শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে ২৭ তম দিনেও খোলা আকাশের নীচে শিক্ষকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক।। 

নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত একটাই দাবি—সরকার ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী দ্রুত এমপিওভুক্তি নিশ্চিত করা। সেই দাবিকে সামনে রেখে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে টানা ২৭ দিন ধরে চলমান কর্মসূচিতে দিন দিন যোগ দিচ্ছেন দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধিরা। দাবির ন্যায়সঙ্গতা, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও মানবিক জীবনের প্রশ্নে তাঁরা আন্দোলনকে দৃঢ় মনোবল নিয়ে এগিয়ে নিচ্ছেন।

আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন প্রিন্সিপাল মো. সেলিম মিয়া। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিদিনই প্রেসক্লাবের সামনে জড়ো হচ্ছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল, শিক্ষক ও কর্মচারীরা। “দাবি পূরণ ছাড়া আমরা ঘরে ফিরব না”—এই স্লোগানকে সামনে রেখে শিক্ষকরা জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়েই তাঁরা বিভীষিকাময় আর্থিক সংকটে পড়ছেন। অন্যদিকে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলতে গিয়ে তাঁরা প্রায় মানবেতর পরিস্থিতিতে রয়েছেন।

দীর্ঘমেয়াদি এই আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখে আসছেন বেশ কয়েকজন নেতৃস্থানীয় শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—অধ্যক্ষ দবিরুল ইসলাম, অধ্যক্ষ নাজমুস শাহাদাত আজাদী, অধ্যক্ষ মনিমুল হক, অধ্যক্ষ আতাবুল আলম, অধ্যক্ষ বাকীবিল্লাহ, অধ্যক্ষ সাজ্জাদ হোসেন।

তাঁদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সমস্যাগুলো তুলে ধরছেন এবং আন্দোলনকে সংগঠিত করছেন। আন্দোলন স্থলে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তাঁরা জানান, “রাষ্ট্র যদি শিক্ষা ও শিক্ষকদের অগ্রাধিকার না দেয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মান রক্ষা করা অসম্ভব।”

কর্মসূচির প্রতিদিন শিক্ষক নেতারা মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, প্রতীকী উপবাস, প্রতিবাদ সভা ও স্মারকলিপি প্রদানের মতো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছেন। তাঁদের দাবি, দেশে কয়েক হাজার নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারী কোনো সরকারি সুবিধা ছাড়াই ন্যূনতম বেতনে টিকে আছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান টিউশন ফি এবং সামান্য অনুদান ছাড়া আর কোনো আয় না থাকায় মাসের পর মাস বেতন বন্ধ থেকেও শিক্ষকরা শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন।

শিক্ষকরা প্রশ্ন তুলছেন—দেশে যেসব প্রতিষ্ঠান যোগ্যতা, অবকাঠামো, শিক্ষার্থী উপস্থিতি ও নিয়মিত কার্যক্রমের সব শর্ত পূরণ করেও এমপিও থেকে বঞ্চিত, তাদের অপরাধ কী? শিক্ষকদের মতে, শুধুমাত্র প্রশাসনিক জটিলতা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে হাজারো পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ঘেরা।

প্রধান সমন্বয়ক প্রিন্সিপাল মো. সেলিম মিয়া বলেন,
“শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য সরকার যেভাবে কাজ করছে আমরা তা স্বাগত জানাই। কিন্তু শিক্ষকদের বঞ্চিত রেখে কোনো উন্নয়নই টেকসই নয়। দ্রুত এমপিওভুক্তির ঘোষণা না এলে কর্মসূচি আরও বিস্তৃত হবে।”

অন্যান্য নেতৃবৃন্দের বক্তব্যেও একই সুর—এ দেশকে গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় কারিগর শিক্ষক, আর সেই শিক্ষকরাই যদি বঞ্চিত থাকেন, তবে রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আসবে না। তাঁরা আরও জানান, ২৭ দিনের এই কর্মসূচি শুধুই আন্দোলন নয়, বরং শিক্ষকদের বেঁচে থাকার লড়াই।

শিক্ষকরা আশা করছেন, সরকার দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে এবং নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করবে। অন্যথায় তারা কঠোর কর্মসূচির দিকে যেতে বাধ্য হবেন বলে জানান।

শিক্ষকদের ভাষায়, “আমাদের দাবি কোনো রাজনৈতিক দাবি নয়। এটি ন্যায়, অধিকার ও মানবিক জীবনের দাবি। আমরা শিক্ষক, তাই শান্তি চাই—কিন্তু প্রয়োজন হলে আরও কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেও প্রস্তুত আছি।”

২৭ দিনের আন্দোলনের পরও তাঁরা নিজেদের মনোবল ধরে রেখেছেন। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যাঁদের অবদান সবচেয়ে বেশি, সেই শিক্ষকরাই আজ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছেন।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading