।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে রাত যত গাঢ় হয়, ততই ঘুমিয়ে পড়েন একদল মানুষ—কেউ পাথরের মতো শক্ত ফুটপাতে, কেউ পুরোনো পত্রিকার ওপরে, কেউ বা প্লাস্টিকের চট বিছিয়ে। তারা কেউ শ্রমিক নন, কেউ পথবাসী নন; তারা শিক্ষক—যারা সারাজীবন আলো বিলিয়েছেন অন্যের জীবনে। অথচ আজ সেই আলোবাহকেরাই অন্ধকার রাস্তায় কাটাচ্ছেন রাত।
এ দৃশ্য শুধু করুণ নয়, এটি একটি জাতির বিবেকের পরিমাপকও। কারণ, যারা জাতি গঠনের কারিগর, তারা আজ রাষ্ট্রের দরজায় ন্যায্য অধিকার চেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় “এমপিও” (Monthly Pay Order) হলো শিক্ষকদের জীবিকার নিশ্চয়তার প্রতীক। সরকারি স্বীকৃত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা যদি এমপিওভুক্ত হন, তাহলে তাঁরা নিয়মিত বেতন ও ভাতা পান সরকারের কোষাগার থেকে। কিন্তু দীর্ঘ বছর ধরে হাজার হাজার শিক্ষক এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
অনেকে দশকের পর দশক পড়াচ্ছেন অথচ মাস শেষে হাতে আসে সামান্য টিউশন ফি বা প্রতিষ্ঠানের সীমিত সহায়তা। ফলে নন-এমপিও শিক্ষকদের জীবনে সংসার চালানোই এক যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবতা। কেউ কেউ বিকল্প পেশায় ঝুঁকছেন, কেউ ধারদেনায় ডুবে যাচ্ছেন, আবার কেউ হতাশায় ভুগে শিক্ষকতা ছাড়ছেন।
এই বাস্তবতার পটভূমিতেই গড়ে ওঠেছে “নন-এমপিও শিক্ষক ঐক্য পরিষদ”—যাদের দাবি একটাই: তাদেরও এমপিও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
প্রায় এক দশক ধরে এ আন্দোলন চলছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাদের কর্মসূচি নতুন মোড় নিয়েছে। সারাদেশ থেকে হাজারো শিক্ষক এসে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জড়ো হয়েছেন। কখনো মানববন্ধন, কখনো অবস্থান, কখনো অনশন—তবু সরকারের কোনো স্থায়ী প্রতিশ্রুতি মেলেনি।
রাতে তাঁরা থাকেন প্রেসক্লাবের রাস্তায়। ঠান্ডা পাথর, মশার কামড়, বৃষ্টির ভিজে যাওয়া কাপড়—সব কিছু সহ্য করেও তাঁরা স্লোগান তুলছেন:
“ডু অর ডাই—এমপিও না পেলে এখানেই মরব।”এই দৃঢ় উচ্চারণ কোনো নাটক নয়, এটি তাঁদের বেঁচে থাকার আর্তি।
সরকার গত কয়েক বছরে কয়েক দফা এমপিওভুক্তির ঘোষণা দিয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেলেও অধিকাংশ শিক্ষকই থেকে গেছেন তালিকার বাইরে। প্রতিবারই বলা হয়েছে—“পর্যায়ে পর্যায়ে সবার এমপিও হবে।”
কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারের শর্ত পূরণ করেও তালিকাভুক্ত হয়নি। কোথাও প্রশাসনিক জটিলতা, কোথাও রাজনৈতিক বিবেচনা, কোথাও আবার কাগজপত্রের অজুহাত।
ফলে নন-এমপিও শিক্ষকরা মনে করছেন, তাঁদের দাবি ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। তাই তারা প্রেসক্লাবকেই বানিয়েছেন তাঁদের দ্বিতীয় বাড়ি—যেখানে আন্দোলনই তাদের জীবনের রুটিন।
রাজনৈতিক নেতারা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, এমনকি সাধারণ মানুষও নন-এমপিও শিক্ষকদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলনের ছবি ছড়িয়ে পড়েছে—শিক্ষকদের রাস্তার পাশে ঘুমানো, হাতে প্ল্যাকার্ড, চোখে অশ্রু।
কিন্তু সহানুভূতি দিয়ে তো পেট ভরে না। তাঁদের প্রয়োজন নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রয়োজন বাজেট বরাদ্দ।
দুঃখজনক হলেও সত্য—যে সমাজে শিক্ষকরা রাস্তার পাশে রাত কাটান, সেখানে আমরা সবাই দায়ী। এই দায় শুধু সরকারের নয়, পুরো সমাজের। কারণ, আমরা ভুলে গেছি—শিক্ষক মানে শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, শিক্ষক মানে জাতির ভবিষ্যতের দিকনির্দেশক।
মশার কামড় উপেক্ষা করে ফুটপাতে রাত কাটানো মানুষটির পরিচয় যখন ‘প্রিন্সিপাল সেলিম মিয়া’—একজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান—তখন প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্রের মানবতা কোথায়?
