ঢাকাঃ এক বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে মাত্র ৯২ দিন ক্লাস পেয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ কোটির বেশি শিক্ষার্থী। ছুটি ও পরীক্ষার পাশাপাশি কখনো শিক্ষকদের ক্লাস বর্জন, কমপ্লিট শার্টডাউন, কখনো বিক্ষোভ-সমাবেশের কারণে ঠিকমতো ক্লাস হয়নি। পাশাপাশি পাঠ্যবই হাতে পেতেও দেরি হয়েছে। শিখন ঘাটতি নিয়ে আজ রবিবার থেকে পরীক্ষায় বসছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার গণহারে বদলির পরিপ্রেক্ষিতে সহকারী শিক্ষকরা তাদের চলমান আন্দোলন পরীক্ষার আওতামুক্ত রেখে আজ থেকে পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সরকারি ছুটি ছিল ৭৬ দিন। সপ্তাহে দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি। সেই হিসাবে আরো ১০৪ দিন ছুটি। এতে সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ১৮০ দিন বন্ধ। বাকি থাকে ১৮৫ দিন। এর মধ্যে চলতি বছর বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবিতে প্রাথমিক শিক্ষকরা ৪০ দিন কর্মবিরতি পালন করেন। এর মধ্যে পূর্ণদিবস ১৬ দিন। আর অর্ধদিবস ২৪ দিন। কর্মবিরতির দিনগুলো বাদ দিলে অবশিষ্ট থাকে ১৪৫ দিন। এর মধ্যে পরীক্ষা হয়েছে ২৭ দিন। পরীক্ষার দিনগুলো বাদ দিলে থাকে ১১৬ দিন। শৈত্যপ্রবাহ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির কারণে আরো ১১ দিন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বন্ধ ছিল। এতে ক্লাস হয়েছে এমন দিনের সংখ্যা নেমে আসে ১০৫ দিনে। কিন্তু এ বছর কমপক্ষে একটি করে পাঠ্যবই পেতেও শিক্ষার্থীদের জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। ফলে ক্লাস হয়েছে, এমন দিনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯২ দিন।
বদলি-শোকজ : সারা দেশে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক সংখ্যা ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৮১। এদের মধ্যে প্রধান শিক্ষক প্রায় ৩৫ হাজার। বাকি সবাই সহকারী। দেশে বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটি ৯৭ লাখ ১৩ হাজার ৬৮৫। তাদের মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ১ কোটি ৯ লাখ ৮৫ হাজার ৮১৫ জন, যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৫৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। তিন দফা দাবি আদায়ে টানা কর্মবিরতি ও দুই দিনের কমপ্লিট শার্টডাউনের পর গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে কমপ্লিট শার্টডাউন কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা। একই সঙ্গে আজ রবিবার থেকে পরীক্ষাগ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ ও বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে এ ঘোষণা দেয়। আন্দোলনকারী শিক্ষকরা জানান, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় বার্ষিক ও তৃতীয় প্রান্তিক পরীক্ষা শর্তসাপেক্ষে পরিচালিত হবে। তবে দাবি আদায়ে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে এবং ভবিষ্যত্ কর্মসূচি পরে ঘোষণা করা হবে। ২৭ নভেম্বর থেকে কর্মবিরতির পর ১ ডিসেম্বর পরীক্ষা বর্জন এবং ২ ডিসেম্বর তালা ঝুলিয়ে কমপ্লিট শার্টডাউন কর্মসূচি শুরু করলে শিক্ষাঙ্গনে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এতে অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। কোথাও কোথাও উপজেলা প্রশাসন ও অভিভাবকদের সহায়তায় প্রধান শিক্ষকরা পরীক্ষা নিলেও তাতে অরাজকতা ও বিভ্রান্তি দেখা দেয়। এ অবস্থায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সরকারি চাকরিবিধি ও ফৌজদারি আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। কিন্তু শিক্ষকদের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাপক বদলির পথে হাঁটে। গত বৃহস্পতিবার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের জারি করা এক অফিস আদেশে আন্দোলনের শীর্ষ নেতাসহ পাঁচ শতাধিক সহকারী শিক্ষককে ভিন্ন জেলায় বদলি করা হয়। শুধু নোয়াখালী জেলা থেকেই বদলি করা হয় ৪০ জন শিক্ষককে। প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামছুদ্দিন মাসুদকেও নোয়াখালী থেকে লক্ষ্মীপুরে বদলি করা হয়েছে। তিনি বলেন, এটি স্পষ্টতই শাস্তিমূলক বদলি। সারা দেশ থেকে আমাদের কাছে একই ধরনের তথ্য আসছে। সাধারণত প্রাথমিক শিক্ষকরা নিজ জেলায় পদায়ন পান; ভিন্ন জেলায় বদলি খুবই বিরল, যা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়া প্রায় হয় না।
এক জেলার সব শিক্ষককে শোকজ: নোয়াখালী জেলার ২৪৩টি বিদ্যালয়ে পরীক্ষা বন্ধ হওয়ায় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সেসব বিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে শোকজ নোটিশ পাঠিয়েছে। শোকজে বলা হয়, একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পরীক্ষা নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও শিক্ষকরা সরকারি নির্দেশ অমান্য এবং বিদ্যালয় তালাবদ্ধ করেছেন, যা সরকারি কর্মচারী আইন ও শৃঙ্খলা বিধিমালার লঙ্ঘন। তাদের তিন কর্মদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
৩৫০ মাইল দূরে বদলি, ক্ষোভ প্রকাশ শিক্ষক নেতার: সহকর্মী এবং নিজের বদলি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক লাইভে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক আবুল কাশেম। জানা গেছে, ময়মনসিংহ থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক নেতাকে বরিশাল এবং জামালপুরে বদলি করা হয়েছে। এরমধ্যে আন্দোলনের আহ্বায়ক আবুল কাশেমকে ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার চানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বরিশাল সদরের চরবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ও হালুয়াঘাট উপজেলার মো. রোকনুজ্জামান রাসেলকে বদলি করা হয়েছে জামালপুর সদর উপজেলার একটি বিদ্যালয়ে।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/০৭/১২/২০২৫
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
