।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
রাজনীতি হলো জনগণের আস্থা ও প্রত্যাশার ওপর দাঁড়ানো এক চলমান প্রক্রিয়া। যে দল বা সংগঠন জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারে, তাদের টিকে থাকা সহজ হয়।
আর যে দল জনগণের আস্থা হারায়, তারা যত বড় শক্তিই হোক না কেন, ধীরে ধীরে প্রান্তিকতায় ঠেলে যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এনপিপি (ন্যাশনাল পিপলস পার্টি) একসময় যে সম্ভাবনার আলো দেখিয়েছিল, বর্তমানে সেই আলো যেন ম্লান হয়ে আসছে।
তরতর করে নামছে তাদের জনপ্রিয়তা, যা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। প্রশ্ন হলো—এই জনপ্রিয়তা সংকট কি নতুন করে আত্মবিশ্লেষণ ও পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করবে, নাকি এটি তাদের জন্য পতনেরই ইঙ্গিত হয়ে থাকবে?
সমালোচকরা বলছেন-রাজনীতিতে নেতৃত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দূরদর্শী নেতৃত্ব থাকলে দুর্বল সংগঠনও শক্তিতে রূপ নেয়। কিন্তু নেতৃত্বহীনতা বা দুর্বল নেতৃত্ব থাকলে শক্তিশালী দলও ভেঙে পড়ে। এনপিপির জনপ্রিয়তা হ্রাসের বড় একটি কারণ হলো তাদের নেতৃত্বে সুস্পষ্ট দূরদর্শিতা ও জনগণকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতার অভাব।
শুরুতে এনপিপি নতুন ধারার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারা দাবি করেছিল যে তারা হবে দুর্নীতিমুক্ত, তরুণনির্ভর ও জনগণকেন্দ্রিক দল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের নেতৃত্ব সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। একদিকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বের অভাব—সব মিলিয়ে দলটি ধীরে ধীরে জনগণের আস্থা হারাতে শুরু করে।
একটি রাজনৈতিক দল টিকে থাকে আদর্শের ওপর। আদর্শ হলো দলের প্রাণশক্তি। জনগণ তখনই আকৃষ্ট হয় যখন তারা দেখে, দলটির নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবসম্মত এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর। কিন্তু এনপিপির ক্ষেত্রে দেখা গেছে—শুরুর স্লোগান ও প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ ছিল না।
শুধু বক্তৃতা, সমাবেশ কিংবা ফেসবুক-ভিত্তিক প্রচারণা দিয়ে জনগণের আস্থা ধরে রাখা যায় না। জনগণ বাস্তব পরিবর্তনের প্রমাণ চায়। তারা দেখতে চায়—কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য দলটি কী করছে। এনপিপি সেই বাস্তবধর্মী প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন- বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তা থাকলেই হয় না, গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে সংগঠন থাকতে হয়। ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, উপজেলা—সব জায়গায় দলীয় উপস্থিতি না থাকলে কোনো দল ভোটের মাঠে টিকে থাকতে পারে না।
এনপিপির অন্যতম দুর্বলতা এখানেই। তারা রাজনীতিকে রাজধানীকেন্দ্রিক করে ফেলেছে। ছোটখাটো সমাবেশ বা মিডিয়া প্রচারণা থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ে তাদের দৃঢ় কোনো ভিত্তি গড়ে ওঠেনি। এমনকি অনেক জেলায় এনপিপির সক্রিয় কমিটি নেই বললেই চলে। এই সংগঠনগত শূন্যতা জনপ্রিয়তা হ্রাসের অন্যতম কারণ।
জনগণের আস্থা পাওয়া কঠিন, আবার একবার হারিয়ে ফেললে তা ফেরত পাওয়া আরও কঠিন। এনপিপির জনপ্রিয়তা হ্রাসের পেছনে জনগণের আস্থাহীনতা বড় ভূমিকা রাখছে। জনগণ মনে করছে—এই দল তাদের স্বার্থ বা সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।
বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম, যারা একসময় এনপিপির প্রতি আগ্রহী ছিল, তারাও এখন হতাশ। কারণ, তারা দেখছে কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ নেই। শুধুই কথার ফুলঝুরি, কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যকর পরিবর্তন নেই।
তবে এ সংকট মানেই যে শেষ, তা নয়। ইতিহাস বলে, অনেক রাজনৈতিক দল জনপ্রিয়তা হারিয়েও আবার ফিরে এসেছে। এর জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো আত্মসমালোচনা, নতুন করে সংগঠন পুনর্গঠন এবং জনগণের কাছে আন্তরিকভাবে ফিরে যাওয়া।
এনপিপির জন্যও এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। যদি তারা নেতৃত্বে স্বচ্ছতা আনে, যোগ্য ও তরুণ নেতৃত্বকে এগিয়ে আনে, মাঠপর্যায়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করে এবং বাস্তবসম্মত কর্মসূচি গ্রহণ করে, তবে তারা আবারও আস্থা ফিরে পেতে পারে। জনগণ সবসময় সেই দলকেই সুযোগ দেয়, যারা আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে কাজ করে।
অন্যদিকে, যদি এনপিপি বর্তমান অবস্থাতেই থেমে থাকে এবং জনগণের বার্তা না বোঝে, তবে তাদের সামনে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। জনপ্রিয়তা একবার তলানিতে ঠেকলে আর ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব। ইতিহাসে বহু দলের পতনের পেছনে এই কারণটিই দায়ী—জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলা।
এনপিপিও সেই একই পরিণতির দিকে এগোতে পারে। রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে ধীরে ধীরে তারা প্রান্তিক হয়ে পড়তে পারে। বড় দুই দলের বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হওয়ার যে সম্ভাবনা একসময় তারা দেখিয়েছিল, তা চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।
রাজনীতির মঞ্চে টিকে থাকতে হলে জনগণের আস্থা ধরে রাখা সবচেয়ে জরুরি। এনপিপির বর্তমান জনপ্রিয়তা সংকট তাদের জন্য একইসাথে সতর্কবার্তা ও সুযোগ। তারা চাইলে এই সংকটকে নতুন সূচনায় রূপ দিতে পারে। আবার অবহেলা করলে এটি হবে তাদের পতনের ইঙ্গিত।
এখন দলটির সামনে দুটি পথ খোলা: আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের মাধ্যমে নতুন যাত্রা শুরু করা।
অথবা ধীরে ধীরে জনগণের আস্থা হারিয়ে রাজনৈতিক প্রান্তিকতায় বিলীন হয়ে যাওয়া।
শেষ পর্যন্ত এনপিপির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তাদের নেতৃত্বের প্রজ্ঞা, সংগঠনের ঐক্য, এবং সবচেয়ে বড় কথা জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের আন্তরিক প্রচেষ্টার ওপর।
লেখক: সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