দিনের বেলায় তিনি হয়তো শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণার গল্প বলেন, আর রাতের বেলায় নিজে শুয়ে থাকেন প্রেসক্লাবের রাস্তায়। এই বৈপরীত্য শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের প্রতীক।
মানবিক দিক থেকে এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যর্থতার নগ্ন চিত্র। একটি জাতি তখনই বিপদে পড়ে, যখন তার শিক্ষকরা আন্দোলনরত হয় আর শাসকেরা নির্বিকার থাকে।
প্রতিটি আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থও কাজ করে—এ কথা অস্বীকার করা যায় না। অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষকদের দাবি নিয়ে সমর্থন জানায়, ছবি তোলে, বিবৃতি দেয়; কিন্তু ক্ষমতায় গেলে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো হারিয়ে যায় আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায়।
ফলে শিক্ষকদের মধ্যে তৈরি হয় অবিশ্বাস। তারা বুঝে গেছেন—তাদের আন্দোলন কেবল ভোটের মৌসুমে “বিষয়বস্তু”, অন্য সময় “উপেক্ষিত বাস্তবতা”।
একজন শিক্ষক বলেছিলেন, “আমরা রাজনীতি বুঝি না, আমরা ন্যায্যতা চাই।” এই একটি বাক্যই যেন পুরো আন্দোলনের সারমর্ম।
সরকারের যুক্তি—নতুন এমপিওভুক্তি মানে বাজেটের অতিরিক্ত চাপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শিক্ষকেরা তো বছরের পর বছর শিক্ষা সেবা দিচ্ছেন, তারা রাষ্ট্রের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। তাঁদের স্বীকৃতি না দিলে ক্ষতি কার?
একদিকে শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা বলা হয়, অন্যদিকে যারা সেই মান ধরে রাখে, তাদের অবহেলা করা হয়। এতে শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত দুর্বল হয়।
নন-এমপিও শিক্ষকরা আসলে শুধু নিজেদের জন্য নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মর্যাদা রক্ষার জন্য লড়ছেন।
আমরা মুখে বলি—“শিক্ষক সমাজের শ্রেষ্ঠ মানুষ।”
কিন্তু বাস্তবে তাঁরা সবচেয়ে অবহেলিত পেশাজীবী। নন-এমপিও শিক্ষকদের আয় এতই সামান্য যে অনেক সময় ভাড়া, ওষুধ কিংবা সন্তানের পড়াশোনার খরচও জোগাতে পারেন না।
একজন শিক্ষক যখন টিউশন করিয়ে সংসার চালান, তখন শিক্ষার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় না, ক্ষুণ্ণ হয় রাষ্ট্রের মান।
সম্প্রতি বিভিন্ন মহল থেকে আবারও এমপিওভুক্তির দাবিতে ইতিবাচক সাড়া এসেছে। তবে শিক্ষকেরা এখন আর কথায় বিশ্বাস করেন না—তারা চান লিখিত নিশ্চয়তা, চান কার্যকর পদক্ষেপ।
তারা বলছেন, “আমরা ক্লাসে ফিরব, কিন্তু আগে রাষ্ট্র আমাদের স্বীকৃতি দিক।”
এটি কেবল আন্দোলন নয়, এটি এক নৈতিক যুদ্ধ—যেখানে প্রতিপক্ষ কোনো ব্যক্তি নয়, বরং একটি ব্যবস্থা।
