পিরোজপুর-১
।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
দীর্ঘ ২৯ বছর পর পিরোজপুর-১ সংসদীয় আসনে বিএনপির নিজস্ব প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার ঘটনা দলটির স্থানীয় রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। শিক্ষকতা পেশা থেকে উঠে আসা জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেনকে ধানের শীষের প্রার্থী ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুধু একটি মনোনয়নই নয়, বরং দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অপেক্ষার অবসান ঘটেছে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর জোটগত রাজনীতির কারণে পিরোজপুর-১ আসনে বিএনপি নিজস্ব প্রার্থী দিতে পারেনি। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে এই আসনে জোট শরিকদের প্রার্থীকে সমর্থন করতে গিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক বঞ্চনা ও হতাশা জমে উঠেছিল। আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে থেকেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে নিজেদের না দেখতে পাওয়াই এই ক্ষোভের মূল কারণ বলে দলীয় নেতারা স্বীকার করছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন গতি এনেছে। মনোনয়ন ঘোষণার পরপরই পিরোজপুর সদর, নাজিরপুর ও ইন্দুরকানী উপজেলায় দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন পর ‘নিজেদের প্রার্থী’ পাওয়ায় সংগঠনের ভেতরে ঐক্য ও সক্রিয়তা বেড়েছে, যা নির্বাচনী মাঠে বিএনপির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন একজন শিক্ষক হিসেবে সমাজে পরিচিত মুখ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষক পরিচয় তাঁর জন্য একটি বাড়তি ইতিবাচক ইমেজ তৈরি করতে পারে। শিক্ষা, নৈতিকতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে সাধারণ ভোটারদের কাছে তিনি গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। বিশেষ করে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত থাকা নেতাকর্মীদের কাছে তাঁকে ‘ত্যাগীদের প্রতিনিধি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা মনে করছেন, এই মনোনয়ন শুধু একটি আসনের নয়, বরং পুরো জেলার রাজনীতিতে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করেছে। তিনটি সংসদীয় আসনেই দলীয় প্রার্থী থাকায় নেতাকর্মীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি উজ্জীবিত। ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন তারা, যা নির্বাচনী ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির জন্য নির্বাচন শুধু আবেগের বিষয় নয়, বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সংগঠনের ভেতরের ঐক্য ধরে রাখা, সব স্তরের নেতাকর্মীকে মাঠে সক্রিয় করা এবং সাধারণ ভোটারদের আস্থা অর্জন—এই তিনটি বিষয়ই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। বিশ্লেষকদের মতে, আবেগকে সংগঠিত ভোটে রূপান্তর করতে পারলেই কেবল ‘আশার রাজনীতি’ বাস্তব সাফল্যে পরিণত হতে পারে।
সব মিলিয়ে পিরোজপুর-১ আসনে ২৯ বছর পর বিএনপির নিজস্ব প্রার্থী মনোনয়ন দলটির জন্য একটি রাজনৈতিক টার্নিং পয়েন্ট। এটি শুধু একটি নির্বাচনী সিদ্ধান্ত নয়, বরং দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশমন, সাংগঠনিক পুনর্জাগরণ এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য আস্থার ভিত্তি গড়ে তোলার প্রয়াস। এখন দেখার বিষয়—এই আশার ঢেউ ভোটের মাঠে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
