নিউজ ডেস্ক।।
বাংলাদেশের দু-তিন কোটি মানুষ প্রবাসে থাকেন। তাঁদের অনেকে বৈধভাবে, অনেকে অনিয়মিত পথে বিভিন্ন দেশে গেছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের ভূমিকা বড়। তবে দিন দিন বহির্বিশ্বের পথ কঠিন হয়ে উঠেছে বাংলাদেশিদের জন্য।
বিদেশে পড়তে, ঘুরতে কিংবা কাজের জন্য ভিসা পেতে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে দেশের মানুষ। ঘোষণা দিয়ে বা ঘোষণা ছাড়াই বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়ার হার কমিয়েছে বিভিন্ন দেশ। এতে বিপাকে পড়েছে দেশের উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শীক্ষার্থী ও শ্রমজীবীরা। এ ছাড়া ভ্রমণনেচ্ছু মানুষও ভিসা জটিলতায় অনেক দেশে যেতে পারছে না।
কূটনৈতিকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবৈধ অভিবাসীদের কারণে দেশের সুনাম যেমন ক্ষুণ্ন হচ্ছে, কূটনৈতিক কারণে কিছু জায়গায় সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনৈতিক পন্থা ও ভুয়া কাগজপত্রের জটিলতা সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে। এসবের কারণে শ্রমবাজার হারিয়ে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা লাভের পথও বন্ধ হচ্ছে।
ভিসা জটিলতার কারণ জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ভিসার সঙ্গে অর্থনীতির একটা সম্পর্ক আছে।
যে দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বড় হয়, তখন তারা ভিসা শিথিল করে। গত এক বা দেড় বছরে বিদেশি বিনিয়োগ কমে গেছে। যেহেতু বাংলাদেশে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা, অস্থিরতা রয়েছে, এখনো নির্বাচন হয়নি বা নির্বাচিত সরকার নেই, তাই তারা মনে করছে, তারা এখন বাংলাদেশে আসবে না। বাংলাদেশিরা কেন যাবে? এই বিষয়গুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
ভিসা জটিলতা সমস্যা সমাধানে মূল বিষয়ে স্থিতিশীলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পত্রপত্রিকায় যদি খবর আসে যে ছাত্র শিক্ষক পেটাচ্ছে, রাস্তায় পেটাচ্ছে, আর ওই ছবি যদি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যায়, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খারাপ ধারণা সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে বেশ কিছু ঘটনা আছে, যেগুলোর ব্যাপারেও আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। তাই প্রথম কাজ হলো সুশাসন ও স্থিতিশীলতা ঠিক করা। বাংলাদেশ যদি স্থিতিশীল হয়, শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে ভাবমূর্তি বদলাবে। এ ছাড়া দক্ষ শ্রমিকের দিকেও নজর দিতে হবে। অনেকে দক্ষতার অভাব থাকার কারণে ফেক ডকুমেন্টস ব্যবহার করে।
আগে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত বছরে পাঁচ থেকে ছয় লাখ ভ্রমণ ভিসা দিত। সম্প্রতি এ সংখ্যাটি নেমে গেছে দুই লাখেরও কমে। অন্যদিকে গত মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইটে দেওয়া বার্তায় জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আবেদনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ‘ভিসা বন্ড’ বা জামানত দিতে হবে। এ শর্তে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশসহ আরো ২৫টি দেশের নাম।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিয়মের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, আগে থেকেই জানা ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা কঠিন করে ফেলবে। সে হিসেবে তখন থেকেই বাংলাদেশেরও প্রস্তুতি নেওয়া দরকার ছিল। আলোচনার মাধ্যমে তাদের বোঝানো উচিত ছিল যে কেন আমাদের দেশের লোকেরা যাবে।
ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এটা যে শুধু বাংলাদেশের জন্য করেছে, তা কিন্তু না। এখানে আরো অনেক দেশ আছে। বাংলাদেশের সরকারের বা যাঁরা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় থাকবেন, তাঁদের গভীর চিন্তা করা দরকার যে এ বিষয়গুলো কেন ঘটছে। শুধু যে যুক্তরাষ্ট্রে হচ্ছে তা তো না! ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়াসহ মোটামুটি সব দেশেই এখন প্রায় বন্ধ হচ্ছে। এর একটা বড় কারণ বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতা।
পর্যটন খাতে ভিসা জটিলতা : অভিবাসন ও দর্শনার্থীদের নিয়ে কাজ করা দেশের বিভিন্ন এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশ থেকে আগে যেসব দেশের সহজে কর্মসংস্থান হতো, সেসব দেশও ভিসা দিচ্ছে না। এসব দেশে ভিসা নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও কার্যত ভিসা পাওয়া যাচ্ছে না। যেমন—ভারত, ইউএই, কাতার, বাহরাইন, ওমান, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম এসব দেশ ভিসা দিচ্ছে না। এ ছাড়া থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়ার ভিসাও অত্যন্ত ধীরগতিতে প্রক্রিয়াকরণ হচ্ছে।
ভিসা জটিলতায় দেশ থেকে বিভিন্ন দেশে ঘুরতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতায় পড়েছে ভ্রমণপ্রেমীরা। যেসব দেশ আগে পর্যটন ভিসা সহজে দিত, সেসব দেশও এখন ভিসা দেওয়া জটিল করেছে। সঙ্গে সংযুক্ত করেছে নতুন শর্ত। অন্যদিকে ভিসা প্রক্রিয়া করেছে ধীর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর পর্যটন ভিসা কার্যত বন্ধ করে দেয় ভারত। আর ঘোষণা ছাড়াই ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার অনেক দেশের ভিসা পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠেছে।