নন-এমপিও শিক্ষকদের আন্দোলন শুধু একটি চাকরির দাবির সীমিত দাবি নয়; এটি আমাদের সমাজের নৈতিকতা, মানবিকতা এবং শিক্ষাব্যবস্থার মানের পরিমাপক। প্রেসক্লাবের রাস্তায় তারা যেভাবে রাত কাটাচ্ছেন, মশার কামড় সহ্য করছেন, এবং সরকারের নিষ্প্রভতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন—সেটি একটি অনন্য উদাহরণ যে সত্যিকারের লড়াই কখনও আরামদায়ক হতে পারে না, কিন্তু তা মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতার চূড়ান্ত নিদর্শন হতে পারে।
এই আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিক্ষকরা কেবল পাঠদানকারী নয়, তারা সমাজের রূপকার। যখন তারা নিজেদের দাবির জন্য রাস্তায় ঘুমাচ্ছেন, তারা কেবল এমপিও নয়, বরং শিক্ষার মর্যাদা, কর্মসংস্থান নিরাপত্তা এবং ন্যায়ের উপর দাঁড়িয়ে লড়াই করছেন। তাদের দৃঢ়তা আমাদের রাজনীতিক, প্রশাসনিক এবং নাগরিক সচেতনতার জন্য এক গভীর বার্তা।
সরকারের উচিত এই সংকটকে কেবল প্রশাসনিক সমস্যারূপে দেখা নয়, বরং একটি নৈতিক ও মানবিক দায়বদ্ধতা হিসেবে দেখা। শিক্ষকদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করা মানে দেশের ভবিষ্যতের প্রতি দায়বদ্ধতা পূর্ণ করা। অন্যদিকে সমাজের সব স্তরকেই এই আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা দেখাতে হবে, কারণ এটি শুধুমাত্র শিক্ষক নয়, পুরো দেশের শিক্ষার মর্যাদার প্রশ্ন।
যদি আমরা শিক্ষকের এই অনড় সংগ্রামকে উপেক্ষা করি, তবে আমরা শুধু তাদের নির্যাতিত অবস্থাকে স্বীকার করব না, বরং দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, ভবিষ্যত প্রজন্ম এবং গণতান্ত্রিক মূলনীতির প্রতি আমাদের দায়িত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করব। নন-এমপিও শিক্ষকেরা যে ‘ডু অর ডাই’ মানসিকতায় দাঁড়িয়ে আছেন, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কখনও কখনও সমাজের মূল্যবোধ ও ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করতে হলে সচ্ছলতার স্বাচ্ছন্দ্যকে ত্যাগ করাটাও জরুরি।
শেষ পর্যন্ত, এই আন্দোলন আমাদের সকলের জন্য একটি শিক্ষা: সত্য, ন্যায়, এবং মানবিকতার প্রতি আনুগত্য কখনও সহজ বা আরামদায়ক হয় না, কিন্তু তা সমাজের শক্তি, শিক্ষার মর্যাদা এবং দেশের ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। প্রেসক্লাবের রাস্তায় ঘুমন্ত এই শিক্ষকরা শুধুমাত্র তাদের অধিকার চাইছেন না; তারা আমাদের সকলের চেতনাকে জাগিয়ে তুলছেন। তাদের সংগ্রাম, সাহস এবং অধ্যবসায় আমাদের দেশের জন্য একটি অনবদ্য উদাহরণ।
এভাবে, নন-এমপিও শিক্ষকদের অনড় অবস্থান আমাদের শিক্ষা দেয়—যে লড়াই সত্যিকারের মানবিক, ন্যায়সঙ্গত এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে, তা কখনও বৃথা যায় না। তাদের প্রতিটি রাত, প্রতিটি অনশন এবং প্রতিটি প্রতিবাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিক্ষার মর্যাদা, মানবাধিকার এবং ন্যায়ের পথ কখনও সহজ নয়, কিন্তু তা লড়াই করে অর্জনযোগ্য।
লেখা: শিক্ষক ও গবেষক।।
শিক্ষাবার্তা /এ/১১/১১/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
