শিক্ষার্থী ও শিক্ষাবিদদের উদ্বেগ : ভর্তি বন্ধের খবরে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘নতুন ভর্তি বন্ধ হলেও আমাদের পড়াশোনা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়- এটাই আমাদের প্রধান দাবি।’
শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত শিক্ষা খাতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন মানা মানে শুধু কাগজে-কলমে নিয়ম পালন নয়; এটি শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্ন।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ইউজিসির এই অবস্থান একটি দৃষ্টান্ত। আইন না মানলে ছাড় নেই এই বার্তাই দেওয়া হয়েছে।’
উদ্যোক্তাদের প্রতিক্রিয়া : ভর্তি বন্ধ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা মনে করছেন, তদারকি প্রয়োজন হলেও হঠাৎ ভর্তি বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ইউজিসি বলছে, পর্যাপ্ত সময় ও নির্দেশনা দিয়েই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