পর্যটন খাতের উদ্যোক্তারা জানায়, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় দেশগুলোও ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তুলনায় অনেক কম ভিসা দিচ্ছে।
সরেজমিনে রাজধানীর যমুনায় ভারতের ভিসা সেন্টার ঘুরে দেখা যায়, আগে প্রতিদিন যেখানে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষ লাইন ধরে ভিসার জন্য আবেদন করত, সেখানেও বর্তমানে মাত্র ১৫০০ থেকে ২০০০ মানুষ আবেদন করছে। তবে পর্যটন ভিসা না দেওয়ায় শুধু মেডিক্যাল ভিসায় আবেদন করছে মানুষ।
ভারতের মেডিক্যাল ভিসাপ্রত্যাশী আসিফ হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সকাল ৮টায় এসে ভিসার জন্য দাঁড়িয়েছিলাম। বেশির ভাগই মেডিক্যাল ভিসার জন্য আবেদন করেছে। আমরা পাঁচজন একসঙ্গে এসেছি ভিসার জন্য। ইউরোপের ভিসার জন্য যেতে হবে ভারতে। তবে ডাবল এন্ট্রি ভিসা না দেওয়ায় এখন মেডিক্যাল ভিসার জন্যই আবেদন করতে হচ্ছে।’
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সেক্রেটারি নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, আমাদের বিদেশে ভ্রমণ প্রায় আগের তুলনায় ৩০ শতাংশ কমেছে। অনেক দেশ ভিসা দিচ্ছে না। আর যেসব দেশ দিচ্ছে, তারাও অনেক ধীরগতিতে কাজ করছে। অন্যদিকে ভ্রমণ খরচও অনেক বেড়েছে। আমাদের এই ব্যবসায় লাভ অনেক কমেছে। তবে বিদেশে ভ্রমণ কমে যাওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণ বেড়েছে।
শ্রমবাজার বেশির ভাগই বন্ধ : বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ শ্রমিক কাজের উদ্দেশে যেত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইনসহ আরো কয়েকটি দেশ। তবে বর্তমানে সৌদি আরবে কিছু শ্রমিক যেতে পারলেও অন্য দেশগুলোতে আদতে বন্ধ রয়েছে শ্রমিক প্রেরণ অথবা শর্তসাপেক্ষে চলছে।
এই খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে গিয়ে অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতা, ভুয়া তথ্যের মাধ্যমে আবেদন, অনেক দেশের নিজস্ব পরিকল্পনায় পরিবর্তনসহ নানা কারণে বাংলদেশিদের ভিসা আবেদন বা ভিসা বাতিল হওয়ার ঘটনা বেড়েছে।
জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে জাপানে শ্রম রপ্তানির প্রক্রিয়া কিছুটা এগিয়েছে। সরকার আগামী পাঁচ বছরে এক লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে এ পর্যন্ত মাত্র ১০ হাজার কর্মী যেতে পেরেছেন। ফলে চুক্তির বাস্তবায়ন খুব বেশি হয়নি। গত বছর সৌদি আরবে সাত লাখ ২০ হাজারের বেশি কর্মী গেছেন, যা অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি। তবে সৌদি আরব ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমানসহ অন্যান্য দেশে কর্মী যাওয়ার হার ব্যাপক কমেছে। ফলে বর্তমানে শ্রমবাজার বলতে সৌদি আরব ছাড়া বাংলাদেশের জন্য কোনো উন্মুক্ত দেশ নেই বললেই চলে।
এ ছাড়া কুয়েতসহ আরো কিছু দেশের শ্রমবাজার একেবারে বন্ধ। যেসব দেশে বর্তমানে অল্পসংখ্যক শ্রমিক যাচ্ছেন, সেগুলোও ২০২৬ সালে বন্ধ হতে পারে বলে জানা গেছে। লেবাননে ইসরায়েলি হামলার সময় শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হলেও নতুন করে শ্রমিক পাঠানোর ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেই।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক মুন্সী ফয়েজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, শ্রমবাজার বিভিন্ন সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য কারণের মধ্যে রয়েছে বর্তমান সরকার তেমন ভালো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তারা চেষ্টা করলেও কিন্তু তাতে ফল হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ বিশ্বে নানাভাবে বিভিন্ন বদনাম তৈরি করেছে। বিভিন্ন দেশের আইন-কানুন মানার বিষয়ে বাংলাদেশিদের সমস্যাও আছে।
উচ্চশিক্ষায় বিদেশ গমনে জটিলতায় শীক্ষার্থীরা : বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বহু শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে বিভিন্ন দেশে যায়। এতে দেশের শীক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় বিশেষ করে থাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের পাশাপাশি জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশেও যান বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। তবে ভিসা জটিলতায় এই খাতেও শীক্ষার্থীদের যাওয়া কমেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় প্রথম সারিতে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সম্প্রতি ভিসা জটিলতায় দেশটিতে শিক্ষার্থীদের যাওয়ার সুযোগ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
শিক্ষা ভিসা নিয়ে কাজ করা একাধিক এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশটিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের যাওয়ার সুযোগ কমেছে। অন্যদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশও শীক্ষার্থীদের সব কাগজ ঠিক থাকলেও ভিসা দেয় না অনেক সময়। ভারতের ভিসা পাওয়া কঠিন হওয়ায় দেশটিতে থাকা ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে আবেদন করা এখন আর সেভাবে সম্ভব হচ্ছে না।
অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, প্রায়ই শোনা যায়, ভুয়া পাসপোর্ট বা ভুয়া ভিসাতে বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। এতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সংকট তৈরি হয়েছে। এটাকে ঠিক করার কাজ আমরা করতে পারিনি। রাজনীতি থেকে শুরু করে দেশের পরিস্থিতি সব মিলিয়ে আমরা এই অবস্থায় পড়েছি।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
